একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব ছাত্রনেতা মুক্তি সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করতে নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁদেরই একজন ছিলেন আয়েশা খানম। পরে আগরতলায় গিয়ে আহ/ত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন তিনি।
নেত্রকোনা ও দুর্গাপুরের মাঝখানে গাবড়াগাতি গ্রামে ১৯৪৭ সালের ১৮ অক্টোবর জন্ম আয়েশা খানমের। পিতা গোলাম আলী খান এবং মা জামাতুন্নেসা খানম। হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বাতিলের দা/বিতে ১৯৬২ সালের ছাত্র আ/ন্দোলন থেকেই ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। তবে ১৯৬৬ সাল থেকে ছাত্র আন্দোলনে পুরোপুরি সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন তিনি।
এরপর ঊনসত্তরের গণ-অ/ভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনসহ স্বাধীনতা যু//দ্ধের পথে এগিয়ে যেতে যেসব আ/ন্দোলন-সং/গ্রাম সংঘটিত হয়েছিল, সেসবগুলোতেই সামনের সারিতে ছিলেন আয়েশা খানম।
১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ও সংগ্রামী নেত্রী। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন তিনি। এছাড়া রোকেয়া হলের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ও সহ-সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
ফলে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে ঢাকায় ছাত্র-ছাত্রীদের সংগঠিত করার দায়িত্ব ছিল মূলত আয়েশা এবং তাঁর সহকর্মী ছাত্রনেতাদের ওপর। ছাত্রনেত্রী হিসেবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাধিকার আ/ন্দোলনের পক্ষে জনমত গড়ে তোলা ও সচেতনতার কাজেও সক্রিয়ভাবে অংশ নেন তিনি।
এক সাক্ষাৎকারে আয়েশা খানম জানান, ‘‘ছাত্র সংগ্রাম কমিটি যেটা গঠিত হয়েছিল সেটার উপর দায়িত্ব ছিল সারাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করা। ফলে সেই কাজের সাথে বেশি জড়িত ছিলাম। এছাড়া বিশেষ করে সাতই মার্চের পর থেকে ঢাকা শহর সংগঠিত করা এবং যোগাযোগ রক্ষা ও সচেতনতা সৃষ্টির কাজ করছিলাম। সেসময়ের ব/ন্দু/ক কাঁ/ধে করা একটি ছবি এখন সবাই দেখতে পান সেখানে আমিও রয়েছি।’’
এপ্রিল মাসের শেষদিকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আগরতলায় যান আয়েশা খানম। সেখানে কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালিত শরণা/র্থী শি/বির ও মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প ক্রাফটস হোস্টেলে ওঠেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে যাঁরা ভারতে আসতেন, তাঁদের এক অংশের সাময়িক আবাসস্থল ছিল ক্রাফটস হোস্টেল।
সেখানে মুক্তিযোদ্ধা ও শরণা/র্থী শি/বিরগুলোতে সশরীরে উপস্থিত হয়ে যো//দ্ধাদের মনোবল অটুট রাখা, প্রণোদনা দেওয়া এবং শরণা/র্থীদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগাতে কাজ করেন আয়েশা ও তাঁর সহকর্মীরা।
আগরতলায় তাঁর কাজের কথা বলতে গিয়ে আয়েশা খানম জানান, ‘‘আগরতলায় আমি প্রাথমিক একটা প্র/শিক্ষণ নিই চিকিৎসা সেবার উপর। এরপর আগরতলার প্রতিটি ক্যা/ম্পে গিয়ে যু/দ্ধাহ/ত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সহায়তা দিতে আত্মনিয়োগ করি। এছাড়া বিভিন্ন অভিযানে মুক্তিযোদ্ধাদের পাঠানোর আগে তাদের জন্য সংক্ষিপ্ত ওরিয়েন্টেশনের ব্যবস্থা করা হতো। সেখানে তাদের ওরিয়েন্টেশন দেওয়ার কাজ করতাম। আমি যেহেতু আগে থেকেই সচেতনতা সৃষ্টির কাজে এবং বক্তৃতা ও কথা বলার ক্ষেত্রে জড়িত ছিলাম সেজন্যই বোধায় সেখানেও আমাকে এ ধরণের কাজেই বেশি করে জড়িত রাখা হয়েছিল।’’
এছাড়া ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ঐতিহাসিক বক্তৃতাও দিয়েছিলেন আয়েশা খানম।
মুক্তিযুদ্ধকালীন দীর্ঘ নয় মাসের নানা স্মরণীয় ঘটনার মধ্যে একটি তুলে ধরে আয়েশা খানম বলেন, ‘‘আমি প্রাথমিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ শেষে যেদিন প্রথম আহ/ত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায় যোগ দিলাম, সেটি ছিল আমার কাছে খুবই স্মরণীয়। কারণ আমি সেদিন খুব আনাড়ি হাতে হলেও আহ/ত কিশোর-তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষ/তস্থানগুলো পরিষ্কার করে যখন ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিচ্ছিলাম তখন আমার কাছে মনে হয়েছিল আমি সত্যিই দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য সরাসরি কোন কাজ করছি।’’
ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে পথচলার শুরু, তা ধাপে ধাপে তাঁকে নিয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রা/মের আরও প্রত্যক্ষ পরিসরে। ছাত্রনেত্রী আয়েশা খানম সেই সময় ঢাকায় সংগঠিত করেছেন ছাত্র-ছাত্রীদের, জনমত গড়ে তুলেছেন, আর পরে আগরতলায় গিয়ে আহ/ত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা ও যো//দ্ধাদের ওরিয়েন্টেশনের কাজে যুক্ত হয়েছেন। এভাবেই ছাত্রনেত্রী থেকে নারীনেত্রী হয়ে ওঠেন মুক্তিযোদ্ধা আয়েশা খানম।
তথ্য কৃতজ্ঞতা: ডয়েচে ভেলে
