।। এজাজ মামুন।।
প্রথমেই আমি এমন একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই, যা বাংলাদেশে কিছু গণমাধ্যম এবং নাগরিকরা বর্তমান পরিস্থিতির মূল কারণ হিসেবে দেখছেন- সরকারি চাকরির কোটা ব্যবস্থা। বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা ব্যাপক বৈষম্যপূর্ণ, যেখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে প্রায়ই পিছিয়ে থাকে। এ অসমতা দূর করার লক্ষ্যে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল, যাতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, নারী এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানরা যথাযথ প্রতিনিধিত্ব পায়। তবে, কয়েক বছর আগে এক ছাত্র আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সব ধরনের কোটা বাতিল করা হয়।
আদালতের রায়ের মাধ্যমে চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহাল করার পর, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্ররা আন্দোলনে নেমে দাবি করে, এটি এখন আর ন্যায়ের প্রতীক নয়; বরং বৈষম্য সৃষ্টি করছে এবং মেধার মূল্যায়নে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানের জন্য কোটা বাতিলের দাবি তোলে। প্রথমদিকে, জুলাইয়ের এই আন্দোলনের উদ্দেশ্যকে সহজ ও স্বচ্ছ মনে হয়েছিল। তবে, দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের পর বাংলাদেশের মানুষ এখন বিশ্বাস করে যে, এই আন্দোলন ছিল একটি ছদ্মাবরণ, যার লক্ষ্য ছিল দেশের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দুর্বল করা।
এই আন্দোলনের অন্তরালে থাকা কৌশল চিহ্নিত করা কঠিন ছিল, কারণ ধূর্ত ও অসৎ ছাত্রনেতারা ‘সুপরিকল্পিত’ কৌশল ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জাতীয় আবেগের সঙ্গে নিজেদের কার্যক্রম মিশিয়ে দিয়েছিল।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভের বার্ষিক সভায় বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ড. ইউনূস, স্বীকার করেন, শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরিকল্পনাটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ছিল। তার ভাষায় এটা ছিল- মেটিক্যুলাসলি ডিজাইনড প্ল্যান।
তিনি বলেন, “এটি হুট করে ঘটেনি। এটি খুবই সুপরিকল্পিত একটি বিষয় ছিল। এমনকি কে বা কারা এর নেতৃত্ব দিচ্ছে, তাদেরও চিনতে পারেনি কেউ, তাই তারা তাকে ধরতে পারেনি।”
ড. ইউনূসের এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি ষড়যন্ত্রের নেপথ্যের কুশীলবদের বিষয়ে ইঙ্গিত দেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি স্পষ্ট করেন, কিছু দুষ্টচক্র সক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। তবে, এটিও অত্যন্ত সম্ভব যে, ড. ইউনূস সরাসরি এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত এবং শেখ হাসিনা ও তার সরকারকে অপসারণের প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।
ড. ইউনূসের ‘সুপরিকল্পিত’ ষড়যন্ত্রের প্রমাণ হিসেবে বেশ কিছু তথ্য পাওয়া যায়, যার মধ্যে অন্যতম হলো যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক অর্থায়ন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউজে মার্কিন গভর্নরদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবকাঠামোকে শক্তিশালী করার জন্য ২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়, যা মাত্র দুই কর্মচারী বিশিষ্ট একটি অজানা প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের ডেপুটি আন্ডার সেক্রেটারি ব্রেন্ট নাইম্যানের নেতৃত্বে একটি মার্কিন প্রতিনিধিদল ড. ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। এরপর, ইউএসএআইডি (USAID) ২০২১-২০২৬ সময়কালে ১ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা প্রতিশ্রুতি দেয়, যার মধ্যে ২০২ মিলিয়ন ডলার নতুন করে বরাদ্দ করা হয়। তবে, এই অর্থ কোথায় এবং কীভাবে খরচ করা হয়েছে, তা অজানা।
কেউ কেউ মনে করেন, ড. ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। যদিও এটি বিতর্কিত একটি বিষয়, তবে গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে তিনি বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন এবং বহু নেতার সঙ্গে লবিং করেছেন, যাদের মধ্যে কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য কুখ্যাত। গ্রামীণ ব্যাংকের ভাবমূর্তি ব্যবহার করে ড. ইউনূস ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করেছেন। এটিও সম্ভাবনা রয়েছে যে, তিনি মার্কিন গভীর রাষ্ট্রের (deep state) ষড়যন্ত্রকে সহযোগিতা করেছেন।
ড. ইউনূস দীর্ঘদিন ধরে বিল ক্লিনটন ও হিলারি ক্লিনটনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের অন্যতম বড় দাতা। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালীন, হিলারি ক্লিনটন তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে বিতাড়িত হওয়ার পরও ইউনূসের জন্য ১৩ মিলিয়ন ডলারের বেশি অনুদান, চুক্তি এবং ঋণ অনুমোদন করেন। এই অর্থ ১৮টি ভিন্ন ইউএসএআইডি (USAID) প্রকল্পের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়েছিল।
এছাড়া, হিলারি ক্লিনটন বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনার সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করেন, যাতে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতি তদন্ত বন্ধ করা হয়।
বাংলাদেশের পদ্মা সেতু প্রকল্পের সময়, হিলারি ক্লিনটন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হুমকি দেন যে, বিশ্বব্যাংক এই প্রকল্পের জন্য অনুমোদিত ১.২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ বাতিল করতে পারে। শেখ হাসিনা সেই চাপ অগ্রাহ্য করেন।
হাঙ্গেরিয়ান-আমেরিকান বিলিয়নিয়ার জর্জ সরোস দীর্ঘদিন ধরে ড. ইউনূসের সমর্থক। ইস্ট-ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট সোরোসের ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত এবং ইউএসএআইডি থেকে ২৭০ মিলিয়ন ডলার গ্রহণ করেছে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, সরোস এই অর্থ বিভিন্ন দেশে অস্থিরতা ছড়ানোর কাজে ব্যবহার করেছেন, যার মধ্যে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, ইউক্রেন, সিরিয়া, ইরান, পাকিস্তান, ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং আরও কিছু দেশ অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর, জর্জ সোরোসের ছেলে এবং ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান, অ্যালেক্স সোরোস, দুইবার বাংলাদেশ সফর করেন এবং ড. ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, যেখানে বাংলাদেশের পুনর্গঠনের কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়।
এটি শুধু কয়েকটি উদাহরণ, যা দেখায় কীভাবে ড. ইউনূস ‘সুপরিকল্পিত’ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর চেষ্টা করতে পারেন।