ইব্রাহিম চৌধুরী খোকন
বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন তুলেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ৭ জানুয়ারি বুধবার তিনি একটি প্রেসিডেনশিয়াল মেমোরেন্ডামে স্বাক্ষর করে যুক্তরাষ্ট্রকে ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন। হোয়াইট হাউস বলছে, এসব সংস্থা আর যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কিংবা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করছে না।
হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে জানানো হয়, এই নির্দেশনার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সব নির্বাহী বিভাগ ও সরকারি সংস্থাকে ৩৫টি জাতিসংঘের বাইরের আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং ৩১টি জাতিসংঘ-সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানে অংশগ্রহণ ও অর্থায়ন বন্ধ করতে বলা হয়েছে। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থীভাবে কাজ করছে অথবা এতটাই অদক্ষ যে সেখানে ব্যয় করা করদাতাদের অর্থ অন্য খাতে ব্যয় করাই যুক্তিযুক্ত।
হোয়াইট হাউস আরও জানায়, যুক্তরাষ্ট্র যেসব আন্তর্জাতিক সংস্থা, চুক্তি ও কনভেনশনের সদস্য বা অর্থদাতা, সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার পরই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অনেক সংস্থা ‘গ্লোবালিস্ট এজেন্ডা’কে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, যা আমেরিকার জাতীয় নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
একটি তথ্যপত্রে প্রশাসন দাবি করেছে, এসব সংস্থার বড় অংশই উগ্র জলবায়ু নীতি, বৈশ্বিক শাসন কাঠামো এবং আদর্শিক কর্মসূচি এগিয়ে নিচ্ছে—যা যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক শক্তিকে দুর্বল করে। হোয়াইট হাউসের মতে, আমেরিকান করদাতারা এসব প্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর ধরে বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও তার বিনিময়ে কার্যকর ফল পাওয়া যায়নি।
হোয়াইট হাউসের ভাষায়, বহু সংস্থা একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থে পরিচালিত হচ্ছে, অন্যদিকে আবার প্রকাশ্যেই আমেরিকার নীতির সমালোচনা করছে কিংবা মার্কিন মূল্যবোধের পরিপন্থী অবস্থান নিচ্ছে। এত বড় বাজেট থাকা সত্ত্বেও অনেক সংস্থা বাস্তব ফল আনতে ব্যর্থ হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ ব্যবস্থায় নিয়মিত বাজেট ও শান্তিরক্ষা তহবিলের বাধ্যতামূলক চাঁদার পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থা ও কর্মসূচিতে স্বেচ্ছা অনুদান দিয়ে থাকে। ফলে অর্থায়ন বন্ধ হলে এর প্রভাব শুধু নির্দিষ্ট সংস্থায় নয়, পুরো কার্যক্রমেই পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার প্রতি সবচেয়ে বড় প্রত্যাহার। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্পের যুক্তি ছিল—আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন তা সরাসরি আমেরিকান জনগণের জন্য পরিমাপযোগ্য সুফল বয়ে আনে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে সীমিত না করে।
দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ট্রাম্প বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেন। প্রশাসনের মতে, এসব পদক্ষেপ জনস্বাস্থ্য ও জ্বালানি নীতিতে জাতীয় নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন ছিল। এছাড়া, দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই ট্রাম্প অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থাকে জানিয়ে দেন—বিশ্বব্যাপী কর কাঠামো সংক্রান্ত তাদের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রে কার্যকর নয়। একই সঙ্গে বিদেশি করনীতিগুলো মার্কিন কোম্পানিগুলোকে লক্ষ্য করে বৈষম্যমূলকভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
প্রশাসনের এই অবস্থানের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে কিছু বিতর্কিত জাতিসংঘ সংস্থা থেকেও যুক্তরাষ্ট্র সরে এসেছে বা অর্থায়ন বন্ধ করেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মানবাধিকার পরিষদ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহার এবং নিকটপ্রাচ্যে ত্রাণ সংস্থায় ভবিষ্যতে অর্থ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত তার উদাহরণ।
হোয়াইট হাউস বলছে, সর্বশেষ এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য করদাতাদের অর্থ সাশ্রয় করা এবং সেই অর্থ অবকাঠামো উন্নয়ন, সামরিক প্রস্তুতি ও সীমান্ত নিরাপত্তার মতো ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ অগ্রাধিকারে ব্যয় করা। প্রশাসনের মতে, যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থানকে ভর্তুকি দেওয়ার যুগ শেষ। তবে কোন কোন ৬৬টি সংস্থা এই নির্দেশনার আওতায় পড়ছে, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে ধাপে ধাপে অংশগ্রহণ ও অর্থায়ন বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত ঘিরে সমালোচনাও শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো আগেও এমন পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে। তাদের মতে, বৈশ্বিক সংস্থা থেকে সরে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক প্রভাব কমবে এবং বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় সমন্বয় দুর্বল হবে।
অন্যদিকে প্রশাসনের সমর্থকদের দাবি, এটি বহু দশকের অতিরিক্ত আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা সংশোধনের একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। তাদের মতে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, শক্ত প্রতিরক্ষা ও ঘরোয়া বিনিয়োগই এখন যুক্তরাষ্ট্রের মূল অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
হোয়াইট হাউস স্পষ্ট করেছে, এই প্রত্যাহার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিরই ধারাবাহিকতা। এখন দায়িত্ব পড়েছে ফেডারেল সংস্থাগুলোর ওপর—কোন কর্মসূচি বন্ধ হবে, কোন আইনি বাধ্যবাধকতা থাকবে এবং কত দ্রুত যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা গুটিয়ে নেবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
