Close Menu

    সাবস্ক্রাইব

    সর্বশেষ খবরের সাথে আপডেট থাকুন।

    জনপ্রিয় সংবাদ

    ভারতবর্ষ ও অ্যালেন গিন্সবার্গ

    October 9, 2026

    আমাদের এক বন্ধু

    October 9, 2026

    বাবা-মা সন্তানের ধর্ম ঠিক করবেন, জাপান বললো-না

    October 9, 2026
    Facebook Instagram WhatsApp TikTok
    Facebook Instagram YouTube TikTok
    JoyBangla – Your Gateway to Bangladesh
    Subscribe
    • হোম পেইজ
    • বিষয়
      • দেশ (Bangladesh)
      • আন্তজাতিক (International)
      • জাতীয় (National)
      • রাজনীতি (Politics)
      • অথনীতি (Economy)
      • খেলা (Sports)
      • বিনোদন (Entertainment)
      • লাইফ স্টাইল (Lifestyle)
      • শিক্ষাঙ্গন (Education)
      • টেক (Technology)
      • ধম (Religion)
      • পরবাস (Diaspora)
      • সাক্ষাৎকার (Interview)
      • শিল্প- সাহিত্য (Art & Culture)
      • সম্পাদকীয় (Editorial)
    • আমাদের সম্পর্কে
    • যোগাযোগ করুন
    JoyBangla – Your Gateway to Bangladesh
    Home » ভারতবর্ষ ও অ্যালেন গিন্সবার্গ
    Art & Culture

    ভারতবর্ষ ও অ্যালেন গিন্সবার্গ

    JoyBangla EditorBy JoyBangla EditorOctober 9, 2026Updated:October 9, 2026No Comments24 Mins Read
    Facebook WhatsApp Copy Link
    Share
    Facebook WhatsApp Copy Link

     রাজীব সিংহ

     0  বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬

    আমেরিকা কবে আমরা মানুষের হানাহানি বন্ধ করবো?

    যাও নিজেদের আণবিক অস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করো…

    বাংলা ভাষায় অনূদিত একটি চটি পুস্তিকা, নাম ‘অ্যালেন গিন্সবার্গ-এর কবিতা’, এই কবিতাপুস্তিকাটির মাধ্যমে আমার প্রথম অ্যালেন গিন্সবার্গ পড়া শুরু৷ তখন স্কুলের গণ্ডী পেরিয়ে সবে কলেজে যাচ্ছি৷ সময়টা গত শতাব্দীর নয়ের দশকের শুরুর দিক৷ এই কবিতাপুস্তিকাটি অনুবাদ করেছিলেন মলয় রায়চৌধুরী, প্রকাশ করেছিল ‘কবিতা পাক্ষিক’৷ মাত্র তিনটি কবিতা বাংলায় অনূদিত হয়েছিল ওই কৃশকায় পুস্তিকাটিতে— হাউল, বাস্তব সিংহ (দ্য লায়ন ফর রিয়্যাল), আমেরিকা৷ আমার মতোই আরো অনেক বাঙালি পাঠক তাঁর, মলয়ের আশ্চর্য অনুবাদে পড়ে উঠেছিল অ্যালেনকে৷ অ্যালেনকে নিয়ে এ বাংলায় ছড়িয়ে থাকা প্রায় মিথ হয়ে যাওয়া নানাধরনের বিতর্ক, গুজব, পরস্পরবিরোধী মতামত, হাংরি জেনারেশন আন্দোলন, কৃত্তিবাস সর্বোপরি তাঁর বহুবিধ বর্ণময় ব্যক্তিত্বের কারণে তাঁর লেখালিখি ও জীবনযাপন সম্পর্কে কৌতূহলী হওয়াটাই স্বাভাবিক৷ শ্রেণীহীন সমাজের স্বপ্ন দুচোখে মেখে অ্যালেন এই গ্রহের এপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে ছুটে বেরিয়েছেন৷ আমেরিকান পুঁজিবাদ ও ধনতন্ত্রের বিরোধিতার পাশাপাশি একজন কবি যাবতীয় সামাজিক ভণ্ডামির বিরুদ্ধে, প্রথাগত অনৈতিক সংস্কারগুলির বিরুদ্ধে, এমনকি বিশ্বব্যাপী ঘটে যাওয়া গণ-আন্দোলনগুলির সমর্থনে বারবার যেভাবে সোচ্চার হয়েছেন সেখান থেকেই অ্যালেনের কবিতা আমাদের আশ্রয় হয়ে ওঠে৷

    অ্যালেন গিন্সবার্গের জন্মশতবর্ষ লোগো

    তখন তিনি ইংরেজি ভাষা তথা আমেরিকার অন্যতম প্রধান একজন কবি৷ তাঁর লেখা বই বাঙালি তরুণ কবিদের, অন্তত যারা নতুন করে কিছু ভাবতে চায়, তাদের ঘরে ঘরে৷ কেনার সামর্থ্য না থাকলে লাইব্রেরি ভরসা৷ তখন ইণ্টারনেট, গুগল কিছুই ছিল না৷ তবে ন্যাশনাল লাইব্রেরি, ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরি, গোলপার্ক রামকৃষ্ণ লাইব্রেরি ছাড়াও কলকাতা শহরে তখন আমেরিকান সেণ্টার লাইব্রেরির রমরমা৷ পড়তে চাইলে পড়বার কোনও অসুবিধে ছিল না৷ বাধা ছিল না এমনকী কানে হেডফোন দিয়ে মিউজিক সিস্টেমে গান শোনবার, সিনেমা দেখার৷ আমেরিকান সেণ্টার লাইব্রেরিতে তখন এরকমই উন্নত ব্যবস্থা৷ এর ফলে এক ভিন্নতর দিগন্ত খুলে গিয়েছিল যেন৷ তখনই তরুণ বাঙালি কবিরা গিন্সবার্গকে আপন করে নিয়েছিল৷ তাঁর ব্যতিক্রমী জীবনযাপনের নানা রকমের ঘটনা, বিতর্ক ও প্রতিবাদ সহজেই তরুণ কবিদের আকৃষ্ট করতো৷ আকৃষ্ট করত ‘হাউল’, ‘ক্যাডিশ’ বা ‘আমেরিকা’র মতো তাঁর লেখা কবিতাগুলি প্রধানত সেগুলির সৎ, স্পষ্ট, তীব্র অনুভূতিসম্পন্ন স্বীকারোক্তিমূলক গভীর উচ্চারণের কারণে৷

    America I’ve given you all and now I’m nothing.

    America two dollars and twentyseven cents January 17, 1956.  

    I can’t stand my own mind.

    America when will we end the human war?

    Go fuck yourself with your atom bomb.

    I don’t feel good don’t bother me.

    I won’t write my poem till I’m in my right mind.

    America when will you be angelic?

    When will you take off your clothes?

    When will you look at yourself through the grave?

    When will you be worthy of your million Trotskyites?

    America why are your libraries full of tears?

    America when will you send your eggs to India?

    I’m sick of your insane demands.

    When can I go into the supermarket and buy what I need with my good looks? … (America)

    ‘অ্যালেন গিন্সবার্গ-এর কবিতা’ এই কবিতাপুস্তিকাটির ‘পরিশিষ্ট’ অংশে মলয় রায়চৌধুরী সংক্ষিপ্ত কয়েকটি বাক্যে অ্যালেন গিন্সবার্গ সম্পর্কে যে কথাগুলি লিখেছিলেন সেগুলি পড়লে অনেক কৌতূহলের নিরসন ঘটে—

