সুলতানা পারভীন
একদিকে বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদ, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ মৌলবাদ—এই দুই চাপে আজ আমাদের সমাজ দ্বিধাবিভক্ত, দিশাহীন এবং ক্রমশ মানবিকতা হারাতে বসেছে।
বাংলাদেশের সংকট শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি গভীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের সংকট। এখানে বোমা পড়ে না, কিন্তু প্রতিদিন ধ্বংস হয় মনন, সংস্কৃতি ও বিবেক।
ইসলামিক মৌলবাদ—ধর্ম নয়, বরং ধর্মের নামে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার এক বিকৃত মতাদর্শ—আজ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে। এটি ঈমান শেখায় না, শেখায় ভয়। নৈতিকতা গড়ে তোলে না, গড়ে তোলে ঘৃণা। ফলাফল হিসেবে ধীরে ধীরে ধ্বংস হচ্ছে হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি—গান, কবিতা, উৎসব, শিল্প, সহনশীলতা।
সংস্কৃতির জায়গা দখল করছে নিষেধাজ্ঞা।
যুক্তির জায়গা দখল করছে ফতোয়া।
মানবিকতার জায়গা দখল করছে হুমকি।
সমাজের আইন ও শৃঙ্খলা আজ অবক্ষয়ের চরম পর্যায়ে। অপরাধী পরিচয়হীন, কিন্তু ভুক্তভোগী চিহ্নিত। শক্তিশালীরা আইনের ঊর্ধ্বে, আর সাধারণ মানুষ আইনের নিচে পিষ্ট। ন্যায়বিচার এখন ব্যতিক্রম, অন্যায়ই নিয়ম। ধর্মের নামে উগ্রতা, রাজনীতির নামে সন্ত্রাস—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনে নিরাপত্তা আজ বিলাসিতা।
সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাত এসেছে নারীর উপর।
নারী আজ আবারও “সম্মান” নামক এক কারাগারে বন্দি। তার পোশাক নিয়ে আদালত বসে, তার চলাফেরা নিয়ে ফতোয়া জারি হয়, তার কণ্ঠকে বলা হয় “ফিতনা”। কর্মক্ষেত্রে সে নিরাপত্তাহীন, রাস্তায় সে শঙ্কিত, ঘরেও সে নিশ্চিন্ত নয়। নারীর ক্ষমতায়ন কাগজে-কলমে, বাস্তবে নারীকে আবার ঠেলে দেওয়া হচ্ছে মধ্যযুগীয় অন্ধকারে।
এটি ইসলাম নয়।
এটি ধর্ম নয়।
এটি একটি রাজনৈতিক অস্ত্র—যার মাধ্যমে নারীকে দমিয়ে রাখা হয়, প্রশ্নকে হত্যা করা হয়, এবং সমাজকে স্থবির করে রাখা হয়।
আর এই মৌলবাদী অবক্ষয়কে নীরবে প্রশ্রয় দিচ্ছে ক্ষমতা। কারণ ভীত জনগোষ্ঠী প্রশ্ন করে না। সংস্কৃতিহীন সমাজ প্রতিবাদ করতে শেখে না। নারী যখন কোণঠাসা হয়, তখন পুরো সমাজই দুর্বল হয়ে পড়ে।
বৈশ্বিক শক্তি এই দুর্বলতাকেই কাজে লাগায়। যেমন ভেনেজুয়েলাকে অস্থির করে সম্পদ লুটের ছক কষা হয়েছে, তেমনি বাংলাদেশকে “স্থিতিশীল” রেখে সামাজিকভাবে দুর্বল করা হচ্ছে। একদিকে বিদেশি চাপ, অন্যদিকে ঘরোয়া মৌলবাদ—এই দ্বিমুখী আক্রমণে জনগণ ক্রমশ অসহায়।
বিশ্ব দরবারে আমাদের শাসকরা শান্তির ভাষণ দেন, আর দেশের ভেতরে সমাজ নীরবে ক্ষয়ে যায়। একদিকে “শান্তির লরিয়েট”, অন্যদিকে ভাঙা প্রতিষ্ঠান, সংকুচিত মতপ্রকাশ, মৌলবাদের উত্থান ও নারীর অবনমন—এই বৈপরীত্যই আজকের বাস্তবতা।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় আগ্রাসন নয়। ভয়ঙ্কর হলো নীরবতা।
যখন সংস্কৃতি ধ্বংস হয়, সমাজ ভেঙে পড়ে। যখন নারী অপমানিত হয়, রাষ্ট্র দুর্বল হয়। যখন মৌলবাদ শক্তিশালী হয়, মানবতা পরাজিত হয়।
ইতিহাস প্রশ্ন করবে—আমরা কি তখনও চুপ ছিলাম?
নাকি সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলাম? কারণ যে সমাজ সংস্কৃতি রক্ষা করতে পারে না,
যে রাষ্ট্র নারীকে সম্মান দিতে পারে না, সে দেশ কখনোই সত্যিকারের স্বাধীন থাকতে পারে না।
