ক্ষুধার মৌসুমি সংকট থেকে কর্মসংস্থান, কৃষি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার পথে উত্তরবঙ্গ
একসময় উত্তরবঙ্গের মানুষের কাছে ‘মঙ্গা’ ছিল প্রতিবছরের এক নির্মম বাস্তবতা। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর আমন ধান রোপণ ও কাটার মধ্যবর্তী সময়ে কৃষিশ্রমিকের কাজ কমে যেত, আয় কমে যেত, অথচ খাদ্যের প্রয়োজন কমত না। বিশ্বব্যাংকের নথিতে বৃহত্তর রংপুরের এই পরিস্থিতিকে seasonal deprivation এবং monga হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০০৫ সালে রংপুর বিভাগের দারিদ্র্যের হার ছিল জাতীয় ও গ্রামীণ গড়ের চেয়ে অনেক বেশি।
মঙ্গা তাই শুধু খাদ্যের অভাব ছিল না; এটি ছিল কর্মসংস্থানের অভাব, কৃষির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, দুর্বল যোগাযোগ, শিল্পের স্বল্পতা এবং বিকল্প আয়ের সুযোগের সংকট।
এই বাস্তবতা মোকাবিলায় শেখ হাসিনা সরকারের বিভিন্ন মেয়াদে কৃষি, কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অবকাঠামো, শিল্পায়ন, নারীর কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়।
উত্তরা EPZ: উত্তরাঞ্চলে শিল্পের নতুন দরজা:
উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল নীলফামারীতে উত্তরা EPZ প্রতিষ্ঠা।
BEPZA-এর তথ্য অনুযায়ী, উত্তরা EPZ প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০১ সালে। এটি উত্তর বাংলাদেশের প্রথম রপ্তানিমুখী শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে ওঠে। ২১৩.৬৬ একর এলাকায় ১৯০টি শিল্প প্লট রয়েছে। বর্তমানে এখানে ৩৫,৯২১ জনের কর্মসংস্থান, প্রায় ২৯১.৭৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ এবং ৩.৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি রপ্তানি হয়েছে।
BEPZA-এর ২০১৮ সালের তথ্যেও বলা হয়েছিল, উত্তরা EPZ-তে তখন প্রায় ৩২ হাজার বাংলাদেশি নাগরিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছিল এবং এটি নারী ক্ষমতায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।
এখানে শেখ হাসিনা সরকারের নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট উত্তরবঙ্গের মানুষের আয়ের জন্য শুধু কৃষির ওপর নির্ভর না করে শিল্পভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি।
মঙ্গাপ্রবণ নারীদের জন্য NARI প্রকল্প:
মঙ্গা মোকাবিলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলোর একটি ছিল Northern Areas Reduction-of-Poverty Initiative (NARI)।
বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প নথি অনুযায়ী, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও রংপুর এই পাঁচটি মঙ্গাপ্রবণ জেলাকে প্রকল্পের আওতায় আনা হয়। লক্ষ্য ছিল দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে পোশাকশিল্পে কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করা।
২০১৬ সালের ১ আগস্ট BEPZA জানায়, উত্তরবঙ্গের বেকার নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থানে যুক্ত করার NARI প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। BEPZA স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় নেওয়া হয়েছিল এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছিল।
এ উদ্যোগের দর্শন ছিল গুরুত্বপূর্ণ, মঙ্গার সময়ে সাময়িক সহায়তার পরিবর্তে নারীদের দক্ষতা, আয় ও শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা।
বঙ্গবন্ধু সেতু উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির ভৌগোলিক বাধা ভাঙে:
বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ১৯৯৮ সালের জুনে বঙ্গবন্ধু সেতু চালু করেন এবং ১৯৯৯ সাল থেকে এর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে গবেষণা হয়েছে।
