দেশের অর্থনীতি বড়সড় সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা শঙ্কিত। গতকাল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ কয়েকটি দেশের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। যাতে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির তালিকায় থাকা ওষুধ এবং তৈরি পোশাক খাতসহ বিভিন্ন পণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক গুণতে হবে বাংলাদেশকে। এই ধাক্কা সামলে ওঠা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এই দুটি শিল্পের উদ্যোক্তাদের জন্য দুরূহ হয়ে উঠবে বলে অর্থনীতিবিদরা ইতিমধ্যে অভিমত দিয়েছেন।
বাংলাদেশের ওপর এই অতিরিক্ত শুল্কারোপ স্বাভাবিক নয়, এটিকে বলা হচ্ছে প্রতিশোধমূলক শুল্কারোপ। বাংলাদেশি রপ্তানিযোগ্য পণ্যের ওপর ইতিপূর্বে ১৫ শতাংশ শুল্ক ধার্য করা থাকলেও এবার তা বাড়িয়ে ৩৭% করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।
অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস ও তার প্রশাসনের লোকজন বিগত কয়েক মাস ধরে মার্কিন সরকারের সাথে সুসম্পর্কের বড়াই করে গেছেন, সেই সাথে বিভিন্ন দেশের সাথে সুসম্পর্ক তৈরি করে নানাবিধ সুবিধা আদায়ের স্বপ্নও দেখিয়েছিলেন। যার ধারাবাহিকতায় চীন সফরে যান ইউনূস। শেখ হাসিনার সরকারের সাথে চীন সরকারের বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতার কৃতিত্ব ইউনূস-সরকারের নামে চালিয়ে দিয়েছে প্রেস উইং।
কিন্তু ড. ইউনূসের চীন সফর যে ভালোভাবে নেয়নি ট্রাম্প সরকার, তার প্রমাণ মিলল হাতে হাতেই।
এমনিতে সারাদেশে হাজার হাজার শিল্প কারখানা বন্ধ, লাখ লাখ শ্রমিক বেকার, কর্মরত আরও কয়েক লাখ শ্রমিক পাননি বেতন-ভাতা, এরমধ্যে এই ৩৭% শুল্কারোপ দেশের অর্থনীতিকে যে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে ফেলছে, তা বলাই বাহুল্য। অথচ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চোখ মেললেই দেখা যাচ্ছে জুলাই-আগস্টের সরকারবিরোধী আন্দোলনের সমর্থক ‘লালবদর’ গোষ্ঠীর মন্তব্য- দেশে সবজির দাম কম! দেশের পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, মানুষ কম দামে সবজি খাচ্ছে, এটাকেই ইউনূস-সরকারের সাফল্য দাবি করছে তারা।
গতকাল হোয়াইট হাউজেরে পক্ষ থেকে প্রকাশিত শুল্ক তালিকায় দেখা গেছে, যেসব দেশের ওপর অতিরিক্ত হারে শুল্কারোপ করা হয়েছে, তালিকায় বাংলাদেশ রয়েছে তৃতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় গন্তব্য। এই অতিরিক্ত শুল্কারোপ গত আগস্টের পর থেকে ধুঁকতে থাকা দেশের পোশাক শিল্পকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়ার মত একটা বড় ধাক্কা, এটা হয়ত এখনও ইউনূস-প্রশাসন উপলব্ধিই করতে পারেনি। উল্টো তার সরকারের লোকজন হাস্যকর ও ছেলেমানুষী কথাবার্তা বলে যাচ্ছেন।
গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পোশাক শিল্পের কাঁচামাল তুলা আমদানি করলে তারা বাংলাদেশের ওপর শুল্কারোপ করতে দ্বিধাবোধ করবে। অথচ তিনি বোধহয় জানেনই না, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ পোশাক শিল্পের জন্য তুলা আমদানি করে নিয়মিত। হয়ত তিনি তার সরকারের সমর্থকদের ছেলে-ভোলানো স্বান্তনা দিতেই বলেছেন কথাটা।