    ষাটের দশকে অ্যালেন গিন্সবার্গ আমাদের পাটনার বাড়িতে এলে ওঁর সঙ্গে আমার আলাপ হয়৷ তার আগে উনি আমার দাদা সমীর রায়চৌধুরীর চাইবাসার বাসায় কিছুদিন ছিলেন৷ পাটনার বাড়িতে উনি ধুতি-পাঞ্জাবি পরে থাকতেন৷ মাটিতে আসন পেতে শুক্তো মোচার ঘন্ট বিউলির ডাল সরষে দিয়ে মাছ খেতেন এবং আমার বাবার সঙ্গে হিন্দুধর্ম নিয়ে আলোচনা করতেন৷ গিন্সবার্গ-এর আগে ও পরে নেপালে যাবার পথে হিপিরা আমাদের বাড়িতে ট্রানজিট হল্ট করতেন৷ মায়ের অনেক অসুবিধে হতো নিশ্চয়ই, এখন বুড়ো বয়সে মনে হয়৷… আমাদের পাটনার বাড়িতে থাকার সময় গিন্সবার্গকে নেশাভাঙ করতে দেখিনি৷ সকালে ঘুম ভাঙতেই মশারির মধ্যে লিখতে বসে যেতেন৷ ঝোলার ডায়েরিতে সারাদিন কিছু মনে এলেই লিখে নিতেন টুকটাক৷ দিনের বেশিরভাগ সময় কাটাতেন কালীমন্দির, মিউজিয়ামে, খুদাবক্স লাইব্রেরিতে, গোলঘরে৷ কখনও ফণীশ্বরনাথ রেণুর বা রাজকমল চৌধুরীর বাসায় আড্ডা৷

    ১৯৬২-৬৩ নাগাদ এক বছরেরও বেশি সময় ভারতবর্ষে কাটানোর সময় গিন্সবার্গ ভারতের সন্ত-সন্ন্যাসী, যোগী, কবি, লেখক, ভাবুক, মিউজিশিয়ান এবং জগদ্বিখ্যাত জাতির পিতা দলাইলামার মতো নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে মিশেছিলেন গভীরভাবে৷ এ ছিল তাঁর আত্মানুসন্ধান প্রক্রিয়ারই এক বিস্তৃত অধ্যায়৷ বেনারসের মণিকর্নিকা ঘাটের শ্মশান থেকে কলেজ স্ট্রিটের কফিহাউস পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিল সেই আশ্চর্য ধূসর যাত্রাপথ৷ ১৯৬২ সালে অ্যালেন গিন্সবার্গের ভারত-যাত্রার মধ্য দিয়ে ভারতের সাথে তাঁর সম্পর্কের সূচনা হয়৷ সে সময় তিনি পিটার অরলোভস্কির সঙ্গে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে একজন আধ্যাত্মিক গুরুর সন্ধানে ভারত ভ্রমণ করেন৷ এই যাত্রাপথে তিনি গ্যারি স্নাইডার ও জোয়ান কাইগারের সাথে হিমালয়, অজন্তা ও ইলোরার গুহা এবং সাঁচি ও সারনাথের বৌদ্ধতীর্থস্থানগুলোতে ঘুরে বেড়ান৷ এছাড়াও কলকাতা ও বেনারসে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেন৷ তিনি তিব্বতি লামা চোগিয়াম চুংপা রিনপোচের সাথেও, তখনও অ্যালেন অবশ্য তাঁকে চিনতেন না, না চিনেই দেখা করেছিলেন৷ প্রসঙ্গত এই চুংপা রিনপোচই পরবর্তীতে ১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে কলোরাডোর বোল্ডারে ‘নারোপা ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং গিন্সবার্গের গুরুতে পরিণত হন৷

    বাংলাদেশে তখন মুক্তিযুদ্ধ চলছে৷ সত্তর দশক৷ এপার পশ্চিমবাংলাও তখন বিপ্লব-বিক্ষুব্ধ৷ নকশালবাড়ির আগুনের ঢেউ গ্রাম থেকে শহরে ছড়িয়ে পড়েছে৷ সীমান্ত অঞ্চল জুড়ে শরনার্থীশিবির৷ এক অদ্ভূত সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশের কলকাতায় অ্যালেন দ্বিতীয়বার আসেন৷ এই ছিল তাঁর দ্বিতীয় বারের ভারত-ভ্রমণ৷ মানুষের দুর্দশা, হতাশা, নিপীড়ন, দারিদ্র্য, অসহায়তা— শরনার্থীদের শিবিরগুলো বনগাঁ সীমান্তে যেতে যেতে চাক্ষুষ করেন অ্যালেন৷ এই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতাই এক মানবিক অনুভূতিতে ঋদ্ধ হয়ে ওই সময়ে লেখা অ্যালেনের বিখ্যাত কবিতা সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড-এ হয়ে উঠেছে মন্ত্রের মতোন৷

    গিন্সবার্গ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থিত বাংলাদেশী শরণার্থী শিবিরগুলোতে ঘুরে বেরিয়েছিলেন৷ এই সময়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি একটি দীর্ঘকবিতা লেখেন যার নাম ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’৷ আমেরিকায় ফিরে গিয়ে বন্ধু বব ডিলান ও অন্যান্যদের সহায়তায় এই কবিতাটিকে তিনি গানে রূপ দিয়েছিলেন৷ কনসার্টে এই গান গেয়ে তাঁরা বাংলাদেশী শরণার্থীদের সহায়তার জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন৷

    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখছেন, ‘অ্যালেনের নিজস্ব সুরে, নিজের গলায় গাওয়া এই কবিতাটির ক্যাসেট এবং সি.ডি. পাওয়া যায়’ (‘দেশ’, ২৫.১.৯৭)৷ এখন ইউটিউব সার্চ করলে সহজেই শোনা যায় অ্যালেনের আশ্চর্য সেই কবিতাগান৷ ১৯৭০-এ গিন্সবার্গ প্রকাশ করেন ‘ইন্ডিয়ান জার্নালস’৷ গদ্যের বই৷ মুক্তিযুদ্ধের আগের ও পরের ভারতবাসের অভিজ্ঞতা নিয়ে৷

    একসময় কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ দৈনিক পত্রিকার ‘গ্রাফিতি’ নামে একটি উচ্চমার্গের চটি রবিবাসরীয় ম্যাগাজিন বের হতো৷ সেখানে গত শতাব্দীর নয়ের দশকের শুরুতেই সুরঞ্জন গাঙ্গুলীর নেওয়া অ্যালেন গিন্সবার্গের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল৷ যদিও সাক্ষাৎকারটি তার আগে ‘অ্যারিয়েল: আ রিভিউ অফ ইন্টারন্যাশনাল ইংলিশ লিটারেচার’, ২৪:৪, অক্টোবর ১৯৯৩ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। আমি তখন পড়েছিলাম ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ পত্রিকার ‘গ্রাফিতি’-তে। অ্যালেন গিন্সবার্গ-এর লেখালিখির পাশাপাশি তাঁর চিন্তাভাবনা, দর্শন ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে আমাদের যাদের অপার কৌতূহল, তখনই অ্যালেনের সেই সাক্ষাৎকার পড়ে আমরা চমকে উঠেছিলাম৷ ভারতীয় ধর্ম ও আধ্যাত্মবাদ ও বৌদ্ধধর্মের প্রতি অ্যালেন এতটাই আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলেন যে আমৃত্যু তিনি সেই সাধনাই করে গেছিলেন৷ বৌদ্ধ-গুম্ফা নারোপা ইনস্টিটিউটে পড়ানোর পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনচর্যাতেও সেই প্রভাব রয়ে গেছিল৷ সেই সাক্ষাৎকার যাঁরা পড়েছিলেন তাঁদের মনে থাকবে কীভাবে ‘গতে গতে পরাগতে…’ অথবা প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্র অ্যালেন জপতেন এবং আমৃত্যু নিরামিষাসী জীবন কাটিয়েছিলেন৷ তৃতীয়বার ভারত সফরে আসবার ইচ্ছে প্রকাশ করে ১৯৯৪-এ সুরঞ্জন গাঙ্গুলিকে দেওয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের একটি জায়গায় গিন্সবার্গ ভারতীয় দর্শন ও সংসৃকতির প্রতি তাঁর অন্তরের টান বোঝাতে গিয়ে, ভারতীয় সংসৃকতি থেকে তাঁর প্রাপ্তি ও ব্যক্তিগত জীবনে তার প্রায়োগিক উপযোগিতার উল্লেখ করছেন এইভাবে,

