চীনের উত্তরাঞ্চলের বন্দরনগরী তিয়ানজিনে আজ শুরু হচ্ছে্ সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) দুই দিন ব্যাপী সম্মেলন।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের আমন্ত্রণে ইতোমধ্যে তিয়ানজিনে পৌঁছেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি-সহ প্রায় ২০টি দেশের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।
২০০১ সালে এসসিও জোট গঠিত হবার পর এবারই সবচেয়ে বড় বৈঠক হতে যাচ্ছে। প্রায় ২০টি দেশের শীর্ষ নেতারা ছাড়াও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের এই সম্মেলনে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের ইউরোপীয় মিত্রদের নিয়ে গঠিত সামরিক জোট ন্যাটো’র বিকল্প হিশেবে চীন এই অ-পশ্চিম জোটে নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরির চেষ্টা করছে।
এই সম্মেলন শেষ হওয়ার পর আগামী বুধবার চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির ৮০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এক বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হবে।

এসসিও সম্মেলনে যোগ দিতে চীনের বন্দরনগরী তিয়ানজিনে এসেছেন মিসরের প্রধানমন্ত্রী মুস্তাফা মাদবুলি, কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানেত। সম্মেলনে আগত কয়েকটি দেশের নেতাদের সঙ্গে গতকাল শনিবার সাক্ষাৎ করেছেন চীনর প্রধানমন্ত্রী শি জিন পিং।
এসসিও সম্মেলনের ফাঁকে আরও কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক আয়োজনের কথাও শোনা যাচ্ছে। যেমন আগামীকাল রাশিয়ার প্রসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ও ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সঙ্গে যথাক্রমে ইউক্রেন সংঘাত ও তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে পারেন।
জাপানের সোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও পূর্ব এশিয়া বিশেষজ্ঞ লিম তাই ওয়েই বলেন, পুতিনের জন্য বিশ্বমঞ্চে খেলোয়াড় হিসেবে এসসিওর সব সুবিধা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির সমর্থনও তাঁর দরকার।
পাশাপাশি রাশিয়া ভারতের মন জয় করতেও আগ্রহী। বাণিজ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে যে ফাটল দেখা দিয়েছে, তা এখন রাশিয়ার সামনে বড় ধরনের সুযোগ হয়ে এসেছে।
এমন একটি সময়ে চীনে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক কার্যকর হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে রাশিয়ার তেল কেনার জন্য শাস্তিস্বরূপ আরও অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। গত বুধবার থেকে এই শুল্ক কার্যকর হয়েছে।
ওদিকে জাপান সফর শেষে গতকাল সন্ধ্যায় চীনের তিয়ানজিনে পৌঁছান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এটি ২০১৮ সালের পর তাঁর প্রথম চীন সফর।
চীন ও ভারত দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সীমান্ত নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। গত বছর অক্টোবরে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত একটি সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন মোদি।
পাঁচ বছরের মধ্যে যা ছিল দুই নেতার প্রথম মুখোমুখি সাক্ষাৎ। ওই সাক্ষাতের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে। এবারের সম্মেলন থেকে চীন ও ভারতের সম্পর্ক আরো শক্তিশালী করার দিকে উভয় দেশের আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বিশেষ করে মার্কিন আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে চীন, ভারত ও রাশিয়া এখন এসসিও জোটকে আরো শক্তিশালী করার প্রত্যাশা করছে।
মার্কিন ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য ক্ষুন্ন করতে ইতোমধ্যে ব্রিকস সম্মেলনে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা নতুন মুদ্রা চালুর কথা ভাবছে। ব্রিকসকে শক্তিশালী করতে এবার এসসিও জোট নতুন ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণের দিকেই আগাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের এসসিও সম্মেলনে ২০টি দেশের নেতাদের অংশগ্রহণ চীনের প্রভাব বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে। যা অ-পশ্চিমা দেশগুলোর সামনে এসসিওকে আরো আকর্ষণীয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
আজ রোববার (৩১ আগস্ট) চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং উদ্বোধনী ভাষণে বলেন, ড্রাগন (চীন) এবং হাতির (ভারত) একত্রিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব এখন পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। চীন ও ভারত দু’টি সবচেয়ে সভ্য দেশ।
আমরা বিশ্বের সর্বাধিক জনবহুল দু’টি দেশ এবং গ্লোবাল সাউথের অংশ। তাই আমাদের জন্য বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, ভালো প্রতিবেশী হওয়া এবং ড্রাগন ও হাতির একত্রিত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উভয় দেশের উচিত কৌশলগত ও দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পর্ক পরিচালনা করা।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এ বছর চীন-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫তম বার্ষিকী উদযাপনের কথা তুলে ধরে বলেন, বহুপাক্ষিকতা, বহুমেরু বিশ্ব এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে আরও বেশি গণতন্ত্র বজায় রাখার জন্য আমাদের অবশ্যই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। এশিয়া ও বিশ্বজুড়ে শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য আমাদের একসাথে কাজ করতে হবে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার উদ্বোধনী ভাষণে বলেন, ভারত পারস্পরিক বিশ্বাস, সম্মান এবং সংবেদনশীলতার ভিত্তিতে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এসসিওর সদস্যদেশগুলো হলো চীন, ভারত, রাশিয়া, পাকিস্তান, ইরান, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান ও বেলারুশ। এছাড়া ১৬টি দেশ এই জোটে পর্যবেক্ষক বা ‘সংলাপ সহযোগী’ হিশেবে যুক্ত আছে।