দেশে-বিদেশে সুনাম অর্জনকারী বিশিষ্ট সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দেশের সুশীল সমাজের নাগরিক, মানবাধিকারকর্মী, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকসহ সুধীজন। বর্তমানে ইউনূস সরকারের সময়ে দেশে সাংবাদিক নির্যাতন আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। চাকুরিচ্যুতি, মামলা, হামলা, গ্রেপ্তার ও মব-সন্ত্রাসের মাধ্যমে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধের প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যা গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতার জন্য মারাত্মক হুমকি বলে মনে করেন তারা।
তারা বলেন, মত প্রকাশ ও পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে একজন সাংবাদিককে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে অভিযুক্ত করা খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে সরকার। এর মাধ্যমে সংবিধান স্বীকৃত বাকস্বাধীনতা, সাংবাদিকতার আদর্শ এবং গণতান্ত্রিক পরিসর ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না বলেন, আজ আনিস আলমগীরকে যেভাবে গ্রেপ্তার করা হলো, আগামীতে একই পরিণতি অন্য সাংবাদিকদেরও হতে পারে। সরকার একদিকে সমালোচনার সুযোগের কথা বললেও অন্যদিকে সমালোচনা করলেই মামলা ও গ্রেপ্তার করছে।
তিনি অভিযোগ করেন, এখন মব তৈরি করে এবং সেই মবের ইশারায় সাংবাদিকদের আটক করা হচ্ছে, যা আগে দেখা যায়নি।
তিনি আরও বলেন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন জঙ্গিবাদ দমনের জন্য প্রণীত হলেও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে তা ব্যবহার করা হচ্ছে। সাংবাদিকদের একমাত্র শক্তি সত্য বলা, আর সেই সত্যের কারণেই যদি রাষ্ট্র ভয় পায়, তাহলে তা উদ্বেগজনক।
মানবাধিকারকর্মী রেজাউর রহমান লেনিন বলেন, মামলার আগেই আনিস আলমগীরকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যা আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। নতুন আইনে গ্রেপ্তারের কারণ লিখিতভাবে জানানো বাধ্যতামূলক হলেও, গ্রেপ্তারের সময় কোনো কাগজপত্র দেখানো হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, পালিয়ে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা না থাকলেও সাংবাদিককে আগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন মানবাধিকার হরণের হাতিয়ার হয়ে উঠছে। এ আইনে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়া, রিমান্ড ও নির্যাতনের অভিযোগ নিয়েও নাগরিকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ রয়েছে।
বেসরকারি সংগঠন ‘ভয়েস’-এর নির্বাহী পরিচালক আহমেদ স্বপন মাহমুদ বলেন, একজন সাংবাদিক তার বক্তব্যের জন্য গ্রেপ্তার হতে পারেন না। আনিস আলমগীর একজন অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক। তার মত প্রকাশের কারণে গ্রেপ্তার মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত।
মানবাধিকারকর্মী নুর খান লিটন বলেন, মামলার আগেই গ্রেপ্তার এবং সন্ত্রাসদমন আইনের অপপ্রয়োগ স্বৈরাচারী শাসনামলের স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে। এতে ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হবে, ফলে মানুষ আর সমালোচনা করতে সাহস পাবে না।
এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। এক বিবৃতিতে পরিষদের সভাপতি নূরুল কবির ও সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে ডিবি কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে মামলা করা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য অশনিসংকেত।
উল্লেখ্য, ১৪ই ডিসেম্বর, রোববার রাজধানীর ধানমন্ডি থেকে প্রখ্যাত সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে হেফাজতে নেয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। এখন ৫ দিনের রিমাণ্ডে নেওয়া হয়েছে তাকে। যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের লোকজন।
সেদিন রাতেই উত্তরা পশ্চিম থানায় আনিস আলমগীর, অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনসহ চারজনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করেন জুলাই রেভ্যুলেশনারি অ্যালায়েন্সের কেন্দ্রীয় সংগঠক আরিয়ান আহমেদ। মামলার অভিযোগে বলা হয়, সোশ্যাল মিডিয়া ও টকশোর মাধ্যমে রাষ্ট্রবিরোধী প্রপাগান্ডা চালিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে।
