মোহাম্মদ আলী আরাফাত
বাংলাদেশের সামনে এক মহা বিপদ অপেক্ষা করছে। ১০ নম্বর মহা বিপদ সংকেত বা তার থেকেও ভয়াবহ অবস্থা। আর সেটা জ্বালানি সংকট।
এমন এক সংকট—যেখানে থমকে যেতে পারে অর্থনীতির চাকা, স্থবির হয়ে পড়তে পারে জনজীবন।
ঝুঁকিতে পড়তে পারে কোটি মানুষের জীবিকা। শুনতে ভয়াবহ লাগলেও—বাস্তবতা সেদিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি—জ্বালানি, বিশেষ করে গ্যাস।
বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা, তৈরি পোশাক, সিরামিক—সবকিছুর জন্য গ্যাস অপরিহার্য। অর্থাৎ, গ্যাস না থাকলে—অর্থনীতি থেমে যাবে।
২০০৯ সালে যখন শেখ হাসিনা সরকার দায়িত্ব নেয়, তখন দেশের গ্যাস উৎপাদন ছিল মাত্র ১৭৪৪ (mmcfd-এমএমসিএফডি)।
সেই সীমাবদ্ধতা কাটাতে সরকার নেয় পরিকল্পিত উদ্যোগ।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আমদানি—সবকিছু একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া হয়। এর ফলও আসে দ্রুত।
কোভিডের আগে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৭৫০ এমএমসিএফডি।
২০১৮ সালে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল যুক্ত হওয়ায়
মোট সরবরাহ উঠে যায় ৩৫০০+ এমএমসিএফডিতে।
কিন্তু এখানেই থেমে থাকেনি পরিকল্পনা।
কারণ, বাস্তবতা ছিল—দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন সময়ের সাথে কমবে।
তাই ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবেলায় আগেভাগেই নেওয়া হয়েছিল বড় উদ্যোগ।
👉 ১৫০টি কূপ খনন, ওয়ার্কওভার ও ডিপ ড্রিলিং
👉 লক্ষ্য: ২০২৬-২৮ সালের মধ্যে ৯৮৫ এমএমসিএফডি নতুন গ্যাস যুক্ত করা
পাশাপাশি নেওয়া হয় এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত
👉 মহেশখালীতে তৃতীয় FSRU (ক্ষমতা ৬০০ এমএমসিএফডি)
👉 পায়রায় চতুর্থ FSRU (Excelerate Energy)
এই দুটি চালু হলে ২০২৬-২৭ সালের মধ্যে
আরও প্রায় ১০০০ এমএমসিএফডি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতো।
এছাড়া মহেশখালীতে একটি ল্যান্ড-বেজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজও এগোচ্ছিল—
যা দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারতো। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল বৃহৎ আকারে পেট্রোক্যামিক্যাল ইন্ড্রাস্ট্রি তৈরির কাজ। কাতার, কুয়েত ও জাপানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ নিয়ে কার্যক্রম চলছিল।
সব মিলিয়ে পরিকল্পনা অনুযায়ী—
👉 ২০২৪ সালে ৩১০০+ এমএমসিএফডি সরবরাহ ছিল
👉 ২০২৬ সাল নাগাদ তা বেড়ে হতে পারতো প্রায় ৪৫০০ এমএমসিএফডি অর্থাৎ—একটি স্থিতিশীল জ্বালানি ভিত্তি তৈরি হচ্ছিল।
কিন্তু দেশের মানুষের ও অর্থনীতির দুর্ভাগ্য যে, একটি ম্যাটিক্যূলাস ডিজাইনের মাধ্যমে নির্বাচিত শেখ হাসিনা সরকারকে উৎখাত করে অবৈধভাবে ক্ষমতায় আসে ইউনুস। তার পরেই এই কূপ খনন, ওয়ার্কওভার এবং নতুন এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্পগুলো বাতিল করে দেয়।
ফলে—যে গ্যাস সামনে আসার কথা ছিল, সেটি আর আসেনি।
এখন প্রশ্ন—এর প্রভাব কী?
বর্তমানে এলএনজিসহ গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২৫০০ এমএমসিএফডিতে।
এবং দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন ধীরে ধীরে কমছেই।
অর্থাৎ—ঘাটতি আরও বাড়বে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—
এই ধরনের প্রকল্প একদিনে করা যায় না।
👉 একটি FSRU চালু করতে লাগে ৪ থেকে ৫ বছর
👉 ল্যান্ড-বেজড এলএনজি টার্মিনাল করতে লাগে ৫ থেকে ৭ বছর, টেন্ডার, চুক্তি, অর্থায়ন—সব মিলিয়ে সময় আরও বাড়ে।
মানে, আজ যদি নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়,
তবুও ফল পেতে কয়েক বছর লেগে যাবে।
অন্যদিকে, যদি আগের পরিকল্পনাগুলো চালু থাকতো—
👉 ২০২৬-২৭ সালেই ১০০০ এমএমসিএফডি বাড়তি গ্যাস
👉 ২০২৮ সালের মধ্যে আরও ৯৮৫ এমএমসিএফডি
অর্থাৎ—সংকট অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যেত
জ্বালানি খাতের সিদ্ধান্তের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি।
একটি ভুল সিদ্ধান্ত—বছরের পর বছর ধরে প্রভাব ফেলে।
আজকের বাস্তবতা হচ্ছে—
আমরা এমন এক পথে দাঁড়িয়ে আছি,
যেখানে সংকট শুধু বর্তমানের নয়—ভবিষ্যতেরও।
প্রশ্নটা এখন খুবই সরল—
আমরা কি নিজেদের পায়ে নিজেরাই কুড়াল মেরেছি?
লেখক: সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী
কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।