কিন্তু এর প্রভাব পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার সরকারের সময়েও উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও বাজারব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বিশ্বব্যাংকের গবেষণা বলছে, সেতুটি উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলকে ঢাকার সঙ্গে সংযুক্ত করে যাতায়াতের সময় কমিয়েছে, পণ্য পরিবহন ব্যয় কমিয়েছে এবং কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারণে ভূমিকা রেখেছে। একটি বিশ্বব্যাংক গবেষণা-সারাংশে বলা হয়েছে, সেতুর ফলে যাতায়াতের সময় অন্তত ৪ ঘণ্টা কমে এবং মালবাহী পরিবহন ব্যয় প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে।
বিশ্বব্যাংকের আরেক গবেষণায় দেখা যায়, সেতু চালুর পর ট্রাকভাড়া প্রায় ৩০ শতাংশ কমে এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পচনশীল সবজি পূর্বাঞ্চলের বাজারে যাওয়ার পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। একই গবেষণায় উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি উৎপাদনশীলতা ও সেবা খাতে কর্মসংস্থানের ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
প্রথম আলো ২০২২ সালে লিখেছিল, বঙ্গবন্ধু সেতু চালুর পর উত্তরবঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ে, শিল্প গড়ে ওঠে এবং দারিদ্র্য কমে। প্রতিবেদনে ১৯৯৫-৯৬ সালের রাজশাহী বিভাগের দারিদ্র্যহার ৬২ শতাংশের বেশি এবং পরবর্তী সময়ে রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলে দারিদ্র্য কমার তথ্য তুলে ধরা হয়।
স্বল্পমেয়াদি ধানের জাত মঙ্গার মৌসুমি সংকটে বড় পরিবর্তন:
মঙ্গা মোকাবিলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের একটি ছিল স্বল্পমেয়াদি আমন ধানের জাতের বিস্তার। ২০০৯ সালের ২৭ অক্টোবর The Daily Star লিখেছিল, BRRI dhan-33 ও BINA dhan-7 মাত্র প্রায় ১১৫ দিনে পরিপক্ব হয়ে প্রচলিত BR-11-এর তুলনায় প্রায় এক মাস আগে কাটার সুযোগ তৈরি করেছিল। পত্রিকাটি তখন লিখেছিল, এই প্রযুক্তি বৃহত্তর রংপুরের প্রায় ৩৭ লাখ দরিদ্র মানুষের জন্য মঙ্গার মৌসুমি চাপ কমানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১২৭টি আধুনিক ধানের জাত উদ্ভাবিত হয়েছে এবং ধানের জাত উন্নয়ন, শস্য-মাটি-পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর এসব নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা হয়েছে। শেখ হাসিনা সরকার বরাবরই কৃষি গবেষণাকে উৎসাহিত করেছে।
৩. বৃহত্তর রংপুর–দিনাজপুরে গ্রামীণ যোগাযোগের মহাপরিকল্পনা:
২০১০ সালে শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে অনুমোদিত হয় Greater Rangpur-Dinajpur Districts Rural Communication & Other Infrastructure Development Project।
LGED-এর সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির অনুমোদনের তারিখ ২০ এপ্রিল ২০১০ এবং বাস্তবায়নকাল ছিল জুলাই ২০১০ থেকে জুন ২০১৮। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ছিল ৬৩৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।
প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল শুধু রাস্তা নির্মাণ নয়; সরকারি নথিতে সরাসরি বলা হয়েছে,
এর উদ্দেশ্যের মধ্যে ছিল দারিদ্র্য হ্রাস এবং গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
প্রকল্পের আওতায় ছিল-
– ১৬১ কিলোমিটার উপজেলা সড়ক উন্নয়ন
– ৩৪৩ কিলোমিটার ইউনিয়ন সড়ক উন্নয়ন
– ৪০৭ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন
– বিভিন্ন সড়কে সেতু ও কালভার্ট
– ৩০টি গ্রামীণ বাজার উন্নয়ন
– তিস্তা নদীর ওপর ৮৫০ মিটার সেতু
– মঙ্গাপ্রবণ গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামে নারীদের মাধ্যমে ৩,০৮০ কিলোমিটার সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ।
অর্থাৎ এখানে রাস্তা ছিল শুধু যোগাযোগের অবকাঠামো নয়; রাস্তা নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণকেও দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
তিস্তা নদীর ওপর ৮৫০ মিটার সেতু:
উল্লিখিত প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে তিস্তা নদীর ওপর ৮৫০ মিটার PC Girder Bridge নির্মাণ।
LGED-এর সরকারি প্রকল্প নথিতে সেতুটিকে বৃহত্তর রংপুর–দিনাজপুরের গ্রামীণ যোগাযোগ উন্নয়ন প্রকল্পের অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
একটি সেতুর অর্থ শুধু দুই তীরের সংযোগ নয়। এর অর্থ কৃষিপণ্য পরিবহন, বাজারে প্রবেশ, মানুষের চলাচল এবং স্থানীয় ব্যবসার পরিধি বাড়ার সুযোগ।
