আখতারুজ্জামান আজাদ
নাগরিক পার্টির একজন সাংসদ ২৯ মার্চ জাতীয় সংসদে বলেছেন— ‘আপনারা যে-জেনজির কথা বলেন, সেই জেনজির প্রতিনিধি হয়ে আমি সংসদে কথা বলতে এসেছি। আপনি যদি বলেন যে, জেনজি কী চায়; আমি বলছি— জেনজি বাহাত্তরের সংবিধান আর চায় না।’ সেই সাংসদের নাম এই লেখায় উল্লেখ করছি না। বরং তার বক্তব্যের ব্যবচ্ছেদ করা যাক। জেনজি বা জেনারেশন জেডের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ সংবিধান সম্পর্কে জানে, বাহাত্তরের সংবিধান সম্পর্কে জানে আরও ক্ষুদ্র অংশ। ফলে, জেনারেশন জেড বাহাত্তরের সংবিধান চায় না— এমন দাবি এই সাংসদের মুখে নিছকই আরোপিত। অর্থাৎ এই বক্তব্য এই কমবয়সী সাংসদকে দিয়ে অন্য কোনো গোষ্ঠী বলিয়ে নিয়েছে। বিভিন্ন লেখায় অতীতে উল্লেখ করেছি— জামায়াতে ইসলামিই নাগরিক পার্টির মাদার অর্গানাইজেশন, নাগরিক পার্টি জামায়াতে ইসলামির বাংলামোটর শাখা। নাগরিক পার্টির আলাদা অবকাঠামো ও কমিটি আছে বটে। কিন্তু দলটির নীতিনির্ধারণ ও অর্থায়ন করে জামায়াত। জামায়াতের পুরো শরীরে এখনও একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের সিলমোহর সেঁটে আছে এবং এই সিল অমোচনীয়। যেকোনো ব্যাপারে জামায়াত কোনোকিছু বললে দেশের সচেতন নাগরিকরা তা বিশ্বাস করে না। ফলে, জামায়াতের এমন একটি রাজনৈতিক শাখার প্রয়োজন ছিল— যে-শাখার নেতাদের গায়ে যুদ্ধাপরাধের সিল নেই, যাদের কথা জনসাধারণ বিশ্বাস করবে। এবি পার্টিকে দিয়ে জামায়াত এই চেষ্টা করেছিল, বিফল হয়েছে। জামায়াত সেই চেষ্টা বর্তমানে নাগরিক পার্টিকে দিয়ে করতে চাইছে এবং ক্ষেত্রবিশেষে সফলও হয়েছে।
বাহাত্তরের সংবিধান জামায়াত চায় না। আলোচ্য অল্পবয়স্ক সাংসদ জামায়াতের চাওয়া না-চাওয়াকে চাপিয়ে দিয়েছেন জেনারেশন জেডের ওপর। ‘আমরা বাহাত্তরের সংবিধান চাই না’— জামায়াতনেতারা এই উক্তি লক্ষ-লক্ষবার করলেও জনসাধারণ তা কানে তুলবে না, হালে পানি পাবে না, পাবে না রাজনৈতিক গুরুত্ব। কিন্তু কোনো তরুণকে দিয়ে ‘জেনজি বাহাত্তরের সংবিধান চায় না’ বলালে সেটি হালে পানি পাবে, রাজনৈতিক গুরুত্ব পাবে, জনসাধারণও কানে তুলবে। হুমায়ূন আহমেদের ‘মন্ত্রী মহোদয়ের আগমন শুভেচ্ছা স্বাগতম’ নাটকে মন্ত্রী মহোদয় পরিকল্পনা করেন কাউকে না-জানিয়ে হুট করে কোনো একটি গ্রামে গিয়ে তিনি সেই গ্রামের কিছু ধর্মীয় উপাসনালয়ে আর্থিক অনুদান দেবেন, কিছু অবিবাহিত মেয়েকে বিয়ে দিয়ে গাইগরু উপহার দেবেন এবং কিছু মরণাপন্ন রোগীকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় এনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করবেন। এই পরিকল্পনার পর মন্ত্রীর চাটুকাররা পরামর্শ দিয়েছিল মরণাপন্ন রোগী হিশেবে ঢাকায় বৃদ্ধদেরকে না-এনে কিছু শিশুকে আনতে। কেননা, বৃদ্ধদের প্রতি এ-দেশের মানুষের সহানুভূতি নেই, আছে অল্পবয়স্কদের প্রতি। জামায়াতে ইসলামির প্রায় সব বৃদ্ধ নেতাই স্বাধীনতাবিরোধী ছিলেন এবং গণহত্যায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে কোনো-না-কোনোভাবে সহযোগিতা করেছেন। ফলে, জামায়াতের বৃদ্ধ নেতাদের বক্তব্যের কোনো সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নেই। এজন্যই জামায়াতের প্রয়োজন পড়েছে অল্পবয়স্কদেরকে দিয়ে রাজনৈতিক দল খোলানোর এবং যে-বক্তব্য জামায়াত দিতে পারে না বা দিলেও কেউ গুরুত্বের সঙ্গে নেয় না, অল্পবয়স্কদেরকে দিয়ে সেই বক্তব্য দেওয়ানোর। এই লেখায় অনুসন্ধান করব জামায়াতে ইসলামি নাগরিক পার্টিকে দিয়ে কেন বলাচ্ছে জেনারেশন জেড বাহাত্তরের সংবিধান চায় না, বাহাত্তরের সংবিধানের সঙ্গে জামায়াতের শত্রুতা কোথায়, বাহাত্তরের সংবিধান জামায়াতকে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয় ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর। এই সংবিধান ছিল মূলত ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার কর্তৃক ঘোষিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রেরই ধারাবাহিকতামাত্র। বাহাত্তরের সংবিধানে একাত্তরের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে সর্বাংশে আত্তীকরণ করে নেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষিত না-হলে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র আসত না, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র না-এলে শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হতো না, মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত না-হলে ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর দেশ শত্রুমুক্ত হতো না এবং ১৯৭২-এর ১৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের সংবিধান কার্যকর হতে পারত না। যেহেতু জামায়াতে ইসলামি সশস্ত্রভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে গণহত্যায় অংশ নিয়েছে, সেহেতু বাহাত্তরের সংবিধান জামায়াতের জন্য নিছকই পরাজয়ের দলিলস্বরূপ। জামায়াত যেসব কারণে বাহাত্তরের সংবিধান চায় না, এটি হলো সেসব কারণের একটি।
বাহাত্তরের সংবিধান শুরুই হয়েছে এভাবে— ‘আমরা বাংলাদেশের জনগণ ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি’। এখানে ‘জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে’ কথাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বাক্যে ‘ঐতিহাসিক সংগ্রাম’ বলতে শুধু একাত্তরের নয় মাসের যুদ্ধই বোঝানো হয়নি। কী বোঝায় এই ‘ঐতিহাসিক সংগ্রাম’ শব্দযুগল দ্বারা?
এ-ব্যাপারে সহায়তা নেওয়া যেতে পারে বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানির। এই প্রয়াত বিচারপতি (১৯৩৭-২০২২) ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান : সহজ পাঠ’ নামক একটি বই লিখে গিয়েছেন। প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৮ সালে, প্রকাশ করেছিল ‘সমুন্নয়’। বাহাত্তরের সংবিধানে উল্লিখিত ‘জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রাম’ বলতে এই ভূখণ্ডের যে-সংগ্রামগুলোকে তিনি নির্দেশ করেছেন, সেগুলো হলো— সন্ন্যাসী বিদ্রোহ (১৭৬০-১৮০০), মাঝি বিদ্রোহ (১৭৬৬-৮৩), শমশের গাজির বিদ্রোহ (১৭৬৭-৬৮, ১৮৪৪-৯০), সন্দ্বীপের বিদ্রোহ (১৭৬৯, ১৮১৯, ১৮৭০), কৃষক-তন্তুবায় বিদ্রোহ (১৭৭০-১৭৮০), গারো বিদ্রোহ (১৭৭৫-১৮০২), চাকমা বিদ্রোহ (১৭৭৬-৮৭), নীলচাষিদের বিদ্রোহ (১৭৭৮-১৮০০, ১৮৩০-৪৮, ১৮৫৯-৬১), লবণচাষিদের বিদ্রোহ (১৭৮০-১৮০৪), রেশমচাষিদের বিদ্রোহ (১৭৮০-১৮০০), রংপুর বিদ্রোহ (১৭৮৩), বরিশালের বিদ্রোহ (১৭৯২), ময়মনসিংহের কৃষক বিদ্রোহ (১৮১২-৩০), সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫-৫৭), সুন্দরবন অঞ্চলে বিদ্রোহ (১৮৬১), সিরাজগঞ্জ কৃষক বিদ্রোহ (১৮৭২-৭৩), তেভাগার দাবিতে কৃষক বিদ্রোহ (১৯৪৬-৪৭)। বিচারপতি গোলাম রাব্বানি একই বইয়ে আরও লিখেছেন— ‘উপরিউক্ত প্রত্যেকটি বিদ্রোহের ফলাফল আদৌ বিবেচ্য নয়, আসল বিবেচ্য হচ্ছে এগুলোর চরিত্র এবং তা হলো— অসম অথচ সাহসিক বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহ-সংগ্রামগুলোর ধারাবাহিকতায়ই ১৯৭১ সালের সশস্ত্র প্রতিরোধ ও যুদ্ধ, যা সার্বিক অর্থে ছিল জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রাম। তাই, শুধু যুদ্ধ হিশেবে উল্লেখ করলে ১৯৭১ সালে মুক্তির জন্য সংগ্রাম দুই শতাধিক বছরের সংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, ঐতিহাসিক ধারাকে ভুলে যেতে হয়। বাংলাদেশ শুধু একটি স্বাধীন দেশ না-হয়ে একটি মুক্তস্বাধীন দেশ হবে— এই আকাঙ্ক্ষায় জনগণের সশস্ত্র যুদ্ধের নাম স্বাধীনতার যুদ্ধ না-হয়ে আপনাআপনি মুক্তিযুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। স্বাধীন ও মুক্ত শব্দ দুটো সমার্থক নয়। একটি স্বাধীন দেশে অনাহার, অচিকিৎসা, অশিক্ষা, অবিচার থাকতেই পারে; কিন্তু একটি মুক্তিপ্রাপ্ত দেশে এগুলো থাকে না।’
অন্য বিশ্লেষকরা এই ‘জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রাম’-এর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১-এর মধ্যবর্তী বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহকে। উদাহরণস্বরূপ— বাংলাদেশের জাতীয় স্মৃতিসৌধে স্তম্ভ আছে সাতটি। স্থপতি সৈয়দ মইনুল হোসেন এই সাত স্তম্ভ দ্বারা বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের সাতটি পর্যায়কে নির্দেশ করেছেন— বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছাপ্পান্নর শাসনতন্ত্র আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয়দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ।
এবার একনজরে দেখা যাক উল্লিখিত আন্দোলনগুলোয় জামায়াতে ইসলামির ভূমিকা কী ছিল। সাতচল্লিশের দেশভাগের আগ পর্যন্ত জামায়াত সর্বান্তকরণে ভারতভাগের বিরোধিতা করেছে, অর্থাৎ জামায়াত পাকিস্তানরাষ্ট্রই চায়নি। জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা আমির সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদি পাকিস্তানের জন্মের বিরোধিতা করে ব্যর্থ হয়ে ভারত ত্যাগ করে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানেই চলে গিয়েছেন এবং ১৯৫৩ সালে কাদিয়ানি-বিরোধী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়ে আদালতের বিচারে মৃত্যুদণ্ডের রায় পেয়েছেন। মুসলমানসংখ্যাগরিষ্ঠ বিভিন্ন দেশের অনুরোধে পাকিস্তান সরকার মওদুদির মৃত্যুদণ্ড রহিত করে। জামায়াতের তরফ থেকে বর্তমানে দাবি করা হয় গোলাম আজম একজন ভাষাসৈনিক ছিলেন। এ-বছর কেন্দ্রীয় শহিদমিনারে প্রথমবারের মতো ফুল দিতে গিয়ে জামায়াত স্লোগান দিয়েছে— ‘ভাষাসৈনিক গোলাম আজম; লও, লও, লও সালাম।’ পক্ষান্তরে, সেই গোলাম আজমই ১৯৭০ সালের ২০ জুন ‘বাংলা ভাষার আন্দোলন করা ভুল হইয়াছে’ বলে ভাষা আন্দোলনকে ত্যাজ্য করেছিলেন। আর চুয়ান্নর নির্বাচনে জামায়াত একটি আসনও পায়নি অথবা নির্বাচনে অংশই নেয়নি। সত্তরের নির্বাচনে তিনশো আসনের মধ্যে জামায়াত সাকুল্যে জিতেছিল চারটি আসনে— সিন্ধুপ্রদেশে দুটো এবং পাঞ্জাব ও সীমান্তপ্রদেশে একটি করে। ঐ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে জামায়াত কোনো আসনই পায়নি। বলাই বাহুল্য— ছাপ্পান্ন, বাষট্টি, ছেষট্টি বা ঊনসত্তরের আন্দোলনেও বাঙালিজাতির পক্ষে জামায়াতের কোনো ভূমিকা ছিল না; উপরন্তু অবিভক্ত পাকিস্তানে রাজনৈতিক দল হিশেবে এক বা একাধিকবার নিষিদ্ধ হয়েছিল। আর একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা কী ছিল, তা নিশ্চয়ই নতুন করে উল্লেখ করার প্রয়োজন পড়ে না। অর্থাৎ ‘জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রাম’ বলতে বাহাত্তরের সংবিধানে যা বোঝানো হয়েছে, সেসব সংগ্রামের কোনোটিতেই জামায়াতে ইসলামির কোনো গৌরবময় অবদান বা কৃতিত্ব নেই। ফলে, বাহাত্তরের সংবিধানকে যেকোনো মূল্যে বিদায় করা জামায়াতের জন্য অতীব জরুরি।
বাহাত্তরের সংবিধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। এই সংবিধানের অষ্টম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল, ‘জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা— এই নীতিসমূহ এবং তৎসহ এই নীতিসমূহ হইতে উদ্ভূত এই ভাগে বর্ণিত অন্য সকল নীতি রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি বলিয়া পরিগণিত হইবে।’ ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাহাত্তরের সংবিধানের ‘অনন্য’ বৈশিষ্ট্য বললাম এজন্য যে, বাহাত্তরে এমনকি ভারতের সংবিধানেও ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল না। ভারতের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা এসেছে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণীত হওয়ার চার বছর পর— ১৯৭৬ সালে। অর্থাৎ সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশ চার বছরের অগ্রজ। বাংলাদেশের বাহাত্তরের সংবিধানের দ্বাদশ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল— ‘ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বাস্তবায়নের জন্য সর্বপ্রকার সাম্প্রদায়িকতা, রাষ্ট্র কর্তৃক কোনো ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদাদান, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার, কোনো বিশেষ ধর্মপালনকারী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য বা তাহার উপর নিপীড়ন বিলোপ করা হইবে।’ এই অনুচ্ছেদটি ধর্মনিরপেক্ষতার পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞা। বলাই বাহুল্য, জামায়াতে ইসলামির রাজনীতি এই অনুচ্ছেদের সাথে সমূলে সাংঘর্ষিক। কারণ, এই অনুচ্ছেদ ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার’ সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করেছে। আর জামায়াতের রাজনীতি মানেই ধর্মের অপব্যবহার। ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে রাজনৈতিক স্বার্থে জামায়াত ধর্মকে কতভাবে অপব্যবহার করেছে, তা নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না। এই দ্বাদশ অনুচ্ছেদের কারণে বাহাত্তরের সংবিধান জামায়াতের জন্য অকথ্য রকমের অসুবিধাজনক।
জামায়াতের জন্য বাহাত্তরের সংবিধানের ভয়ংকরতম অধ্যায় হলো অনুচ্ছেদ আটত্রিশ। এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল— ‘জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ সাপেক্ষে সমিতি বা সঙ্ঘ গঠন করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে; তবে শর্ত থাকে যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসম্পন্ন বা লক্ষ্যানুসারী কোনো সাম্প্রদায়িক সমিতি বা সঙ্ঘ কিংবা অনুরূপ উদ্দেশ্যসম্পন্ন বা লক্ষ্যানুসারী ধর্মীয় নামযুক্ত বা ধর্মভিত্তিক অন্য কোনো সমিতি বা সঙ্ঘ গঠন করিবার বা তাহার সদস্য হইবার বা অন্য কোনো প্রকারে তাহার তৎপরতায় অংশগ্রহণ করিবার অধিকার কোনো ব্যক্তির থাকিবে না।’ অর্থাৎ বাহাত্তরের সংবিধানের অষ্টাত্রিংশ অনুচ্ছেদ বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেছিল। কোনো রাজনৈতিক দল যেন এমনকি ধর্মীয় নামযুক্তও হতে না-পারে, বাহাত্তরের সংবিধান সেই ব্যবস্থা করেছিল। পূর্ব পাকিস্তানে যতগুলো ধর্মভিত্তিক দল ছিল, এর মধ্যে প্রায় সব কটিই মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র বিরোধিতা করেছিল এবং ধর্মকে বাঙালিনিধনের ঢাল হিশেবে ব্যবহার করেছিল। ফলে, সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধকরণ খুবই স্বাভাবিক ছিল এবং এই নিষেধাজ্ঞা চিরস্থায়ী হওয়া আবশ্যক ছিল। যা হোক, বাহাত্তরের সংবিধানের এই অষ্টাত্রিংশ অনুচ্ছেদ যে জামায়াতে ইসলামিসহ ধর্মভিত্তিক সব সংগঠনেরই অস্তিত্ব বিলীন করে দেয় এবং ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলো যে এজন্যই নিয়মিত বাহাত্তরের সংবিধানের মুণ্ডুপাত করে, তাও নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে বাহাত্তরের সংবিধানে কোনো ইঙ্গিত ছিল না। সংবিধানের পঞ্চত্রিংশ অনুচ্ছেদে বলা আছে অপরাধসংঘটনের সময়ে যে-আইন ছিল না, সেই আইন দিয়ে পুরোনো অপরাধের বিচার করা যাবে না। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছে একাত্তরের মার্চ থেকে ডিসেম্বরে, আর সেই অপরাধের বিচারের জন্য আইন ‘বাংলাদেশ যোগসাজশকারী (বিশেষ ট্রাইবুনাল) আদেশ’— অর্থাৎ দালাল আইন— প্রণীত হয়েছিল ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ীই আজকের আইন দিয়ে গতকালের অপরাধের বিচার করা যায় না। বাংলাদেশে কোনো আইনের ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা বা রেট্রোস্পেক্টিভ ইফেক্ট নেই। ফলে, বাহাত্তরের দালাল আইন সংবিধানবিরোধী হয়ে পড়েছিল। এই সাংবিধানিক জটিলতা কাটাতে ১৯৭৩ সালের ১৫ জুলাই সংবিধানে আনা হয়েছিল প্রথম সংশোধনী। প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত হয়েছিল অনুচ্ছেদ ৪৭(৩)। সেই অনুচ্ছেদের বক্তব্য হলো— ‘এই সংবিধানে যাহা বলা হইয়াছে; তাহা সত্ত্বেও গণহত্যাজনিত অপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীন অন্যান্য অপরাধের জন্য কোনো সশস্ত্রবাহিনী বা প্রতিরক্ষাবাহিনী বা সহায়ক বাহিনীর সদস্য অন্য কোনো ব্যক্তি, ব্যক্তিসমষ্টি বা সংগঠন কিংবা যুদ্ধবন্দিকে আটক, ফৌজদারিতে সোপর্দ কিংবা দণ্ডদান করিবার বিধানসংবলিত কোনো আইন বা আইনের বিধান এই সংবিধানের কোনো বিধানের সহিত অসমঞ্জস বা তাহার পরিপন্থি— এই কারণে বাতিল বা বেআইনি বলিয়া গণ্য হইবে না কিংবা কখনও বাতিল বা বেআইনি হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে না।’
একাত্তরে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস এবং আরও নানান রকমের সশস্ত্রবাহিনী গণহত্যাসংঘটনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ‘সহায়ক’ হিশেবে কাজ করেছে। উল্লিখিত বাহিনীগুলোর সবচেয়ে বেশি সদস্য ছিল জামায়াতে ইসলামিরই। আর আল-বদর ছিল পুরোপুরিভাবে জামায়াতের তৎকালীন ছাত্রসংগঠন ইসলামি ছাত্রসংঘের নেতাকর্মীদের দ্বারা গঠিত হন্তারকবাহিনী। প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে বাহাত্তরের সংবিধানে যুক্ত হওয়া এই অনুচ্ছেদ ৪৭(৩) জামায়াতে ইসলামিকে কেবল সাংগঠনিকভাবেই বিচার করতে সক্ষম না, বরং একাত্তরে কেউ ব্যক্তিপর্যায়ে যুদ্ধাপরাধ করলে এরও বিচার করতে সক্ষম। যে-সংবিধানে প্রথম সংশোধনী আনা হয়েছিল শুধু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করার জন্য, সাংগঠনিকভাবে যুদ্ধাপরাধ সংঘটনকারী দল জামায়াতে ইসলামি সেই সংবিধানকে যেকোনো মূল্যে ছুড়ে ফেলে দিতে চাইবে— এটি মোটেই আশ্চর্যজনক নয়, বরং এটিই সহজাত ও স্বাভাবিক।
বাহাত্তরের সংবিধান জামায়াতে ইসলামির কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছিল অনুচ্ছেদ ৬৫ ও ১২২-এর মাধ্যমে। সেই অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে উল্লিখিত ছিল— ‘কোনো ব্যক্তি সংসদসদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদসদস্য থাকিবার যোগ্য হইবেন না, যদি তিনি ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ যোগসাজশকারী (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আদেশের অধীন যেকোনো অপরাধের জন্য দণ্ডিত হইয়া থাকেন’। আগেই উল্লেখ করেছি— ‘বাংলাদেশ যোগসাজশকারী (বিশেষ ট্রাইবুনাল) আদেশ’ প্রণয়ন করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশভূখণ্ডে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচার করার জন্য। এই আইনে দণ্ডিত অপরাধীরা সংসদনির্বাচনে যেন অংশ নিতে না-পারেন, সেই ব্যবস্থা বাহাত্তরের সংবিধানে নেওয়া ছিল। লোমহর্ষক ব্যাপার হলো, বাহাত্তরের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১২২-এ উল্লিখিত ছিল— ‘কোনো ব্যক্তি সংসদনির্বাচনের জন্য নির্ধারিত কোনো নির্বাচনী এলাকায় ভোটারতালিকাভুক্ত হইবার অধিকারী হইবেন, যদি তিনি ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ যোগসাজশকারী (বিশেষ ট্রাইবুনাল) আদেশের অধীন কোনো অপরাধের জন্য দণ্ডিত না-হইয়া থাকেন।’ অর্থাৎ বাহাত্তরের সংবিধান জামায়াতকে না-দিয়েছিল রাজনীতি করার সুযোগ, না-দিয়েছিল দল পালটে অন্য দলের প্রতীকে নির্বাচন করার সুযোগ, না-দিয়েছিল এমনকি ভোটাধিকার। বাহাত্তরের সংবিধান জামায়াতে ইসলামিকে সব দিক থেকেই চেপে ধরেছিল, বেঁধে রেখেছিল আষ্টেপৃষ্ঠে। বাহাত্তরের সংবিধান ছিল জামায়াতে ইসলামির জন্য আয়নাঘর।
বাহাত্তরের সংবিধানের ওপর জামায়াতে ইসলামির কেন এত ক্ষোভ, তা নিশ্চয়ই এতক্ষণে দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়েছে। বৃহত্তর জামায়াতে ইসলামি বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে সংশ্লিষ্ট সবকিছুকেই বিতর্কিত করে দিতে বা সন্দেহের মোড়কে মুড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ— বৃহত্তর জামায়াতে ইসলামি বাংলাদেশে এই ধারণা প্রোথিত করে দিতে সক্ষম হয়েছে যে, শহিদমিনার বা যেকোনো স্মৃতিসৌধে ফুল দেওয়া কিংবা জাতীয় সংগীত গাওয়া হারাম, ৭ মার্চের ভাষণশেষে শেখ মুজিবুর রহমান ‘জয় বাংলা’র পর ‘জিয়ে পাকিস্তান’ বলেছিলেন, শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি, ২৫ মার্চ রাতে শেখ মুজিব স্বেচ্ছায় পশ্চিম পাকিস্তানে পালিয়ে গিয়েছিলেন, পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে মুজিব যারপরনাই আরাম-আয়েশে ছিলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ভারত লিখে দিয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধকালে বুদ্ধিজীবীদেরকে ভারতীয় সেনাবাহিনী হত্যা করেছিল, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ভারতের ষড়যন্ত্রে আতাউল গনি ওসমানি উপস্থিত থাকতে পারেননি, লন্ডন থেকে দিল্লি ও কোলকাতা হয়ে বাংলাদেশে ফেরার পথে শেখ মুজিব ভারতের কাছে দাসখত দিয়ে এসেছিলেন। একাত্তরেও জামায়াত মুক্তিযোদ্ধাদেরকে ভারতের চর, ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী, ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী ইত্যাদি অভিধায় অভিহিত করেছে। বাঙালির শিল্প-সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত যেকোনো আয়োজনকে ‘হারাম’ আখ্যা দিয়ে মৌলবাদীশক্তি আয়োজনগুলোকে বিষিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। এই ধীরবিষপ্রক্রিয়ার কৃতিত্ব ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলোর অবশ্যই প্রাপ্য। বাহাত্তরের সংবিধানের বিরুদ্ধে অব্যাহত বিষোদ্গারও এই ধীরবিষপ্রক্রিয়ারই অবিচ্ছেদ্য অংশ। জামায়াত একাত্তরে স্বাধীনতা চায়নি বলেই ২০২৪-এর ৫ আগস্টের সরকারপতনকে জামায়াতের কাছে মনে হয়েছে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’, ৫ আগস্টপরবর্তী বাংলাদেশকে মনে হয়েছে ‘বাংলাদেশ ২.০’ এবং ৫ আগস্টের পর গঠন করতে চেয়েছে ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’। ড. মুহাম্মদ ইউনুসের আমলে রাষ্ট্রপতিকে উৎখাত করে সংবিধান বাতিল করার চেষ্টা বৃহত্তর জামায়াতে ইসলামি কম করেনি। উল্লিখিত সবকিছুর মূলে একাত্তরের পরাজয়। ফলে, যখনই যার মুখে শোনা যাবে বাহাত্তরের সংবিধানকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন সংবিধান প্রণয়নের কথা, তখনই খোঁজ নিতে হবে মুক্তিযুদ্ধে এই ব্যক্তির পূর্বসূরিদের বা এই ব্যক্তির ভূমিকা কী ছিল।
এমন না যে, বাহাত্তরের সংবিধান এখনও শতভাগ অক্ষত আছে। যেসব অনুচ্ছেদের কারণে বাহাত্তরের সংবিধানের ব্যাপারে বৃহত্তর জামায়াতে ইসলামির এত গাত্রদাহ বা বিদ্বেষ, সেসব অনুচ্ছেদের বেশিরভাগই এই মুহূর্তে সংবিধানে আর নেই। জামায়াতের জন্য অসুবিধাজনক বেশিরভাগ অনুচ্ছেদ সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান সংবিধান থেকে বিদায় করে দিয়ে গিয়েছেন। বাহাত্তরের সংবিধানের প্রস্তাবনায় যে ‘জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে’ কথাগুলো লেখা ছিল, জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে সামরিক ফরমান দ্বারা এই কথাগুলো পালটে লিখিয়ে গিয়েছেন ‘জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধের মাধ্যমে’। একাত্তরে সংঘটিত যুদ্ধটি স্বাধীনতার জন্য ছিল না, ছিল দেশকে শত্রুমুক্ত করার জন্য। বাংলাদেশ ২৬ মার্চ থেকেই স্বাধীন, ১৬ ডিসেম্বর দেশ শত্রুমুক্ত হয়েছে মাত্র। একাত্তরের যুদ্ধকে ‘জাতীয় স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ’ বললে এর অর্থ দাঁড়ায় ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই দেশ পাকিস্তানই ছিল। এর ফলে, বাংলাদেশের প্রণীত আইন দ্বারা একাত্তরে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচার করা আইনানুগভাবে সম্ভব হয় না। কেননা, বাংলাদেশে প্রণীত আইন নিশ্চয়ই পাকিস্তানে প্রযোজ্য না। ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই ভূখণ্ড যদি পাকিস্তান বলেই গণ্য হয়, তা হলে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীরা দায়মুক্ত হয়ে যান; কারণ, যুদ্ধাপরাধ তারা তা হলে বাংলাদেশে করেননি, পাকিস্তানে করেছেন। সংবিধান সংশোধন করে প্রস্তাবনার কিছু শব্দ পালটে দিয়ে জিয়াউর রহমান জামায়াতের এই বিশাল উপকারটি করে গিয়েছিলেন। ‘ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে’ কথাগুলো কেটে ‘ঐতিহাসিক যুদ্ধের মাধ্যমে’ লিখলে এর মানে দাঁড়ায় বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে কেবল নয় মাসের যুদ্ধের মাধ্যমে। এই সামান্য এক শব্দের পরিবর্তনের মাধ্যমে বায়ান্ন, চুয়ান্ন, আটান্ন, বাষট্টি, ছেষট্টি এবং ঊনসত্তরকে অস্বীকার করা হয়; অস্বীকার করা হয় এই লেখার শুরুতে বিচারপতি গোলাম রাব্বানির বরাত দিয়ে উল্লিখিত শত-শত বছরের পুরোনো সংগ্রামগুলোকেও।
ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর যে-নিষেধাজ্ঞা, দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের যে-ভোটাধিকারপ্রত্যাহার এবং যে-ধর্মনিরপেক্ষতা জামায়াতের রাজনীতির পথে প্রতিবন্ধকতা ছিল; ১৯৭৮ সালে সামরিক ফরমান দ্বিতীয় প্রজ্ঞাপন জারি করে এবং ১৯৭৯ সালের এপ্রিল মাসে পঞ্চম সংশোধনী এনে সংবিধান থেকে জিয়াউর রহমান সেগুলোও নির্বংশ করে দিয়ে গিয়েছেন। জিয়া সংবিধান থেকে কেবল ধর্মনিরপেক্ষতাকেই বিদায় করেননি; সংবিধানের শুরুতে যুক্ত করে গিয়েছেন ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’, মূলনীতিতে যুক্ত করেছেন ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহ্র ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ এবং পঞ্চবিংশ অনুচ্ছেদে যুক্ত করেছেন— ‘রাষ্ট্র ইসলামি সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্বসম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ ও জোরদার করিতে সচেষ্ট হইবেন’। আরেক সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮৮ সালের জুন মাসে অষ্টম সংশোধনী এনে সংবিধানে যুক্ত করে রেখে গিয়েছেন রাষ্ট্রধর্ম। বলাই বাহুল্য, কোনো ব্যক্তি যুদ্ধাপরাধের দায়ে দালাল আদেশে দণ্ডিত হলে তিনি সংসদনির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না বলে যে-আইনটা বাহাত্তরের সংবিধানে ছিল, সেটিও এখন আর কার্যকর নেই। কার্যকর নেই বলেই দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীরা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের মন্ত্রী হয়েছেন। বর্তমান সংসদেও জামায়াতে ইসলামির এমন একজন সাংসদ আছেন, একাত্তরে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত যাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল (পরবর্তীকালে উচ্চআদালতের রায়ে খালাশ পেয়েছেন)। প্রসঙ্গত, আজই সংবাদমাধ্যমে দেখলাম— পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে বসবাসরত, মির জাফরের তিন শতাধিক বংশধরের নাম, ভারত সরকার ভোটারতালিকা থেকে প্রত্যাহার করেছে এবং সেই বংশধরেরা আদালতে লড়তে গিয়েছেন ভোটাধিকার ফেরত পাওয়ার জন্য। পক্ষান্তরে, বাংলাদেশের বর্তমান সংসদে অন্তত চারজন সদস্য আছেন, যাদের বাবারা একাত্তরে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন; এর মধ্যে তিনজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, একজনের মৃত্যুদণ্ড বাতিল হওয়ায় আমৃত্যু কারাদণ্ড ভোগ করতে-করতে মৃত্যুবরণ করেছেন।
দেখা যাচ্ছে— বাহাত্তরের সংবিধানে জামায়াতে ইসলামির জন্য যেসব অসুবিধা ছিল, বর্তমান সংবিধানে সেসব অসুবিধাজনক অনুচ্ছেদের একটিও অবশিষ্ট নেই; আছে বরং নানান রকমের সুবিধা। তবুও জামায়াত, এবি পার্টি, নাগরিক পার্টি, ইনকিলাব মঞ্চ— তথা সম্মিলিত জামায়াতে ইসলামি বর্তমান সংবিধানকে বাহাত্তরের সংবিধান বলেই আখ্যা দিয়ে যাচ্ছে এবং এই সংবিধান বাতিল করে সম্পূর্ণ নতুন সংবিধান প্রণয়ন করতে চাইছে। বলা বাহুল্য— জামায়াতে ইসলামির নতুন সংবিধানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র তো থাকবেই না, থাকবে না মুক্তিযুদ্ধেরই আদৌ অস্তিত্ব। জামায়াতে ইসলামির ক্যালেন্ডার শুরু হবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে। জামায়াতের সংবিধানে চব্বিশের জুলাই আন্দোলন থাকবে, সাতচল্লিশের দেশভাগ থাকবে, তিতুমিরের বাঁশের কেল্লা থাকবে, হাজি শরিয়তউল্লাহ্র ফরায়েজি আন্দোলন থাকবে, মির কাশিমের বক্সারের যুদ্ধ থাকবে; থাকবে না একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, যে-যুদ্ধে জামায়াত বিদেশী সেনাবাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে স্বদেশীদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছিল। ৫ আগস্টের পর থেকেই জামায়াত একাত্তরের সবকিছুকে চব্বিশ দিয়ে প্রতিস্থাপন করার প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালিয়েছে; তাতে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হলেও কিছু-কিছু ব্যাপারে সাময়িকভাবে সফলও হয়েছে, বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হয়েছে জেনারেশন জেডকে, মুক্তিযুদ্ধসংশ্লিষ্ট সবকিছুর ব্যাপারে সন্দেহ সেঁধিয়ে দিতে পেরেছে জনমনে। বাংলাদেশের সংবিধান যেহেতু মুক্তিযুদ্ধের ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এবং জামায়াত যেহেতু মুক্তিযুদ্ধসংশ্লিষ্ট সবকিছুকেই সমূলে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়, সেজন্য দলটি দীর্ঘদিন ধরে লেগে আছে সংবিধানের পেছনে। এই অভিসন্ধি বাস্তবায়নের পেছনেও জামায়াত জেনারেশন জেডকেই ব্যবহার করছে, এরই অংশ হিশেবে জেনারেশন জেডের একজন সাংসদকে দিয়ে জামায়াত বলিয়েছে— জেনজি বাহাত্তরের সংবিধান চায় না।