    ‘কবিতাপাঠের আসরগুলিতে বৌদ্ধ ও হিন্দু মন্ত্রগুলি আমি গাইতাম, ‘শ্রীরাম জয় রাম জয় জয় রাম’, ‘হরে কৃষ’ বা ‘ওম্ শ্রীমৈত্রেয়’ ও ‘ওম্ মণিপদ্মে হুম্’ বা ‘ওম্’ বা ‘গতে গতে পরাগতে’— ছোট্ট তাল ঠুকে গাইতাম ‘প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্র’৷ এরপর গান গাওয়ার সূত্র ধরেই মন্ত্রের প্রতি আমার যে গভীর অনুরাগ ছিল, তা ক্রমে পবিত্র সঙ্গীত ও উইলিয়াম ব্লেকের কবিতার দিকে ধাবিত হলো৷ ১৯৬৮ সালে আমি ব্লেকের ‘সংস অফ ইনোসেন্স অ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্স’ (Songs of Innocence and Experience)-এর কবিতাগুলোতে সুর দিতে শুরু করলাম৷ আর ১৯৬৯ সালের মধ্যেই আমি নিজের লেখা লোকগান তৈরির পাশাপাশি ব্লেকের সেই সুর করা গানগুলো রেকর্ড করতে শুরু করলাম৷ এভাবেই গানের জগতে জড়িয়ে গেলাম৷ ১৯৬৩-তে বব ডিলান-এর সঙ্গে আলাপের পরই গানের আঙ্গিকে থাকা নতুন ধারার কবিতার প্রতি আমি আগ্রহী হয়ে উঠি যে ধারার ওপর ‘আর্লিয়ার বিট জেনারেশন’ এবং কেরুয়াক ও আমার নিজের কাজের প্রভাব ছিল৷ ১৯৭০-এ তাঁর (বব ডিলান) সাথে রেকর্ড করলাম গান৷ অতএব ওই যে একটা বীজ পোঁতা হয়েছিল, যার নাম ‘মন্ত্র’, তার থেকেই এতোকিছু হয়ে গেল৷ সবকিছু এক সুতোয় গাঁথা হয়ে উঠল৷ কবিতা ও গানের মধ্যেকার সেই গভীর সংযোগ উদ্ধার করতে আমাকে সাহায্য করেছিল ভারত৷ দেশটি আমাকে যেমন একটি আদর্শ বা মডেল উপহার দিয়েছিল, তেমনি গানের মাধ্যমে সাধু-সন্তদের রচিত কবিতার সাথেও পরিচিত করিয়েছিল৷’ (দ্য টেলিগ্রাফ, ১৬.৬.৯৪. , কলকাতা)৷

    আমি আমার প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ মেধাবীদের উন্মাদনায় ধবংস হতে দেখেছি, অনাহারে, উন্মত্ত নগ্ন অবস্থায়…

    ১৯৫৬ সালে সানফ্রান্সিসকো থেকে তাঁর দীর্ঘ, রাগী, প্রতিবাদী কবিতা ‘হাউল’ কবিতাটি প্রকাশের পরেই অ্যালেন নানাবিধ বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন৷ তিনি সামরিকতন্ত্র, অর্থনৈতিক বস্তুবাদ এবং যৌননিপীড়নের জোরালো ভাষায় বিরোধিতা করেন৷ এই দীর্ঘকবিতাটিতে কবি ক্ষমতা ও ধনতন্ত্রের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিবাদ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাদের ধবংসাত্মক শক্তির বিরুদ্ধে একরাশ ঘৃণা ছুঁড়ে দেন৷ অশ্লীলতার অভিযোগে মার্কিন শুল্কদপ্তর ও স্থানীয় পুলিশ তা বাজেয়াপ্ত করে৷ যদিও শেষপর্যন্ত আমেরিকান বিচারব্যবস্থা অ্যালেন গিন্সবার্গকে অশ্লীলতার অভিযোগ থেকে মুক্তি দেয়৷ এই কবিতাটি অ্যালেন লিখেছিলেন তাঁর বিট প্রজন্মের বন্ধুদের বরণ করে নিয়ে৷

    I saw the best minds of my generation destroyed by madness, starving hysterical naked,

    dragging themselves through the negro streets at dawn looking for an angry fix,

    angelheaded hipsters burning for the ancient heavenly connection to the starry dynamo in the machinery of night,

    who poverty and tatters and hollow-eyed and high sat up smoking in the supernatural darkness of cold-water flats floating across the tops of cities contemplating jazz,

    who bared their brains to Heaven under the El and saw Mohammedan angels staggering on tenement roofs illuminated,

    who passed through universities with radiant cool eyes hallucinating Arkansas and Blake-light tragedy among the scholars of war… (Howl)

    প্রকাশমাত্রই ‘হাউল’ মারাত্মক রকমের জনপ্রিয়তা পেয়েছিল৷ ব্রুকলিনের গির্জাতে থাকা শীতকালীন সন্ধ্যায় থিরথিরিয়ে ওঠা গাছপালা, সূর্য, চাঁদ—, ফুগাৎসির নির্জন দোকানে গড়িয়ে যাওয়া বিস্বাদ বিয়রের দুপুর, ফুটপাতে ছুঁড়ে ফেলা ইহুদি উপাসনা মন্দিরের মাংস, নিউইয়র্কের অন্ধকার-আচ্ছন্ন চূড়ান্ত নাগরিক ঘরের ভেতরে নেশা ভেঙে (ফেটে) যাবার পর পুবদেশের ঘাম—, আফ্রিকার হাড়-ব্যথা—, চিনের মস্তিষ্ক-প্রদাহ বরদাস্ত করে চলা, গানবাজনা অথবা সঙ্গম অথবা মাংসের ঝোল-তরকারির ধান্দায় হাউসটন শহরে ক্ষুধার্ত ও আক্ষরিক অর্থে একা একা ঘুরে মরা, জার্মান সঙ্গীতের গ্রামোফোন রেকর্ড ভেঙে চুরমার, আকণ্ঠ হুইস্কির পর রক্তাক্ত পায়খানায় কাতর আর্তি, ব্যর্থ গির্জাঘরে হাঁটু পেতে পরস্পরের মুক্তি— আলো আর হৃদয়ের জন্য প্রার্থনা, পঁচিশ হাজার উন্মাদ কমরেডের একসঙ্গে ইনটারন্যাশনালের শেষ স্তবক গেয়ে ওঠা,

    …where we hug and kiss the United States under our bedsheets the United

    States that coughs all night and won’t let us sleep… (Howl)

    স্বপ্নের ভেতর দিয়ে ঘুমের গভীর দিয়ে হেঁটে যাও তুমি, তোমার শরীর দিয়ে সমুদ্রযাত্রার জল ঝরে পড়ে— কার্ল সলোমন, তোমার সঙ্গে রকল্যান্ডে আছেন ‘হাউল’-এর সেই কবি৷ অ্যালেন৷ যেখানে একই ভয়াবহ টাইপ রাইটারে তোমরা দু-জনেই মহান লেখক৷ সময়ের অতিজান্তব ঝোল-ঝালের সামগ্রিকতায় প্রকট ও ভয়ঙ্কর রকমের দৃশ্যমান৷ আবার কখনো বিশাল নোংরা সিনেমায় অদৃশ্য হয়ে যাওয়া স্বপ্নের মতো ধীরে ধীরে জেগে ওঠা অতৃপ্ত রোমান্স, অবদমন৷ যাবতীয় ভণ্ডামির বিরুদ্ধে প্রবল ঘৃণা৷ ১ বোতল বিয়ার ১ জন প্রেমিকা ১ প্যাকেট সিগারেট এবং ১ টা আস্ত মোমবাতি সুদ্দু আবিষ্ট সঙ্গমে খাট থেকে মেঝে— মেঝেতে গড়াতে গড়াতে হলঘর— দেয়াল ছুঁয়ে মূর্চ্ছা…

    চরমতম থেকে স্তরে স্তরে চেতনার শেষতম বিন্দুতে ফিরে যাওয়া৷ নিংড়ে নিংড়ে নেওয়া৷ এই শিশ্ণশোষক ছিন্নমস্তার কাছে কবি নিজে শরীর-বর্জিত এক চেতনামাত্র৷ আর এই ছিন্নমস্তা কবির কাছে, অ্যালেনের উপলব্ধিতে—

         চিন্তা-চেতনা, দারিদ্র্য: প্রতিভার অপচ্ছায়া৷

         অদৃষ্ট: অযৌন হাইড্রোজেনের মেঘ৷

    জন্মমুহূর্ত থেকেই তো মানুষ ধীরে ধীরে সমস্ত হারায়, একটু একটু করে তার অভিযাত্রা মৃত্যুর দিকে৷ প্রতি মুহূর্তের এই দ্বন্দ্ব-ই তো জীবন৷ জীবন আর মৃত্যু পরস্পর পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে আছে৷ আর মুহূর্তের এই খণ্ড খণ্ড অভিঘাত জীবনকে ক্রমাগত প্রাপ্তমনস্ক করেছে৷

    সিমেন্ট আর অ্যালুমিনিয়মের কোন স্ফিংস তাদের খুলি চূর্ণ করে মগজ আর কল্পনা গ্রাস করে নিল?…

    বিল মর্গান কর্তৃক সংকলিত ও সম্পাদিত ‘দ্য বেস্ট মাইন্ডস অফ মাই জেনারেশন’

    তাঁর যুগান্তকারী কবিতা হাউল এবং জ্যাক কেরুয়াকের প্রভাবশালী বই অন দ্য রোড প্রকাশের কুড়ি বছর পরে ১৯৭৭ সালে অ্যালেন গিন্সবার্গ সিদ্ধান্ত নেন যে ‘বিট জেনারেশন’-এর সাহিত্যিক ইতিহাসের ওপর একটি কোর্স পড়ানোর সময় এসেছে৷ এই কোর্সটি তিনি মোট পাঁচবার পড়িয়েছিলেন৷ প্রথমে নারোপা ইনস্টিটিউটে এবং পরে ব্রুকলিন কলেজে৷ এর মাধ্যমে গিন্সবার্গ ‘বিট সাহিত্য’-এর ইতিহাসকে তাঁর নিজস্ব ও অনন্য ভঙ্গিতে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছিলেন৷ বিশিষ্ট বিট-গবেষক বিল মর্গান কর্তৃক সংকলিত ও সম্পাদিত ‘দ্য বেস্ট মাইন্ডস অফ মাই জেনারেশন’ বইটিতে সেই বক্তৃতাগুলি প্রয়োজনীয় টীকা-সহ পরিমার্জিত আকারে উপস্থাপিত করা হয়েছে৷ একইসাথে, এই সংকলনটিতে গিন্সবার্গের দেখা ‘বিট’ কবি-লেখকদের, যাঁরা ছিলেন তাঁর বন্ধু, আস্থাভাজন, সাহিত্যিক পরামর্শদাতা ও সহ-বিপ্লবী, প্রত্যেকের এক অনন্য জীবন্ত চিত্র ফুটে উঠেছে৷ এই সংকলনে অ্যালেন গিন্সবার্গ শিল্প-সাহিত্য ও জীবনের বৈপরীত্য বিষয়টি ভারি স্বতঃস্ফূর্ত ব্যাখ্যায় আলোচনা করেছেন৷ তিনি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এভাবে যে, উইলিয়াম বাটলার ইয়েটসের ‘প্রেয়ার ফর মাই ডটার’ কবিতার এক জায়গায় ইয়েটস লিখছেন, ‘Out of the murderous innocence of the sea’… গিন্সবার্গের মতে এখানে ‘মার্ডারাস’ ও ‘ইনোসেন্স’ এই আপাত বিরোধী শব্দদুটোর প্রয়োগ কিভাবে যেন আমাদের জীবনের সহজ ও প্রকৃত উচ্চারণ হয়ে উঠলো৷ আপাতবিরোধী দুটি শব্দ নতুন মানে নতুন অর্থ নতুন অনুভবের জন্ম দিল৷ এবং তা কবিতার মুহূর্ত তৈরি করল এবং আমাদের মস্তিষ্কে সামান্য টোকা দিল৷ উইলিয়াম ব্লেকের কবিতায় এইরকম বৈপরীত্য ছত্রে-ছত্রে আছে৷

    অতএব সমস্ত বৈপরীত্যকে শিল্প বা কবিতা ভেবে নেওয়াটাই কি সহজ পথ! বৈপরীত্যের যাবতীয় সংকলন কি কবি তাঁর অন্যতম পদ্ধতি হিসেবেই মনের বিভিন্ন স্তরে বুঝে ও না বুঝে ওঠা নান্দনিকতা এবং ঠিক তার উল্টোদিকে আমাদের শূণ্যস্থান পূরণের পথে এগিয়ে নিয়ে যান! মহাকাব্য থেকে গীতিকবিতা বা লিরিক এবং  লিরিক থেকে দীর্ঘকবিতা বা মহাকবিতা এই বৈপরীত্য ও জীবনের স্বাভাবিক অনুভূতির একান্ত সংকলন৷ ‘সর্গ’ ভাগ করে মহাকাব্য রচনা ছিল আমাদের উপন্যাসের পূর্বরূপ৷ কিন্তু ‘সর্গ’ ভাগ করে মহাকবিতা রচনা আবারো দীর্ঘকবিতাকে মহাকাব্যিক মর্যাদা দিয়েছে নতুন করে৷ আমরা জানি ‘হাউল’ এই দীর্ঘকবিতার মধ্যে দিয়ে  অ্যালেন গিন্সবার্গ তাঁর সমসময়, অতীত, পুরাণ, ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি সমস্ত কিছুকে তালগোল পাকিয়ে প্রকাশ করেছিলেন৷ ‘হাউল’ হয়ে উঠেছে পৃথিবীর সর্বকালীন শ্রেষ্ঠ দীর্ঘকবিতাগুলির অন্যতম একটি৷ এখানেই অ্যালেন গিন্সবার্গের ভিন্নতা এবং নিজস্বতা৷ ‘হাউল’ কবিতাটির জন্মবৃত্তান্ত সুন্দরভাবে ধরা আছে গিন্সবার্গ-এর ‘দ্য বেস্ট মাইন্ডস অফ মাই জেনারেশন’ বইটির ‘গিন্সবার্গ অ্যান্ড হাউল’ গদ্যটিতে৷

    একজন এক্সিকিউটিভ হিসেবে মার্কেট-রিসার্চে পাঁচ বছর কাজ করার পর বেকার ভাতা-র ওপর নির্ভর করে দিন কাটাচ্ছিলাম তখন প্রায় তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে, এমন সময় একদিন টাইপরাইটারের সামনে বসে ভাবলাম চিরাচরিত কোনো কবিতা না লিখে বরং যা মনে আসে তাই লিখব৷ গদ্যের মতো কিছুটা মুক্ত কোনো কিছু৷ ‘হাউল’-এর শুরুর লাইনগুলো উইলিয়ামসের সেই ‘ট্রায়্যাডিক ভার্স’ বা তিন-স্তরের ছন্দশৈলী মেনেই লেখা, তবে কিছুটা দীর্ঘায়িত রূপে৷ ওখান থেকেই সবকিছুর শুরু, ‘হাউল’-এর প্রথম লাইনটি থেকে৷ ‘আই স দ্য বেস্ট মাইন্ডস অফ মাই জেনারেশন’ (আমার প্রজন্মের সেরা মেধাবীদের আমি দেখেছি), কিন্তু এটা কেমন যেন একটু বেশি দীর্ঘ মনে হলো তাই ভাবলাম ‘জেনারেশনস ডেস্ট্রয়েড বাই ম্যাডনেস’ (উন্মাদনায় ধবংস হওয়া প্রজন্ম) কিংবা ‘জেনারেশন ম্যাডনেস’ (প্রজন্ম-উন্মাদনা)-এর কথা৷ এই দুটি বিষয় মাঝখানে ভারসাম্য বজায় রাখবে, একদিকে থাকবে ‘প্রজন্ম’ আর অন্যদিকে ‘উন্মাদনা’, ঠিক যেমন খচ্চরের পিঠে চাপানো বোঝা বা প্যাক-স্যাডল থাকে৷ ‘প্রজন্ম’ হলো একদিকের বোঝা আর ‘উন্মাদনা’ হলো অন্যদিকের৷ টাইপ করা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি কোনো সংশোধন করিনি৷ পরে অবশ্য কিছু অংশ কেটে বাদ দিতে গিয়ে বা অদলবদল করতে গিয়ে বেশ জগাখিচুড়ি পাকিয়ে ফেলেছিলাম৷ (দ্য বেস্ট মাইন্ডস অফ মাই জেনারেশন)

    ‘বিট’ লেখকদের সম্পর্কে জনমানসে একটা স্পষ্ট ধারণা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গিন্সবার্গই ছিলেন অন্যতম প্রধান কারিগর৷ ‘বিট’ আন্দোলনের প্রধান ব্যক্তিত্বদের প্রায় সবার সাথেই তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল, সকলেই ছিলেন তাঁর বন্ধুস্থানীয়৷ আর এজন্যই তিনি ‘বিট’ আন্দোলনের ইতিহাসকার হিসেবে অনন্যভাবে যোগ্য হয়ে উঠেছিলেন৷ ‘দ্য বেস্ট মাইন্ডস অফ মাই জেনারেশন’ বইটিতে গিন্সবার্গ কেরুয়াক, বারোজ এবং অন্যান্য লেখকের সাথে তাঁর প্রথম সাক্ষাতের নানা স্মৃতিচারণ যেমন করেছেন, তার পাশাপাশি নিজের কাব্যতত্ত্বও ব্যাখ্যা করেছেন৷ ‘বিট’ সাহিত্যে সঙ্গীতের গুরুত্ব ও দৃশ্যশিল্পের প্রভাব নিয়েও অসামান্য আলোচনা করেছেন৷ ‘কাট-আপ মেথড’-এর বিশ্লেষণ করেছেন৷ এছাড়াও এমন এক প্রজন্ম ও সাহিত্যগোষ্ঠীর চিত্র এঁকেছেন যাঁরা একটি সাহিত্যিক বিপ্লবের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন৷ ‘বিট’-সাহিত্যের অনুরাগী কিংবা যাঁরা নতুন করে এই সাহিত্যধারার সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন তাঁদের উভয় শ্রেণীর পাঠকের জন্যই ‘দ্য বেস্ট মাইন্ডস অফ মাই জেনারেশন’ বিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক আন্দোলনের ওপর ব্যক্তিগত ও বিশ্লেষণধর্মী এক অনিবার্য সংকলন৷

    হিপিদের পূর্ববর্তীরা ছিলেন বিটনিক বা বিট জেনারেশন৷ ভিয়েতনামের উপর আমেরিকার আক্রমণের  বিরুদ্ধেই সংগঠিত হয়েছিল হিপি আন্দোলন৷ পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে প্রাচ্যের দেশগুলিতেও এই হিপি মুভমেণ্ট একটি সাব-কালচারে পরিণতি পায়৷ বিটনিক বা বিট জেনারেশনের কবিদের অন্যতম ছিলেন জ্যাক কেরুয়াক৷ ভণ্ড মূল্যবোধ, সংস্কার-আচ্ছন্ন সামন্ততান্ত্রিকতা, নকল ও বানানো মিথ্যে জীবনদর্শন— ইত্যাদিদের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণই ছিল বিটদের প্রধান উদ্দেশ্য৷ এই বিটনিকদের বেশির ভাগই ছিলেন কবি, শিল্পী, গায়ক৷ সমস্ত ধরনের প্রতিষ্ঠান বিরোধিতাই ছিল বিট জেনারেশনের একমাত্র লক্ষ্য৷ অনেক সময়ই এদের রচনা, শিল্পের প্রকাশভঙ্গী, এমনকী জীবনযাপন আমাদের প্রথাগত তথাকথিত ‘মার্জিত’ রুচিবোধকে আঘাত করেছে৷ আর প্রতিবাদস্বরূপ এই আঘাতটুকুই ছিল বিটনিকদের একান্ত কাঙ্ক্ষিত৷ পাঁচের দশকের শেষে ও ছয়ের দশকের আমেরিকায় প্রতিষ্ঠানবিরোধী বিকল্প সংসৃকতির দাবিতে যে বিট ও হিপি আন্দোলন দানা বেঁধেছিল, সেই আন্দোলনের অন্যতম কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ পোস্টমডার্ন সাহিত্য গোষ্ঠী ‘পলিটিক্স, পোয়েট্রি অ্যাণ্ড ইন্সপিরেশন’-এর সদস্যদের কাছে ২৩.০৪.১৯৯২-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজেদের শিল্পভাবনা ও আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করছেন এইভাবে—

    কেন্দ্রীয় থিম ছিল চেতনার রূপান্তরণ৷ আর যেমন সময় এগোলো, কেরুয়াক, বারোজ আর আমার যে অভিজ্ঞতা জমা হল, এই প্রসঙ্গটিরই তো সম্পর্কায়ন— অন্তত ‘চেতনার ক্ষেত্র বিস্তার’৷ যেমন ধর, এই জাতিটিই চরম বাস্তব এবং শেষ এবং চূড়ান্ত, আবার একই সঙ্গে চরম অবাস্তব এবং সাময়িক এবং স্বপ্নের মালমশলায় গড়া, নির্বিরোধভাবে৷ আমার মনে হয় ১৯৫৮ নাগাদই কেরুয়াক-এর এ ব্যাপারে অন্তর্দৃষ্টিনির্ভর দখল এসে গিয়েছিল৷ সুতরাং একটি আত্মিক অন্তর্দৃষ্টি— যা শাশ্বত ভাবে সর্বজনীন— কোনও আদল বা আদরায় মনন অথবা চেতনার অনুসন্ধানের পথ দেখাল৷ তা বারোজ কর্তৃক অপরাধ জগতের অনুসন্ধান হোক, কেরুয়াক কর্তৃক বৌদ্ধধর্মের অনুসন্ধান হোক, গ্যারি স্নাইডারের জেন সাধনা হোক, কিংবা তিব্বতী বৌদ্ধধর্মের তদারকিতে নারোপা ইন্সটিটিউটে আমার কাজ হোক৷ আত্মিক মুক্তিই হল মূল এবং আত্মিক মুক্তি থেকেই আসে সরলতা বা অবারিত হৃদয়৷ ম্যাকক্লুরের প্রধান থিম হল জীববিজ্ঞান৷ এবং চেতনার পুনর্দখল বিষয়ে ওর অন্তর্দৃষ্টি ছিল৷ পরিবেশ-নিসর্গের থিম৷ এটা তোমাদের সনাতন কবিতার ব্যাপার নয়৷ এটা আধুনিক আমেরিকান লোকগীতি৷ এবং তা প্রভাবিত করেছিল সবাইকে৷

    জ্যাক কেরুয়াকের মৃত্যুর পর স্মৃতিচারণায় কিউবিক সিটি ফেস্টিভ্যালে যে কথাগুলি লেখা হয়েছিল তা থেকে সহজেই অনুমান করা যায় ঝাঁ-চকচকে মেট্রোপলিসের জীবনযাপনের বিপ্রতীপে কতোটা মাটির কাছাকাছি ছিলেন এইসব কবিশিল্পীরা৷

    সমাজের মূল স্রোতে একটা ছোটো বাঁকা রাস্তার মতো ছিল বিটদের অবস্থান৷ চলে গেলেন বিটদের রাজা৷ বর্মহীন, নগ্ন৷

    এই কথা, এই নিস্তরঙ্গ মৃত্যুবরণ বিটপ্রজন্মের অন্যান্য কবিশিল্পীদের ক্ষেত্রেও সমান ভাবে প্রযোজ্য৷

    বিট প্রজন্মের শুরুর দিনগুলির কথা জানা যায় কেরুয়াকের সঙ্গে একটা সম্পূর্ণ অ্যাপার্টমেণ্ট শেয়ার করে দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকা এডিথ পার্কারের ভাষ্য থেকে— ‘‘সবচেয়ে বড়ো কথা, 118 th Street-এ আমাদের অ্যাপার্টমেণ্টের সেই অলীক দিনগুলি, ভবিষ্যত-বিখ্যাতরা যেখানে আছেন দরজার ওপারে৷ উদাহরণ: ১৭ বছরের অ্যালেন গিন্সবার্গ আর উইলিয়ম বারোজ’’ (দ্য গ্লোব অ্যান্ড মেইল, ১৯৮৯, টরণ্টো)৷ এক কথায় এটুকু বুঝে নিতে কোনও অসুবিধে হয় না যে বিটনিকদের জনক জ্যাক কেরুয়াকের সঙ্গে অ্যালেনের কতো অল্প বয়স থেকে যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতা৷ পরবর্তীতে বব ডিলান, জেরি গার্সিয়ার সঙ্গে অ্যালেনের বন্ধুত্ব হয়৷ ডিলানের যাবতীয় নতুন ধরনের লিরিক, কবিতা বা গানগুলি গিন্সবার্গ ও মাইকেল ম্যাকক্লুর সমর্থন করেছিলেন নির্দ্বিধায়৷ সমালোচকের দল যাকে ইক্সেন্ট্রিক বা উদ্ভট লিরিক, কখনও তীক্ষ্ন চিত্রকল্পের কবিতা আবার কখনও নমনীয় ছন্দের সেরা আমেরিকান কবিতা বলে অভিহিত করেছে৷

