শেরপুরের শ্রীবরদীর দহেরপাড় গ্রামের নাম হয়তো বড় কোনো মানচিত্রে চোখে পড়ে না। কিন্তু এখানকার মাটিতে যে গল্পগুলো রচিত হচ্ছে, তা বাংলাদেশের অসংখ্য গ্রামের অভিন্ন চিত্র। সেসব গল্পের একটিতে রয়েছেন কৃষক আকবর আলী—পঞ্চাশ বছর বয়সী, পরিশ্রমী, দরিদ্র অথচ মর্যাদাবোধে দৃঢ়। সম্প্রতি তিনি এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন—সুদে নেওয়া সামান্য টাকার জেরে নিজের গ্রামেই তিনি অপমানিত, নির্যাতিত এবং আহত হয়েছেন।
প্রায় এক বছর আগে আকবর আলী বারেক নামের এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা ধার নেন। অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়ে, বীজ ও সার কেনার জন্য তিনি এই টাকা নিয়েছিলেন। চুক্তি অনুযায়ী প্রতি মাসে চার হাজার টাকা সুদ পরিশোধ করতেন নিয়মিত। মূল টাকা ফেরত দেওয়ার পরও যখন বারেক অতিরিক্ত দুই হাজার টাকা দাবি করেন, আকবর আলী তাতে রাজি হননি। এ থেকেই শুরু হয় ভয়াবহ পরিণতি।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে বারেক, আবু সামা ও বনিজ উদ্দিন আকবর আলীর বাড়িতে গিয়ে তাকে বেধড়ক মারধর করে। তারপর রশি দিয়ে বেঁধে টেনে নিয়ে যায় আবু সামার বাড়িতে। গ্রামের মানুষ হতভম্ব হয়ে দেখে—একজন কৃষককে রাস্তার সিমেন্টের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করা হচ্ছে। পরে স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে আকবর আলীকে। আহত শরীর, ভাঙা আত্মসম্মান আর তীব্র অপমানের দাগ নিয়ে তিনি এখন ন্যায়বিচারের আশায় শ্রীবরদী থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন।
বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে সুদ ব্যবসা কোনো নতুন বিষয় নয়। কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ পাওয়া আজও কঠিন। কাগজপত্র, জামানত, জটিল প্রক্রিয়া—সবকিছু মিলিয়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে স্থানীয় “সুদখোর”দের দ্বারস্থ হন। একবার এই চক্রে পড়লে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব। সুদের হার এমনই অমানবিক যে, মূল টাকা পরিশোধ করেও মানুষ ঋণের ফাঁদে বন্দি থেকে যায়।
দহেরপাড়ের আকবর আলীর ঘটনাটি তারই প্রতিচ্ছবি। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এটি “অর্থনৈতিক সহিংসতা”—যেখানে টাকা হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র। সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, এ ধরনের সুদ ব্যবসা শুধু অর্থ নয়, মানুষের সামাজিক মর্যাদাও ধ্বংস করে দেয়। একজন কৃষক, যিনি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন, তিনিই আজ নিজের গ্রামে অপমানের শিকার হচ্ছেন।
গ্রামের মানুষদের মতে, এ ধরনের সুদ ব্যবসা চলতে পারে না প্রভাবশালী কারও আশ্রয় ছাড়া। স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক যোগাযোগ থাকা সুদখোরদের নিরাপত্তা দেয়। অভিযোগ রয়েছে, ইউনুসের অর্থনৈতিক প্রভাবের ছত্রছায়ায় এই সুদ ব্যবসা এখন নতুন করে জোর পাচ্ছে। ফলে গ্রামীণ সমাজে ন্যায়বোধ দুর্বল হচ্ছে, ভয় তৈরি হচ্ছে, এবং মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধেও চুপ করে যাচ্ছে।
সুদের ফাঁদে পড়া মানুষ শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত হয়। তারা আত্মসম্মান হারায়, সমাজে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, এমনকি আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়—যার উদাহরণ বাংলাদেশে কম নয়। অথচ আইন অনুযায়ী সুদ ব্যবসা অপরাধ। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেই আইন প্রয়োগের চিত্র একেবারেই দুর্বল।
শ্রীবরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনোয়ার জাহিদ জানিয়েছেন, অভিযোগ পেয়েছেন এবং তদন্ত চলছে। কিন্তু শুধু তদন্ত নয়—প্রয়োজন দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার। কারণ, এ ধরনের ঘটনাগুলো যদি উদাহরণস্বরূপ শাস্তি না পায়, তবে গ্রামের পর গ্রামের কৃষক আবারও এই অন্ধকার ফাঁদে পড়বে।
একই সঙ্গে দরকার বিকল্প সমাধান। কৃষকদের জন্য সহজ ও সুদমুক্ত ঋণ ব্যবস্থা, স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি।
প্রতিটি ইউনিয়নে কৃষিঋণ কমিটি ও সহায়ক তহবিল থাকলেও তা প্রায় অকার্যকর। এই সুযোগেই সক্রিয় হচ্ছে ব্যক্তিগত সুদ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। রাষ্ট্র যদি কৃষকের পাশে না দাঁড়ায়, তবে এই অনৈতিক অর্থব্যবস্থা গ্রামীণ জীবনের মেরুদণ্ড আরও ভেঙে দেবে।
আকবর আলী শুধু একজন ভুক্তভোগী নন—তিনি বাংলাদেশের লাখো কৃষকের প্রতিচ্ছবি। যাদের শ্রমে দেশের খাদ্যশস্য উৎপন্ন হয়, কিন্তু যাদের ঘাম মিশে যায় অন্যের লাভের স্রোতে। তারা আমাদের সমাজের নীরব স্তম্ভ, অথচ তাদের ওপরই নেমে আসে অন্যায়ের হাত।
এই ঘটনার পর দহেরপাড়ের গ্রামজুড়ে ভয় আর ক্ষোভের মিশ্র অনুভূতি। কেউ মুখ খোলে না, কেউ ফিসফিস করে বলে—“আজ আকবর, কাল আমি হতে পারি।”
এই ভয়ই আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় বিপদ।
একটি দেশের উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নয়, তার ন্যায়ের বোধের উপর নির্ভর করে। আকবর আলীর আর্তনাদ আমাদের সেই বোধকে প্রশ্ন করে—আমরা কি সত্যিই মানবিক সমাজ গড়তে পেরেছি?
সুদখোরদের লাঠি আর রশির কাছে যদি একজন কৃষকের মানবতা অপমানিত হয়, তবে রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল পরিসংখ্যানেই থাকে, বাস্তবে নয়।আজ দরকার একটাই—ন্যায়বিচার ও মানবতার জাগরণ। যেন আর কোনো কৃষক নিজের ঘরের উঠানে বেঁধে নির্যাতিত না হয়।