রংপুর বিভাগের জন্য আরও বড় গ্রামীণ অবকাঠামো কর্মসূচি:
২০১৩ সালে অনুমোদিত Rangpur Division Rural Infrastructure Improvement Project-এর মাধ্যমে রংপুর বিভাগের আট জেলায় গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
LGED-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির অনুমোদন হয় ১৭ নভেম্বর ২০১৩ এবং বাস্তবায়নকাল ছিল অক্টোবর ২০১৩ থেকে জুন ২০১৯। প্রকল্পের বাজেট ছিল প্রায় ৭৩৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা।
প্রকল্পের আওতায় ছিল—
– প্রায় ১৭৫ কিলোমিটার উপজেলা সড়ক
– প্রায় ৩৬৬.৬৭ কিলোমিটার ইউনিয়ন সড়ক
– প্রায় ২০০ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক
– সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ
– গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন।
এরপর ২০১৭–১৮ সময়কালে Rangpur Division Rural Infrastructure Improvement Project–2nd Phase নেওয়া হয়। এই প্রকল্পে ১৬৯.৫২ কিলোমিটার উপজেলা সড়ক, ৬০১.১৯ কিলোমিটার ইউনিয়ন সড়ক, ৯৫৪.৮৩ কিলোমিটার Village Road-A, ৮২৮.৩৫ কিলোমিটার Village Road-B, ৪,৪৮৮.৫৫ মিটার সেতু এবং ৭২৮.৪৭ মিটার কালভার্টের পরিকল্পনা রাখা হয়।
কৃষিকে মঙ্গা মোকাবিলার প্রধান অস্ত্র করা:
মঙ্গার মূল সমস্যা ছিল কৃষির মৌসুমি চরিত্র। ধান রোপণ ও কাটার মধ্যবর্তী সময়ে কৃষিশ্রমিকের কাজ কমে যেত।
বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় রংপুরের মঙ্গা মোকাবিলায় নতুন crop technology, সরকারি কর্মসংস্থান কর্মসূচি, সামাজিক নিরাপত্তা, অভিবাসনের সুযোগ, দক্ষতা উন্নয়ন ও সম্পদ হস্তান্তরসহ বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বল্পমেয়াদি আমন ধানের জাত এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কম সময়ে ফসল ঘরে তোলার সুযোগ তৈরি হওয়ায় মঙ্গার সঙ্গে ফসল উৎপাদনের সময়ের যে অসামঞ্জস্য ছিল, তা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
কৃষিতে সেচ, উন্নত বীজ, সার ও প্রযুক্তিগত সহায়তার বিস্তারও কৃষকের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির বৃহত্তর নীতির অংশ ছিল।
কৃষির বাইরে কর্মসংস্থান: মঙ্গার কাঠামোগত সমাধান:
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরে শুধু সামাজিক নিরাপত্তা দিয়ে মঙ্গা স্থায়ীভাবে দূর করা যায় না। কৃষিনির্ভর অর্থনীতির বাইরে আয় ও কর্মসংস্থানের বৈচিত্র্য তৈরি করা প্রয়োজন।
শেখ হাসিনা সরকারের উত্তরাঞ্চলকেন্দ্রিক বিভিন্ন প্রকল্পে তাই তিনটি বিষয় পাশাপাশি দেখা যায়:
কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি → গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন → অ-কৃষি কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
উত্তরা EPZ, NARI প্রকল্প, গ্রামীণ রাস্তা ও বাজার উন্নয়ন সবগুলোকে এই বৃহত্তর অর্থনৈতিক রূপান্তরের অংশ হিসেবে দেখা যায়।
গ্রামীণ বাজারকে কৃষকের উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করা:
LGED-এর বৃহত্তর রংপুর–দিনাজপুর প্রকল্পের সরকারি উদ্দেশ্যপত্রে বলা হয়েছে, গ্রামীণ হাট-বাজারের উন্নয়ন করে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পরিবেশ তৈরি এবং কৃষি উৎপাদনে উৎসাহ সৃষ্টি করা প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
এখানে মঙ্গা মোকাবিলার আরেকটি মৌলিক সূত্র পাওয়া যায়:
কৃষকের উৎপাদন বাড়ানো যথেষ্ট নয়; উৎপাদিত পণ্য বাজারে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হয়।
সড়ক, সেতু ও হাট-বাজার উন্নয়ন সেই বাজারসংযোগকে শক্তিশালী করেছে।
নারীকে মঙ্গা মোকাবিলার অর্থনীতির অংশ করা:
মঙ্গাপ্রবণ অঞ্চলে নারীদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি ছিল NARI প্রকল্পের বিশেষ লক্ষ্য।
বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প নথিতে বলা হয়েছে, মঙ্গাপ্রবণ অঞ্চলের নারীদের অ-কৃষি কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত ছিল। NARI প্রকল্প তাদের প্রশিক্ষণ, পরিবহন, আবাসন ও শিল্পখাতে কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করার কাঠামো তৈরি করে।