    শিশুদের বইয়ের তাক, ডুশব্যাগ, অ্যাসপিরিন, গাঁজার পাত্র, রক্ত থেকে নিজেকে রক্ষা করছে নাওমি…

    Strange now to think of you, gone without corsets & eyes, while I walk on the sunny pavement of Greenwich Village.

    downtown Manhattan, clear winter noon, and I’ve been up all night, talking, talking, reading the Kaddish aloud, listening to Ray Charles blues shout blind on the phonograph

    the rhythm the rhythm—and your memory in my head three years after—And read Adonais’ last triumphant stanzas aloud—wept, realizing how we suffer— And how Death is that remedy all singers dream of, sing, remember, prophesy as in the Hebrew Anthem, or the Buddhist Book of Answers—and my own imagination of a withered leaf—at dawn—

    Dreaming back thru life, Your time—and mine accelerating toward Apocalypse,

    the final moment—the flower burning in the Day—and what comes after,  

    looking back on the mind itself that saw an American city… (Kaddish)

    মা নাওমি গিন্সবার্গকে উৎসর্গ করে লেখা অ্যালেন গিন্সবার্গের ‘ক্যাডিশ’ কবিতাটি শুরু হচ্ছে উপরের পংক্তিগুলি দিয়ে৷ গিন্সবার্গের লেখা এই কবিতাটি ব্যক্তিগত অনুভব থেকে লেখা হলেও কবিতাটিতে উঠে এসেছে তাঁর মায়ের শৈশব, শরণার্থী জীবনের  অভিজ্ঞতা, যুক্তরাষ্ট্রে নতুন জীবনের চেষ্টা, মানসিক রোগ ও তার পরিণতিতে মানসিক অশান্তি, এমনকি হাসপাতালে কাটানো মা নাওমি-র জীবনের শেষ দিনগুলো৷ তার পাশাপাশি এই দীর্ঘকবিতাটিতে জড়িয়ে গেছে গিন্সবার্গের নিজের জীবনের ব্যথা, যন্ত্রণা, অপরাধবোধ ও অস্তিত্বের সংকট৷ কবিতাটি নিছক একটি শোক-নিবেদন নয় কবির আত্ম-ব্যবচ্ছেদও৷

    অ্যালেনের মা নাওমি ছিলেন একজন রাশিয়ান৷ এই ইহুদি নারী কম্যুনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন৷ রাশিয়া থেকে নাওমি ১৯০৫ সালে আমেরিকায় চলে আসেন৷ এখানেই অ্যালেনের বাবা কবি ও শিক্ষক ল্যুই গিন্সবার্গের সঙ্গে নাওমির আলাপ৷ পরবর্তীতে বিবাহ৷ ল্যুই ও নাওমি দুজনেই ছিলেন স্কুলশিক্ষক৷ এই ইহুদী পরিবারে ১৯২৬ সালের ৩ জুন গিন্সবার্গের জন্ম৷ অ্যালেনের বড়ো ভাই ইউজিন৷ মা নাওমির মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা, ডিপ্রেসন, ল্যুই-এর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ এই সমস্তকিছুই অ্যালেনের শৈশব-কৈশোরকে প্রভাবিত করে৷

    মাকে নিয়ে লেখা তাঁর বিশ্ববিখ্যাত কবিতা ‘ক্যাডিশ’ কবিতার দুনিয়ার মানচিত্রে একটি অন্যতম নতুন মাইলস্টোন হিসেবে চিহ্ণিত৷ পাঠকের সঙ্গে গিন্সবার্গ যে সংযোগ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন তা তাঁর ‘ক্যাডিশ’ এই দীর্ঘকবিতায় প্রকাশিত৷ এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন এই কবিতাটি অ্যালেন বিশেষ একটা মানসিক দশায় সম্পূর্ণ নেশাক্রান্ত অবস্থায় এক সিটিংয়ে বসে লিখেছিলেন৷ তিনি ছিলেন আত্মানুসন্ধানী কবিতাপাগল শ্রেণীহীন নতুন পৃথিবীর স্বপ্ণ দেখা একজন সত্যিকারের অতিবিরল মানুষ৷ শৈশব-বাল্যের ভয়াবহতা, চিরতরে ভুলে যেতে চাওয়া দিনগুলিকে ইলিউশনের মধ্যে দিয়ে অনুভব করতে চাওয়া, হারিয়ে যাওয়া সমস্ত অভিশপ্ত স্মৃতির পাশাপাশি নিজের জন্মমুহূর্তকে অনুভব করবার জন্য বিশেষ একটা মানসিক দশায় সম্পূর্ণ নেশাক্রান্ত অবস্থায় এক অন্যতর মানসিক স্তরে নিজেকে পৌঁছে নিয়ে যাওয়ার এই জাতীয় কোনও ঘটনার আদৌ কোনও উদাহরণ আছে কি কবিতার পৃথিবীতে? জীবনের সমস্ত ক্রূরতা, নিষ্ঠুরতা এভাবেই আক্রান্ত করে ‘ক্যাডিশ’-এর কবি ও পাঠককে৷

    Her big leg crouched to her breast, hand outstretched Keep Away, wool dress on her thighs, fur coat dragged under the bed—she barricaded herself under bedspring with suitcases.

           Louis in pajamas listening to phone, frightened—do now?—Who could know?—my fault, delivering her to solitude?—sitting in the dark room on the sofa, trembling, to figure out—

          He took the morning train to Lakewood, Naomi still under bed—thought he brought poison Cops—Naomi screaming—Louis what happened to your heart then? Have you been killed by Naomi’s ecstasy?

           Dragged her out, around the corner, a cab, forced her in with valise, but the driver left them off at drugstore. Bus stop, two hours’ wait.

           I lay in bed nervous in the 4-room apartment, the big bed in living room, next to Louis’ desk—shaking—he came home that nite, late, told me what happened.

           Naomi at the prescription counter defending herself from the enemy—racks of children’s books, douche bags, aspirins, pots, blood—‘Don’t come near me—murderers! Keep away! Promise not to kill me!’… (Kaddish)

    এক বিবর্ণ দিনলিপির টুকরো টুকরো করুণ ছবি, দৃশ্যের ভয়াবহতা, অস্থিরতা, প্রবল মানসিক টানাপোড়েন, অসহায় শৈশব, চার ঘরের অ্যাপার্টমেন্ট, বড় পা-টা বুকের কাছে গুটিয়ে রাখা, Keep Away… দূরে থাকো…, উরুর উপর উলের পোশাক, পশমের কোট, ভীত-সন্ত্রস্ত পাজামা পরা লুই, ভয়, ফোন, নির্জনতা, অন্ধকার ঘর, সোফা, সকালের ট্রেন, লেকউড, খাটের নিচে নাওমি, বিষ, পুলিশ, নাওমির চিৎকার, ল্যুই, ট্যাক্সি, সুটকেস, ড্রাইভার, ওষুধের দোকান,বাস স্টপ, দু’ঘণ্টার অপেক্ষা, প্রেসক্রিপশন কাউন্টার, শত্রুর দল, শিশুদের বইয়ের তাক, ডুশ ব্যাগ, অ্যাসপিরিন, গাঁজার পাত্র, রক্ত… নাওমি..‘Don’t come near me—murderers! Keep away! Promise not to kill me!’… ‘আমার কাছে এসো না—খুনিরা! দূরে থাকো! কথা দাও আমাকে মারবে না!’ ‘ক্যাডিশ’ পাঠের সময়ে এক অসম্ভব অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে বাধ্য হয় পাঠক৷ এক করুণ আর্তনাদ, নিরুপায় চিৎকার, মনস্তত্ত্বের জটিল অন্ধকার, মৃত্যুর শীতল স্পর্শ আর হাহাকার জড়িয়ে আছে কবিতাটির সমস্ত শরীরে৷ কবির পাশাপাশি পাঠকেরও মুক্তি নেই সেই নির্মমতা, সেই অভিশপ্ত বাস্তবতা থেকে৷ আর এখানেই ‘ক্যাডিশ’ কবিতাটি পাঠকের মাথার ভিতরে এক ‘বোধ’ হয়ে জন্ম নেয়৷ ‘আমাদের ক্লান্ত ক্লান্ত করে…’! ‘ক্যাডিশ’ কবিতাটির চতুর্থ পরিচ্ছেদে মায়ের প্রতি অ্যালেনের হৃদয়ের আর্তি ছাপিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতির মুখোমুখি একজন ব্যক্তিবিশেষের অসহায়তার যন্ত্রণাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে৷ রাজনৈতিক-আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কীভাবে অস্থির হয়ে ওঠে একজন ব্যক্তিবিশেষ, কীভাবে অস্থির হয়ে যায় তার মন—

    …O mother

    farewell

    with a long black shoe

    farewell

    with Communist Party and a broken stocking

    farewell

    with six dark hairs on the wen of your breast

    farewell

    with your old dress and a long black beard around the vagina

    farewell

    with your sagging belly

    with your fear of Hitler

    with your mouth of bad short stories

    with your fingers of rotten mandolins

    with your arms of fat Paterson porches

    with your belly of strikes and smokestacks

    with your chin of Trotsky and the Spanish War

    with your voice singing for the decaying overbroken workers

    with your nose of bad lay with your nose of the smell of the pickles of Newark

    with your eyes

    with your eyes of Russia

    with your eyes of no money

    with your eyes of false China… (Kaddish)

    কবির সঙ্গে সঙ্গে কান্নায় ভারি হয়ে আসে পাঠকের মন৷ রাজনীতি ও একজন একক ব্যক্তির সংকট, মৃত্যু সমস্তকিছুই সময়ের কষাঘাতে এক প্যারনয়েড পৃথিবীর কথাই যেন উচ্চারণ করে শেষপর্যন্ত৷ বাস্তবতা এতোটাই ক্রূর, নির্মম, অনিবার্য৷

    যেখানে পঁচিশ হাজার উন্মত্ত কমরেড সমবেত হয়ে ইনটারন্যাশনালের শেষ স্তবকগুলো গাইছে…

    কবিতা লেখার আঙ্গিক ও কবিতাপাঠের ধরন আমূল পালটে দিয়েছিলেন এই বিট কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ৷ মূলত গদ্যে, কথা বলার ভঙ্গিতে তাঁর বেশির ভাগ কবিতা লেখা৷ আমেরিকান কবিতায় গিন্সবার্গ এক নতুন ভাষারীতির প্রবর্তন করেছিলেন সহযোগী সতীর্থ বারোজ, কেরুয়াক, লরেন্স ফেরলিংঘেট্টি, পিটার অরলোভস্কি, গ্যারি স্নাইডার, হার্বার্ট হাংকে, কার্ল সলোমন, মাইকেল ম্যাকক্লুর, গ্রেগরি কোরসে প্রমুখের যৌথ প্রচেষ্টায়৷ গত শতাব্দীর সাতের দশক থেকে কবিতাপাঠের অনুষ্ঠানে ও রেকর্ডিংয়ে যন্ত্রানুষঙ্গের প্রয়োগ হয়ে ওঠে অনিবার্য৷ জানা যায়, বেনারসে থাকাকালীন গিন্সবার্গ জনৈক ভজন গায়কের কাছে হারমোনিয়ম বাজাতে শিখেছিলেন৷ ফলস্বরূপ তাঁর রেকর্ড করা বহু কবিতায় ভজনের সুর শোনা যায়৷ কলকাতায় ‘আমজাদিয়া হোটেলে’ কাটানো তাঁর সেই অলৌকিক সাতমাস, বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়৷ সে সময় বাউল অশোক ফকির ছিলেন তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী৷ এছাড়াও সঙ্গী ছিলেন কৃত্তিবাস কবিগোষ্ঠী ও হাংরি কবিকুলও৷ তাঁরাই কলকাতা শহরের সঙ্গে গিন্সবার্গের পরিচয় করান৷ সেইসব দিনগুলির কথা উঠে আসে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখায়৷

    মে মাসের পাঁচ তারিখ থেকে তিনদিন ধরে যে কবিতা পাঠের আসর, তাতে শ্মশানঘাটে, কখনও মাহেশে রথের মেলায়, কখনও ডায়মন্ডহারবারে, কখনও আমার বা উৎপলকুমার বসু বা তারাপদ রায়ের বাড়িতে, আড্ডা তুমুল আড্ডা৷ তারপর জামশেদপুর, চাইবাসা, কাশীতে ভ্রমণ৷ শক্তি অ্যালেনদের সঙ্গে চলে গিয়েছিল তারাপীঠ, সেখানে তান্ত্রিকদের সঙ্গে কাটিয়ে এসেছে কয়েকটা দিন৷ অ্যালেনের ঝোঁক তখন অতীন্দ্রিয় সাধনার দিকে, ভারতে সে প্রধানত এসেছিল গুরু খুঁজতে৷ আমাদের ধর্মের দিকে বা যোগসাধনার দিকে কোনও ঝোঁক ছিল না৷ আমরা তখন নিমজ্জিত হয়ে আছি কবিতায়, শুধু কবিতায়৷ অ্যালেন গিন্সবার্গের মতন একজন জোরালো কবির সান্নিধ্যে আমরা অনুপ্রাণিত বোধ করতাম৷ মানুষ হিসেবেও সে চমৎকার, নরম, ভদ্র, অন্যের কথা মন দিয়ে শোনে, নিজের মতামত জোর করে খাটাবার চেষ্টা করে না৷ তার কবিতা বর্ণনামূলক হলেও শব্দ ব্যবহারের জাদু আছে, এই পৃথিবীর প্রতি তার নিজম্ব কিছু কথা বলার আছে, এই কবিতা আমাদের নতুন স্বাদ দেয়৷… সেই অ্যালেন গিন্সবার্গের সঙ্গে কতকাল পরে আবার দেখা৷… এতগুলি বছরে, পোশাকে ছাড়া তার শরীরের বিশেষ পরিবর্তন হয়নি৷ তার বয়েস ষাট, কিন্তু বার্ধক্যের চাপ পড়েনি, মাথার চুল ঈষৎ পাতলা, দাড়িতে পাক ধরেছে৷ সে পরে আছে কোট ও টাই, তেমন কিছু ফ্যাশানদুরস্ত বা দামি নয়, তবে ভদ্রস্থ৷ এর আগে আমি কিছু পত্র-পত্রিকায় পড়েছি যে এককালের সেই বিদ্রোহী কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ এখন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আঁতাত করেছে, সে এখন ঠান্ডা হয়ে গেছে, সে এখন অনেক টাকা রোজগার করে৷ এমনকী এখন তার প্রাইভেট সেক্রেটারি আছে৷ অবশ্য কবি হিসেবে তার খ্যাতিও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে, এখন আমেরিকার সে প্রধান কবি বললে অত্যুক্তি হয় না৷ (অ্যালেনের সঙ্গে, আবার বছর কুড়ি পরে/পায়ের তলায় সর্ষে)

    হাউল অ্যান্ড আদার পোয়েমস্-এর স্রষ্টা অ্যালেন গিন্সবার্গের প্রভাবে ও বিট জেনারেশনের সূত্র ধরে নতুন ধারার বাংলা কাব্য আন্দোলন শুরু হয় সমীর ও মলয় রায়চৌধুরী, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু প্রমুখের যৌথ উদ্দীপনায়৷ যদিও পরবর্তীতে সংঘবদ্ধ এই কবি-লেখকদের অনেকেই পুলিশি হামলার কারণে সরে আসেন এই আন্দোলন থেকে৷ ৭১ বছর বয়সে নিউইয়র্কে ৫.৪.১৯৯৭-এ অ্যালেনের মৃত্যুর পর সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ‘আমাদের বন্ধু অ্যালেন’ গদ্যে লিখছেন,

    অ্যালেনের সাথে আমাদের বন্ধুত্বের (লেট-ফিফটিজ) একটাই ফল হল— গদ্য কৃত্তিবাস (যার একটি সংখ্যাই প্রকাশিত হয়েছিল—প্রচ্ছদে ব্যবহৃত হয়েছিল অ্যালেনের শাটারে তোলা স্ন্যাপ) এবং নতুন ধারার কাব্য আন্দোলন— হাংরি জেনারেশন (আজকাল, ১৩.৪.১৯৯৭, কলকাতা)৷