গত বছর আগস্টে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর থেকেই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বারবার হোঁচট খাচ্ছে ইউনূস-প্রশাসন। শেখ হাসিনার সরকারের যেসব চুক্তি কিংবা সিদ্ধান্ত নিয়ে গুজব ও রটনা রটানো হয়েছিল, সেসব চুক্তি বাতিল তো হয়নি, বরং এরচেয়ে সুবিধাজনক বিকল্প বের করতে না পেরে শেখ হাসিনার পদাঙ্ক অনুসরণ করতে হচ্ছে বাধ্য হয়ে ইউনূস-সরকারকে।
ভারতবিরোধীতার জুজু ছড়ালেও দিনে দিনে বাড়ছে ভারত থেকে আমদানির পরিমাণ। তবুও সবজির দাম কম বলে চেঁচাচ্ছে ইউনূস-সমর্থকরা। যদিও প্রকৃত সত্য হচ্ছে, বাংলাদেশের বাজারে যেসব সবজি দেখা যায়, তারও অনেকটা আসছে ভারত থেকে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে দিনকে দিন। খুন-ধর্ষণ, চাঁদাবাজি-ছিনতাই, অপহরণ এখন প্রকাশ্য। মানুষ ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় গাড়ির ভেতরে গুলি করে জোড়া খুনের ঘটনায় নিকটেই উপস্থিত ছিল পুলিশের টহল গাড়ি। এমনকি সন্ত্রাসীদের ধাওয়া খেয়ে পুলিশের কাছে সহযোগিতাও চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু পুলিশ তাদের রক্ষা করতে পারেনি। সন্ত্রাসীরা ঘুরছে ভয়ঙ্কর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে সশস্ত্র মহড়ার ভিডিও।
গত বছরের ৪ঠা আগস্ট থেকে ৮ই আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশে ৪৬০টির বেশি থানায় হামলা, নিধনযজ্ঞ ও অস্ত্রশস্ত্র লুটপাট করা হয়। পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর অত্যাধুনিক অস্ত্র, গোলাবারুদ, নিরাপত্তা সামগ্রী চলে গেছে সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের হাতে। উদ্ধারের কোনো তৎপরতা নেই। সাতকানিয়ায় জামায়াতের দুই কর্মী আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়িতে ডাকাতি করতে গিয়ে গণপিটুনিতে নিহত হয়। তাদের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত অস্ত্র শনাক্ত হয় চট্টগ্রাম কোতয়ালী থানা থেকে লুটকৃত হিসেবে। বাকলিয়ায় ডাবল মার্ডারের ঘটনায় বৃষ্টির মত গুলি করা হয়েছে যে অস্ত্র দিয়ে, সেসব অস্ত্রও থানা থেকে লুটের অস্ত্র বলে ধারণা পুলিশের।
সারাদেশে সশস্ত্র সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের তৎপরতা বহুগুণে বাড়লেও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর (অব.) দাবি, ভারতের মিডিয়া মিথ্যা সংবাদ প্রচার ও গুজব রটিয়ে যাচ্ছে। তারা বাংলাদেশ নিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে। দেশের মিডিয়াকে এই অপ্রচার প্রতিহতের নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি কবে হবে, সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ৫ই আগস্টের পরে বিভিন্ন থানার লুট হওয়া সব অস্ত্র উদ্ধার হলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও উন্নতি হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। অথচ এই একই রেকর্ড তিনি বাজিয়ে যাচ্ছেন গত বছর দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই। এখন পর্যন্ত অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধারের দৃশ্যমান তৎপরতা দেখা যায়নি। বরং অপারেশন ডেভিল হান্টের নামে আওয়ামী লীগের লোকজনকে ধরে ধরে কারাগারের শূন্যস্থান পূরণ করছে যৌথবাহিনী। কিন্তু সশস্ত্র জঙ্গি-সন্ত্রাসীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে নাকের ডগায়।
তবুও ইউনূস-সরকারের সমর্থকরা ভাঙা রেকর্ড বাজিয়ে যাচ্ছেন- দেশে সবজির দাম কম।