ইতিহাস স্মরণ না করলে জাতি দিশেহারা হয়। আর ইতিহাস বিকৃত করলে সমাজ হয়ে ওঠে বিভক্ত ও উগ্র। দুঃখজনক হলেও সত্য—আজ বাংলাদেশে যে ভারতবিদ্বেষী মনোভাব মাথাচাড়া দিচ্ছে, তার বড় অংশই ইতিহাস-বিস্মৃতি ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রপাগান্ডার ফল।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কোনো একক দেশের যুদ্ধ ছিল না—এটি ছিল একটি মানবিক বিপর্যয় ও আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের লড়াই। সেই সময়ে ভারত শুধু কূটনৈতিক সমর্থন দেয়নি; দিয়েছে অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, আশ্রয় ও খাদ্য। প্রায় এক কোটিরও বেশি শরণার্থীকে তারা নিজেদের ঘরে, মাঠে, স্কুলে জায়গা দিয়েছিল। এই সহযোগিতা না থাকলে মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল দীর্ঘ হতো, প্রাণহানি আরও বাড়ত—এটা ইতিহাসবিদদের স্বীকৃত সত্য।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—আজ এই সত্য অস্বীকার করার প্রবণতা কেন? জুলাই অভ্যুত্থানের পরপরই কেন হঠাৎ করে “ঢাকা না দিল্লি”, “ভারত শত্রু”—এই স্লোগানগুলো আবার বাজারে এলো?
এর পেছনে কয়েকটি সুস্পষ্ট কারণ আছে।
প্রথমত, রাজনৈতিক স্বার্থ। কিছু গোষ্ঠী জানে—ভারতবিদ্বেষ উসকে দিলে আবেগ জাগে, যুক্তি ঘুমায়। আবেগী মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। তাই ইতিহাসকে আড়াল করে, অর্ধসত্য ও মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে জনমতকে বিভ্রান্ত করা হয়।
দ্বিতীয়ত, ধর্মান্ধ রাজনীতি। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের আদর্শিক অনুসারীরা শুরু থেকেই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থানে ছিল। ভারতের ভূমিকা স্বীকার করলে তাদের অতীত ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তাই ভারতের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো আসলে নিজেদের ইতিহাস ঢাকার একটি কৌশল।
তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার। যাচাই ছাড়াই ভিডিও, পোস্ট, স্লোগান ভাইরাল হচ্ছে। “ভারত আমাদের কিছুই দেয়নি”—এই ধরনের বক্তব্য তথ্য নয়, অনুভূতির ব্যবসা। আর এই ব্যবসায় সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় উগ্রবাদীরা।
সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—এই ভারতবিদ্বেষ সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিভেদ তৈরি করছে। ইতিহাসকে সামনে না এনে যখন ধর্ম, জাত্যাভিমান আর ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, তখন সমাজ ধীরে ধীরে যুক্তিহীন হয়ে পড়ে।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের মতবিরোধ থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। দুই প্রতিবেশী দেশের স্বার্থ সবসময় এক হবে না। কিন্তু মতবিরোধ আর কৃতঘ্নতা এক জিনিস নয়। সমালোচনা আর ইতিহাস অস্বীকার এক জিনিস নয়।
একটি পরিণত জাতি তার বন্ধুর অবদান স্বীকার করতে জানে, আবার প্রয়োজন হলে সমালোচনাও করে। কিন্তু যারা ইতিহাস মুছে ফেলতে চায়, তারা আসলে ভবিষ্যৎকেই অন্ধকারে ঠেলে দেয়।
প্রশ্নটা তাই খুব সরল—আমরা কি ইতিহাস থেকে শিখবো, নাকি প্রপাগান্ডার পেছনে দৌড়াবো?