অর্থাৎ পরিবারের আয় বৃদ্ধির দায়িত্ব শুধু পুরুষ কৃষিশ্রমিকের ওপর না রেখে নারীকেও শ্রমবাজারে যুক্ত করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক পথ তৈরি করা হয়।
শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের শ্রমশক্তির সংযোগ:
NARI প্রকল্পের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল উত্তরাঞ্চলের মঙ্গাপ্রবণ পাঁচ জেলা থেকে দরিদ্র নারীদের EPZ এলাকায় নিয়ে গিয়ে প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা।
বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প নথিতে গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও রংপুর থেকে নির্বাচিত নারীদের ঢাকা, ঈশ্বরদী ও কর্ণফুলী EPZ-এ নেওয়ার ব্যবস্থার কথা রয়েছে।
এটি মঙ্গা মোকাবিলার প্রচলিত ধারণা থেকে একটি বড় পরিবর্তন। মঙ্গার সময় মানুষকে শুধু সাহায্য করার বদলে মানুষকে এমন জায়গায় পৌঁছে দেওয়া, যেখানে সে আয় করতে পারে।
ঈশ্বরদী EPZ: উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আরেক শিল্পভিত্তি:
শুধু নীলফামারী নয়, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পায়নে ঈশ্বরদী EPZ-ও গুরুত্বপূর্ণ।
এ ধরনের EPZ-ভিত্তিক শিল্পায়নের মাধ্যমে কৃষিনির্ভর অঞ্চলে উৎপাদন, রপ্তানি ও শ্রমভিত্তিক কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। NARI প্রকল্পের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান কাঠামোর মধ্যেও ঈশ্বরদী EPZ যুক্ত ছিল।
শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন:
শিল্পায়নের সঙ্গে শিক্ষা অবকাঠামোও যুক্ত করা হয়েছে। ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর শেখ হাসিনা উত্তরা EPZ Public School & College উদ্বোধন করেন। BEPZA-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি EPZ কর্মীদের সন্তানদের জন্য ভর্তুকিযুক্ত শিক্ষার সুযোগ দেয়।
এ ধরনের উদ্যোগের তাৎপর্য তাৎক্ষণিক মঙ্গা মোকাবিলার চেয়েও দীর্ঘমেয়াদি এক প্রজন্মের শ্রমিক পরিবারের সন্তানদের জন্য উন্নত শিক্ষা ও সামাজিক গতিশীলতার সুযোগ তৈরি করা।
সামাজিক নিরাপত্তা ও সরকারি কর্মসংস্থান:
মঙ্গা মোকাবিলায় শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান কর্মসূচিও সম্প্রসারিত হয়।
বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় মঙ্গা মোকাবিলার উদ্যোগগুলোর মধ্যে public works, safety nets, asset transfer, skill training, migration facilitation এবং microcredit-এর কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ সরকারি নীতিতে মঙ্গা মোকাবিলাকে শুধু খাদ্য সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কাজ, দক্ষতা, আয় এবং সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
উত্তরবঙ্গের যোগাযোগব্যবস্থাকে বৃহত্তর অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা:
শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ধারাবাহিক সড়ক, সেতু, কালভার্ট, গ্রামীণ বাজার ও যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়।
২০১০–২০১৮ সালের GRDP প্রকল্প এবং ২০১৩–২০১৯ সালের RDRIIP-এর পর ২০১৭–২০১৮ সালে RDRIIP-2 গ্রহণ করা হয়। অর্থাৎ এটি বিচ্ছিন্ন একটি প্রকল্প ছিল না; বরং ধারাবাহিক গ্রামীণ অবকাঠামো বিনিয়োগের একটি দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি ছিল।
উত্তরবঙ্গের চা-বিপ্লব:
এখানেও একটি চমৎকার উদাহরণ আছে।
The Daily Star-এর ৭ জুন ২০২১-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা পঞ্চগড় সফরের সময় উত্তরাঞ্চলে চা চাষের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দেন। পরে বাংলাদেশ চা বোর্ড ১৩ অক্টোবর ১৯৯৯ সালে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য কমিটি গঠন করে। ২০০০ সালে পঞ্চগড়ে বাণিজ্যিক চা চাষ শুরু হয়।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের গবেষণাতেও বলা হয়েছে, পঞ্চগড়ে চা চাষ শুরু হয় ২০০০ সালে, ২০০৪ সালে বটলিফ কারখানা স্থাপিত হয় এবং এরপর চা চাষ দ্রুত বিস্তার লাভ করে।
