বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতার পটভূমিতে হিন্দু যুবক দীপু চন্দ্র দাসের নৃশংস গণপিটুনির ঘটনা বিশ্ব বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ভারত ও জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং ইউনূস সরকারের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার জোরালো দাবি উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান রাজা কৃষ্ণমূর্তি এক বিবৃতিতে ঘটনাটিকে “লক্ষ্যভিত্তিক ও ভয়াবহ সহিংসতা” হিসেবে আখ্যায়িত করেন। রোববার (২১ ডিসেম্বর ২০২৫) প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে তিনি বলেন,
“বাংলাদেশে বিপজ্জনক অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে একজন হিন্দু নাগরিককে প্রকাশ্যে হত্যা করা গভীরভাবে মর্মান্তিক। বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই দোষীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দিতে হবে এবং আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।”
কানাডার পার্লামেন্টেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। দেশটির সংসদ সদস্য মেলিসা ল্যান্টসম্যান হাউস অব কমন্সে বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতিকে “ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক” বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অগ্নিসংযোগ, সংঘবদ্ধ হামলা, যৌন সহিংসতা, মন্দির ধ্বংস এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতিসহ হাজারো সহিংস ঘটনার তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর অবশ্যই আন্তর্জাতিক মহলে প্রতিধ্বনিত হতে হবে এবং আরও সহিংসতা ঠেকাতে বৈশ্বিক চাপ অপরিহার্য।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বাংলাদেশে সহিংসতা, বিশেষ করে একজন হিন্দু ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক বলেন,
“বাংলাদেশে আমরা যে সহিংসতা প্রত্যক্ষ করছি তা নিয়ে আমরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা—বাংলাদেশে হোক বা বিশ্বের অন্য কোথাও—নিরাপদে বসবাসের অধিকার রাখে। সব বাংলাদেশির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।”
এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া ভারতে ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। ভারত সরকার ঘটনাটিকে “ভয়াবহ” আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ভারতীয় গণমাধ্যমে ঘটনাটি শীর্ষ সংবাদে পরিণত হয়েছে এবং বাংলাদেশে ধর্মীয় চরমপন্থার উত্থান নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা চলছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন,
“বাংলাদেশের পরিস্থিতি আমরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। আমাদের কর্মকর্তারা বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিষয়ে আমাদের তীব্র উদ্বেগ জানিয়েছেন। দীপু চন্দ্র দাসের বর্বর হত্যাকাণ্ডের দায়ীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে আমরা জোর দিয়েছি।”
এদিকে কানাডার সংসদ সদস্য শুভ মজুমদার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে বাংলাদেশে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে চলমান সহিংসতা অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানান। তিনি লেখেন, এই সহিংসতা বন্ধের পাশাপাশি ইউনূস সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে মানবাধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন রক্ষা পায়। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের নামে চরমপন্থাকে প্রশ্রয় দেওয়া বা বাস্তবতা আড়াল করার প্রবণতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
প্রভাবশালী মার্কিন দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, শিক্ষার্থী আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে যে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা সহিংসতা ও গণহিংসাকে উসকে দিচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা বাহিনী হিমশিম খাচ্ছে এবং আসন্ন ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো এই অস্থিরতাকে রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগাচ্ছে।
পত্রিকাটি পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে তুলনা টেনে সতর্ক করে বলেছে, ধর্মীয় উগ্রবাদ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অস্তিত্বই মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
দীপু চন্দ্র দাসের হত্যাকাণ্ড আজ কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং বর্তমান ইউনূস সরকারের জবাবদিহি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গভীর উদ্বেগের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
