বিশেষ প্রতিবেদক
আজ ৪ঠা ডিসেম্বর। একাত্তরের এ দিনে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের অন্যতম নিষ্ঠুর গণহত্যা সংগঠিত হয়েছিল। এ দিন তিন শতাধিক সদস্যের প্রশিক্ষিত রাজাকার বাহিনী হিন্দুসহ স্থানীয় মুক্তিকামী সাধারণ মানুষের ওপর বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ চালায়। তারা গ্রামে গ্রামে ঢুকে নারীদের ধর্ষণ, নারীদের তুলে নিয়ে যাওয়া, বাড়িঘরে আগুন ও লুটপাটসহ ২৬ জনকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করেছিল। ছেলে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ায় বাবাকে ধরে এনে গাছে ঝুলিয়ে চোখ উপড়ে, শরীরের চামড়া তুলে নির্যাতন করে বীভৎসভাবে হত্যা করা হয়েছিল।
এই হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্ব দেন এই সময়ের আলোচিত আইনজীবী- গুপ্ত সংগঠন ছাত্র শিবিরের সাবেক সেক্রেটারি ও সুনামগঞ্জ-২ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী শিশির মনিরের বাবা চাচাসহ তার স্বজনরা। গত বছরের ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর শিশির মনিরের ভয়ে ও তার স্বজনদের অত্যাচারে এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজন।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত একাধিক গ্রন্থ থেকে জানা যায়, একাত্তরে বিজয়ের প্রাক্কালে ৪ঠা ডিসেম্বর ভোরে শিশির মনিরের বাবা মুকিত মনির, চাচা হাওরাঞ্চলের দুর্ধর্ষ রাজাকার ও তৎকালীন পিডিপি নেতা আব্দুল খালেক, চাচা আব্দুস সোবহান, এলিম উদ্দিনসহ স্বজনরা আশপাশের গ্রামের তিন শতাধিক প্রশিক্ষক রাজাকার সদস্য নিয়ে মুক্তিকামী মানুষদের হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে।
নিজ গ্রাম দৌলতপুরের পার্শবর্তী পেরুয়া হিন্দু সম্প্রদায়ের গ্রামে গণহত্যা ও নারী নির্যাতন চালায় তারা। শ্যামারচর হাইস্কুলের সামনে পেরুয়া গ্রামের নিরীহ মানুষদের জড়ো হওয়ার নির্দেশ দেয়। প্রাণভয়ে হিন্দুরা জড়ো হওয়ার পর শিশির মনিরের বাবা মুকিত মনির ও তার চাচা আব্দুল খালেক তাদেরকে জোর করে ধর্মান্তরিত করায়। পরে তাদের নির্দেশে নদীর তীরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে। ঘটনাস্থলেই শহিদ হন ২৬ জন। বয়স কম হওয়ায় মাথার উপর দিয়ে গুলি চলে যাওয়ায় বেঁচে যান কয়েকজন।
নিরীহ মানুষের রক্তে ওইদিন পুরাতন সুরমা নদীর পানি লাল হয়ে গিয়েছিল। গণহত্যা চালানোর পর পেরুয়া, দাউদপুরসহ আশপাশের গ্রামে ঢুকে লুটপাট শুরু করে রাজাকার বাহিনী। ঘর থেকে নারীদের ধরে নিয়ে আসে, প্রকাশ্যে ধর্ষণ করে রাজাকাররা।
বিজয়ের আভাস পেয়ে পেরুয়া গ্রামবাসীসহ আশপাশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজন প্রকাশ্যে বেরিয়ে আসেন ডিসেম্বরের শুরু থেকেই। যা ভালো চোখে নেয়নি শিশির মনিরের পরিবারের স্বাধীনতাবিরোধীরা। তারা আগেই শ্যামারচর বাজারের পুলিশ ফাঁড়ির সব অস্ত্র লুটে বাড়িটি সুরক্ষিত করে নেয়। শ্যামারচর বাজারে আমীর উদ্দিনের রাইস মিলে পাকিস্তানিদের ক্যাম্প স্থাপন করে খালেক ও মুকিত মনির রাজাকার। ওই ক্যাম্পে পেরুয়া থেকে ধরে আনা নারীদের রেখে রাতদিন নির্যাতন করে। সুনামগঞ্জ মুক্তদিবসের পর বীর মুক্তিযোদ্ধারা এসব বীরাঙ্গনা বিবস্ত্র নারীদের উদ্ধার করে পরিবারের কাছে পৌছে দেন।
মুক্তিযুদ্ধের পরপর রাজাকাররা গা ঢাকা দেয়। পঁচাত্তরের পর ফিরে আসে। অর্থবিত্ত ও প্রভাবশালী স্বজনদের কারণে ধীরে ধীরে পুনরায় এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে শিশির মনিরের পরিবার। শ্যামারচর বাজারের গণহত্যাস্থল মুছে ফেলতে তারা গণবাথরুম তৈরি করে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বধ্যভূমি উদ্ধার করে স্মৃতিসৌধ তৈরি করতে চাইলে আদালতে মামলা করে শিশির মনিরের পরিবার।
একাত্তরের ৪ঠা ডিসেম্বর পেরুয়া গ্রামের রামকুমার রায়, তার ছেলে চিত্তরঞ্জন রায়, ভাই ডা. রামানন্দ রায়, ভাতিজা সমর রায়, হিমাংশু শেখর রায় এবং বোনের ছেলে মিলন রায়কে গুলি করে হত্যা করে রাজাকার বাহিনী। নারী ও শিশুদের সামনেই ঘটে এই বিভীষীকাময় ঘটনা। রাম কুমার রায়ের স্ত্রী কণকপ্রভা রায় তার ছেলে চিত্তরঞ্জন রায়কে বাঁচাতে ঝাঁপ দিলে রাজাকারদের গুলিতে তার মুখের ডান পাশ উড়ে যায়। বছর খানেক পর স্বামী-সন্তানের শোকে বিনা চিকিৎসায় মারা যান তিনি। ওইদিন রাজাকাররা কুঞ্জলাল দাস, রাম লাল দাস, হরলাল দাস, কষ্ণ দাস, সুখলাল পুরকায়স্থ, জ্যোতিষ রায়সহ অনেককে হত্যা করেছিল।
জানা যায়, পেরুয়া গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পরই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে চলে যান। এলাকার প্রভাবশালী ও অসাম্প্রদায়িক রামচন্দ্র রায়ের পরিবারসহ ১৫-২০টি পরিবার গ্রামে থেকে যায়। ৪ঠা ডিসেম্বর দৌলতপুর গ্রামের রাজাকার আব্দুল খালেক-মুকিত মনিরের নেতৃত্বে গণহত্যা চালানো হয়েছিল ওই গ্রামে।
শ্যামারচর বাজারে গণহত্যার পর পেরুয়া গ্রামের আখালি দাশকে গুলি করে হত্যা করে তার চোখ তুলে নেয় রাজাকাররা। ছেলে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার অপরাধে সুখলাল পুরকায়স্থকে গাছে ঝুলিয়ে শরীরের চামড়া ছিলে লবণ ছিটিয়ে নির্যাতন করে হত্যা করে। স্বাধীনতার পর তার মুক্তিযোদ্ধা ছেলে ধীরেন্দ্রকে গ্রামে ফিরতে দেয়নি মুকিত মনিরের পরিবার। ওইদিন রাজাকাররা গ্রামের পাড়ানি ব্রজেন দাশকে নৌকা পারাপারে বাধ্য করে। কাজ শেষ হলে তাকেও গুলি করা হয়।
এদিকে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর আবার শিশির মনিরের প্রভাবে তার স্বজনরা প্রকাশ্যে এসে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু করেছে। তার ভয়ে একাধিক মুক্তিযোদ্ধা পরিবার এলাকা ছেড়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে।
উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সারাদেশে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি উঠলে পেরুয়ার ভুক্তভোগীদের স্বজনরা মামলা করেন। শিশির মনিরের বাবা মুকিত মনিরসহ তার স্বজনদের বিরুদ্ধে মামলা হলে তার বাবা ও ভাইয়েরা যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যায়। তাদেরকে পালিয়ে যেতে এবং আওয়ামী লীগ আমলে পূর্ণ নিরাপত্তা প্রদানের অভিযোগ রয়েছে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সংসদ সদস্য মতিউর রহমান ও সংরক্ষিত সদস্য শাহানা রব্বানীর বিরুদ্ধে। বিচার বিলম্ব করতে এই দুইজনই বিশেষ ভূমিকা রাখেন বলেও তৃণমূল কর্মীদের অভিযোগ।
২০১৬ সালে একাত্তরের ভুক্তভোগী পরিবার চারটি অভিযোগ দায়ের করেছিল। এর মধ্যে তিনটি আমলে নেয় যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ২০১৬ সালের ২১শে মার্চ ট্রাইব্যুনাল তদন্ত শুরু করে। ২০১৯ সালের ১৭ই জুন ১১ জন যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে তদন্ত সংস্থা।
অভিযোগে রাজাকাররা ৩৪ জনকে হত্যা, ৫ জনকে ধর্ষণ, ৩০টি বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, ৩১ জনকে অপহরণ, ১৪ জনকে নির্যাতনের প্রমাণ পায়। ৩২ জন ভুক্তভোগীর সাক্ষী নেয় তদন্ত সংস্থা। জমা দেওয়া হয় ১৫০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের কমপ্লেইন্ট রেজিস্টারের ৬৪নং ক্রমিকে ২১শে মার্চ ২০১৬, আইসিটি বিডি কেস নং ০৫/২০১৮-এ এই মামলা সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য লিপিবদ্ধ রয়েছে।
তবে এসব আলামত এখন শিশির মনির তার প্রভাব খাটিয়ে মুছে ফেলতে চাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ( ৪ ডিসেম্বর, ২০২৫, বিডি ডাইজেস্ট পোর্টালে প্রকাশিত)