২০২৫ সালে উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলায় চা উৎপাদন ২ কোটি ২ লাখ ৪০ হাজার কেজি ছাড়ায় এবং দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ২১% আসে এই অঞ্চল থেকে।
মঙ্গাপ্রবণ উত্তরবঙ্গে শতভাগ বিদ্যুতায়ন:
উত্তরবঙ্গের মঙ্গা ছিল কেবল খাদ্যসংকটের সমস্যা নয়; এটি ছিল মৌসুমি কর্মসংস্থান, কৃষিনির্ভরতা, যোগাযোগব্যবস্থা ও গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। এই বাস্তবতায় বিদ্যুতায়নকে শুধু ঘরে আলো পৌঁছে দেওয়ার কর্মসূচি হিসেবে নয়, গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল করার অবকাঠামো হিসেবেও দেখা যায়।
রংপুর বিভাগের অন-গ্রিড এলাকায় ১০০ শতাংশ গ্রামকে বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায় আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জিত হয় ২০২০ সালে। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের রংপুর জোনের তথ্য অনুযায়ী, ৩১ জুলাই ২০২০-এর মধ্যে বিভাগের অন-গ্রিড এলাকার ৯,২৯৮টি গ্রাম এবং ৫১৪টি ইউনিয়ন শতভাগ বিদ্যুৎ সরবরাহ নেটওয়ার্কের আওতায় আসে। তখনও কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার দুর্গম চরাঞ্চলের ১১৮টি অফ-গ্রিড গ্রাম বিদ্যুতায়নের কাজ চলছিল।
এর ফলে বিদ্যুতায়ন শুধু গৃহস্থালির জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনেনি; গ্রামীণ অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ে। BSS-এর ২০২১ সালের প্রতিবেদনে BREB-এর রংপুর জোনের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, রংপুর বিভাগের গ্রামীণ এলাকায় প্রায় ৩৪ লাখ বিভিন্ন ধরনের বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছিল, যার আওতায় ছিল প্রায় ৩১.৯৫ লাখ সুবিধাভোগী পরিবার। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যুৎনির্ভর কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং অন্যান্য উদ্যোক্তা কার্যক্রমের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।
মঙ্গার বিরুদ্ধে নীতির দর্শন:
উত্তরবঙ্গের মঙ্গা কোনো একদিনে সৃষ্টি হয়নি; তাই কোনো একটি প্রকল্প দিয়েও তা দূর করা সম্ভব ছিল না।
মঙ্গার পেছনে ছিল:
মৌসুমি কৃষি → মৌসুমি কর্মসংস্থান → আয় সংকট → খাদ্য সংকট → দারিদ্র্যের পুনরুৎপাদন।
শেখ হাসিনা সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগে এই চক্রের বিভিন্ন জায়গায় হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেছে।
স্বল্পমেয়াদি কৃষি প্রযুক্তি দিয়ে উৎপাদনের সময়ের সংকট মোকাবিলা,
রাস্তা-সেতু ও বাজার দিয়ে কৃষিকে বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা,
EPZ ও শিল্পায়ন দিয়ে কৃষির বাইরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি,
NARI দিয়ে মঙ্গাপ্রবণ এলাকার নারীদের শ্রমবাজারে যুক্ত করা,
সামাজিক নিরাপত্তা ও সরকারি কর্মসূচি দিয়ে সংকটকালে আয় ও খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার করা,
এবং গ্রামীণ অবকাঠামো দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তি শক্তিশালী করা।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণও দেখিয়েছে, মঙ্গা মোকাবিলায় নতুন কৃষি প্রযুক্তি, সরকারি কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, দক্ষতা উন্নয়ন, অভিবাসন ও আয়-বৈচিত্র্য সবগুলোকে একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তাই উত্তরবঙ্গের মঙ্গা কমার ইতিহাসকে যদি একটি বাক্যে বলা হয়, তবে তা হবে-
শুধু ত্রাণ নয়, উৎপাদন; শুধু খাদ্য নয়, কর্মসংস্থান; শুধু রাস্তা নয়, বাজারসংযোগ; শুধু শিল্প নয়, মানুষের দক্ষতা এই বহুমুখী নীতির সমন্বয়েই মঙ্গার পুরোনো অর্থনৈতিক কাঠামো দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়েছে।
আর সেই নীতির ধারাবাহিক বাস্তবায়নে শেখ হাসিনা সরকারের কৃষি, অবকাঠামো, শিল্পায়ন, নারী কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তামুখী পদক্ষেপগুলো উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
লেখক: মো: দেলোয়ার হোসেন শাহজাদা, উপ-দপ্তর সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ
