আমাদের আশেপাশে যে ছদ্মবেশী বুদ্ধিজীবীরা ঘুরে বেড়াচ্ছেন—গত দেড় বছরে যারা ক্ষমতার অপচর্চাকে নীরবে বৈধতা দিয়েছেন—তাদের চিহ্নিত করার সময় এখনই। বড় বড় তাত্ত্বিক আলাপ, নীতির বুলি আর জটিল শব্দচয়নে আজ কেউ কেউ ‘বিশাল চিন্তাবিদ’ সাজার চেষ্টা করছেন। কিন্তু অন্যায়-অবিচারের মুহূর্তে তারা কোথায় ছিলেন?
নির্বাচনের ফল ঘোষণার ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই কেউ কেউ পরাজিত শক্তির আত্মসমালোচনা না করে উল্টো নারী বিদ্বেষ, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি, সাংস্কৃতিক চর্চায় হামলা, বাউলদের উপর আক্রমণ এবং মাজার ভাঙার রাজনীতিতে ১১ দিলের ঐক্য জোটের প্রত্যক্ষ পরোক্ষ সমর্থনকে কে বিশুদ্ধকরণের প্রয়াসে নেমেছেন। মানুষকে এত সরল ভাবার কোনো কারণ নেই। জনগণ দেখেছে, বুঝেছে, মনে রেখেছে।
মিষ্টি কথার আড়ালে নতুন করে ‘বুদ্ধিজীবী’ সাজার এই প্রচেষ্টা আসলে দায় এড়ানোর রাজনীতি। মনে রাখতে হবে—এই ভোট কোনো দলের পকেটে যায়নি; এই ভোট গেছে অন্যায়, উগ্রবাদ, নারী বিদ্বেষ এবং ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে।
বুঝদার মানুষ জানেন—দলীয় পরিচয় যাই হোক না কেন, রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা ও ভন্ডজীবীদের চরিত্র একই। তারা কখনও দলের দাসে পরিণত হন, কখনও এজেন্ডার বাহক। এর চেয়ে উত্তম হলো—দেশ ও মানুষের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া।
যারা কেবল ক্ষমতার সুবিধা ভোগের জন্য নীরব থেকেছেন, তাদের বুদ্ধিজীবিতাকে প্রশ্ন করুন। যে শিক্ষার্থীরা ক্ষমতায় বসাতে পারে, তাদের “সাত খুন মাফ”—এই সস্তা নীতির প্রচারক চিন্তাবিদদের চিনে রাখুন। নৈতিকতা কখনো পরিস্থিতিভিত্তিক হতে পারে না।
কিছু অপ্রিয় সত্য বলি
➡️ মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য, জাদুঘর ভাঙা বা ইতিহাসের প্রতীক ধ্বংস করা—কোনোভাবেই কোন তৌহিদী বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর কার্যকারিতা ছিল না । এটি ছিল একাত্তরের পরাজিত শক্তির প্রতিশোধ ও তাদের পেশিশক্তির প্রদর্শন। এখানে শুধুমাত্র ধর্মপ্রাণ মুসলমানের আবেগকে ব্যবহার করা হয়েছিল, ভবিষ্যতে এরকম যেন না হয় সেই দিকে বরঞ্চ আমাদের মনোযোগ থাকা প্রয়োজন।
➡️ ৩২ নম্বর শুধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসস্থান নয়; এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের এক প্রতীকী স্তম্ভ। এর উপর আঘাত কেবল কোনো দলবিরোধী অবস্থান নয়—এটি বাংলাদেশ জাতি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রের অস্তিত্বর উপর আঘাত ছিল। জরুরী না, এটিকে আওয়ামী লীগের সম্পত্তি ভাবা। বাংলাদেশ বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম বা মুক্তির ইতিহাস আওয়ামী লীগের কোন একক সম্পত্তি না। এদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও আওয়ামী লীগের একক কোন অর্জন না। ৩২ নম্বর কে ভাঙার এই দঙ্গল বাজরা আসলে কি নতুন বাংলাদেশকে তৈরি করতে চেয়েছিল নাকি কেবলই দেশকে অস্থিতিশীল করতে চেয়েছিল এ প্রশ্নটা আমাদের জারি রাখতে হবে।
➡️ গত দেড় বছরের মব-সহিংসতা কখনো স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না; এর পেছনে সংগঠিত প্ররোচনা ছিল। অপরাধী যে দলেরই হোক, আক্রমণ বা অপমানের রাজনীতি সমর্থনযোগ্য নয়। এই ভাষায় কথা বলতে এত সংকোচ কেন ছিল—সে প্রশ্ন তোলা জরুরি।
➡️ মুক্তিযোদ্ধা হওয়া মানেই সমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকা নয়। যারা ক্ষমতার লোভে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিক্রি করেছেন, তাদের সমালোচনা করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি ‘জুলাই চেতনা’কে পুঁজি করে বাণিজ্য করা, রাজনৈতিক ফায়দা তোলা জুলাই ব্যবসায়ী গনকে চিহ্নিত করা বেশি জরুরী।
➡️ শিক্ষার্থীদের দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান আক্রমণকে উদযাপন করা , অথবা তাদের রাজনৈতিক শিষ্টাচারের অবক্ষয় নিয়ে প্রশ্ন না তুলে বরঞ্চ সেটিকেই তাদের দক্ষতা হিসেবে উৎসাহিত করা যেকোনো অর্থে তরুণ প্রজন্মকে পথভ্রষ্ট করার শামিল ছিল —এগুলোর বিরুদ্ধে নীরব থাকা সুবিধাবাদেরই নামান্তর।
➡️ ধর্মভিত্তিক রাজনীতির নামে সংস্কৃতির উপর হামলা—পালা গান বন্ধ করা, কনসার্ট বা নাটক বাধাগ্রস্ত করা, বিজয় দিবস ও স্বাধীনতার সাংস্কৃতিক চর্চায় আক্রমণ কিভাবে “দ্বিতীয় স্বাধীন বাংলাদেশ “নামক তত্ত্বের জন্ম দেয় তা আমাকে সত্যিই ভাবায়, কাজেই বাংলাদেশ ২.০ এই মবমাজ মাস্টারমাইন্ড গনের প্রচ্ছন্ন সমর্থকদের চিহ্নিত করুন।
➡️ বাউলদের আধ্যাত্মিক চর্চায় আঘাত এবং মাজার ধ্বংসের অপকৌশলের বিরুদ্ধে অবস্থান না নেওয়া মানে নীরব সমর্থন। মাজার এই দেশের বহু মানুষের অন্তর্ভুক্তিমূলক আশ্রয়স্থল—এটি ভাঙার রাজনীতি এদেশের সংস্কৃতিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দের প্রতি আক্রমণ ।
➡️ নারীর অভিভাবক সাজার নামে পিতৃতান্ত্রিক বয়ান, নারী বিদ্বেষী রাজনৈতিক প্রচারণা—এসবের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান না নিয়ে যারা ছলে-বলে-কৌশলে সেই বয়ানকে বৈধতা দেন, তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন।
এই নির্বাচনের জয় কোনো দলের একক জয় নয়। এটি বাঙালি সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, নারী স্বাধীনতা এবং উগ্রবাদ-বিরোধী অবস্থানের পক্ষে মানুষের রায়।
অনেক মানুষ, যারা দলীয়ভাবে ভিন্ন অবস্থানে ছিলেন, তারাও উগ্রবাদ রুখতে ভোট দিয়েছেন। তারা দেশকে বাঁচাতে চেয়েছেন। এই স্বতঃস্ফূর্ত জনরায়ের প্রতি সম্মান জানানো এখন রাজনৈতিক নেতৃত্বের নৈতিক দায়িত্ব।
বাংলাদেশের মানুষ একটি সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে।
জনাব তারেক রহমান—এই আস্থার মর্যাদা দিন।
এদেশের মানুষ যেন আবার হতাশ না হয়—এই প্রত্যাশাই রইল।
লেখক: ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধ, শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