    এই অ্যালেনই ২৮.৯.১৯৬৪ তারিখে অশ্লীলতার আসামী, ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতার স্রষ্টা মলয় রায়চৌধুরীকে চিঠিতে লিখেছেন, ‘‘গদ্য ও রাজনীতি বিষয়ে ম্যানিফেস্টোগুলো চমৎকার ও মজাদার৷ আমার মনে হয় সাহিত্যপুষ্ট তাদের শিরোনাম৷ কিন্তু মস্তিষ্কে কিছু খোঁচা তারা মারবেই৷ গুড লাক’’ (হাংরি শ্রুতি ও শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলন, উত্তম দাশ, ১৯৮৬)৷ একজন আমেরিকান কবি ভরসা যোগাচ্ছেন আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়ানো তরুণ বাঙালি কবিকে৷ এমনকি তাঁর ভাই র্যালফ গিন্সবার্গ সম্পাদিত ‘আঁভাগার্দ’ পত্রিকায় মলয় রায়চৌধুরীর একটি সচিত্র বিবৃতি প্রকাশ করেন যা সাহিত্যজগতে হৈচৈ ফেলে দেয়৷ কবিতা কেমন হবে? প্রতিদিনের উচ্চারিত হাঁচি-কাশি-সংলাপের-খিস্তির নাকি ছন্দোময় ব্যঞ্জনার! ‘‘রূপক-এ রূপান্তরিত করার চেয়ে বড় মিথ্যা আর কিছু নেই’’ (সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, আজকাল, ১৩.৪.১৯৯৭)৷

    এরই পাশাপাশি অ্যালেন যেমন বিট সাহিত্যের ইতিহাস লিখে গিয়েছেন তাঁর ‘দ্য বেস্ট মাইন্ডস অফ মাই জেনারেশন’ বইয়ে সেরকমই ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকার ইতিহাস লিখে গেছেন ফণিভূষণ আচার্ষ তাঁর ‘ছেঁড়া ক্যানভাস’ বইয়ে৷ সেই বইয়ের একটি জায়গায় অ্যালেন সম্পর্কে ফণিভূষণ লিখছেন,

    গিন্সবার্গ কলকাতার কবিদের দিয়ে গেল অনেক৷ নেশা দিয়ে গেল, ক্রোধ দিয়ে গেল, এক কথায়, তাদের অশান্ত করে দিয়ে গেল৷ বাংলা কবিতা তার দ্বারা উপকৃত হয়েছে সুপ্রচুর, সন্দেহ নেই৷ বাংলা কবিতায় এলো আধুনিক জীবনবোধ, তির্যক দৃষ্টিকোণ, এলো বিক্ষোভ এবং বিদ্রোহ৷

    বহু আলোচক গিন্সবার্গকে পোস্টমডার্ন কবি হিসেবে উল্লেখ করতে চান৷ কিন্তু গিন্সবার্গ নিজেকে পোস্টমডার্ন অভিধায় অভিহিত করতে অস্বস্তি বোধ করতেন৷ যেহেতু তিনি কোনও প্রাতিষ্ঠানিক অনুশাসন বা বিদ্যায়তনিক চোখরাঙানিকে কখনও মেনে চলেননি তাই সমালোচকদের কারো কারো মতে তিনি পোস্টমডার্ন৷ আর অ্যালেনের মতে, প্রকৃত পোস্টমডার্ন উইলিয়ম বারোজ ও হার্বার্ট হাংকে৷ এই বারোজের লেখা ‘নেকেড লাঞ্চ’ চলচ্চিত্রায়িত হয়৷ এই চলচ্চিত্রে বারোজ, কেরুয়াক, গিন্সবার্গ প্রমুখের চরিত্র উপস্থিত৷ যদিও তাঁদের ভূমিকায় পেশাদার অভিনেতারা অভিনয় করেছেন৷ আর ‘নেকেড লাঞ্চ’ সম্পর্কে অ্যালেনের বক্তব্য:

    চলচ্চিত্রের তুলনায় বারোজের প্লট অনেক ভালো ছিল৷ বারোজ আইন-কানুনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে নিজেই নিজেকে ক্ষমতা অর্পণ করেছিলেন৷ এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ তর্ক যার প্রসঙ্গ বারোজ তুলেছিলেন৷ কিন্তু এই প্রসঙ্গটি চলচ্চিত্রে নেই৷

    আজ অ্যালেন গিন্সবার্গ-এর জন্মশতবর্ষে এসে তাঁর লেখালিখি নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুনভাবে চিন্তাভাবনা করা শুরু হয়েছে৷ আনন্দের কথা, বাংলা ভাষাও সেই আয়োজনে পিছিয়ে নেই৷

    (নোট: এই লেখায় উল্লিখিত ‘পলিটিক্স, পোয়েট্রি অ্যান্ড ফাউন্ডেশনে’র সদস্যদের নেওয়া সাক্ষাৎকারের বঙ্গানুবাদ মলয় রায়চৌধুরীর করা৷ গিন্সবার্গের অন্যান্য কবিতা, উপ-শিরোনামের কবিতাংশ, সাক্ষাৎকার ও উদ্ধৃতির অনুবাদ লেখকের৷)

    Share. Facebook WhatsApp Copy Link
    Previous Articleআমাদের এক বন্ধু
    JoyBangla Editor

    Related Posts

    সাহিত্যে নোবেল পেলেন কানাডার অ্যান কার্সন

    October 9, 2026

    চলে গেলেন অভিনেতা নানা পাটেকার

    October 8, 2026

    চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পেলেন তিন বিজ্ঞানী

    October 6, 2026

    বিএনপির মৌলবাদী রূপ: বাংলাদেশ বিমানে ‘লালসালু’ ও ‘চিত্রা নদীর পারে’ সিনেমার প্রদর্শন বন্ধ

    October 4, 2026
    Leave A Reply Cancel Reply

    সম্পাদকের পছন্দ

    মিথ্যা মামলার ফাঁদে ঠাসা কারাগার : দক্ষিণ এশিয়ায় এক নম্বর বাংলাদেশ!

    October 8, 2026

    ঐতিহাসিক ৮ই অক্টোবরঃ শোষকের বিরুদ্ধে সোহরাওয়ার্দী-বঙ্গবন্ধুর ‘নৌকা’ প্রতীকের আনুষ্ঠানিক অভিযাত্রা!

    October 8, 2026

    দারিদ্র্যসীমার নিচে দেশের সোয়া ৬ কোটি মানুষ!

    October 8, 2026

    বিশ্ব শিক্ষক দিবসে মব ও নিপীড়নের শিকার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অধিকারের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান বাংলাদেশ ছাত্রলীগের

    October 7, 2026
    • Facebook
    • Twitter
    • Instagram
    • TikTok
    মিস করবেন না
    Art & Culture

    ভারতবর্ষ ও অ্যালেন গিন্সবার্গ

    By JoyBangla EditorOctober 9, 20260

     রাজীব সিংহ 0 বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬ আমেরিকা কবে আমরা মানুষের হানাহানি বন্ধ করবো? যাও…

    আমাদের এক বন্ধু

    October 9, 2026

    বাবা-মা সন্তানের ধর্ম ঠিক করবেন, জাপান বললো-না

    October 9, 2026

    লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে বাবাকে নিয়ে যেতে বলেছিল, গিয়ে পেলেন মেয়ের মরদেহ

    October 9, 2026

    সাবস্ক্রাইব

    সর্বশেষ খবরের সাথে আপডেট থাকুন।

    About Us
    About Us

    মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ ও লালন করে দেশ ও বিদেশের খবর পাঠকের কাছে দুত পৌছে দিতে জয় বাংলা অঙ্গিকার বদ্ধ। তাৎক্ষণিক সংবাদ শিরোনাম ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পেতে জয় বাংলা অনলাইন এর সঙ্গে থাকুন পতিদিন।

    Email Us: info@joybangla.co.uk

    Our Picks

    মিথ্যা মামলার ফাঁদে ঠাসা কারাগার : দক্ষিণ এশিয়ায় এক নম্বর বাংলাদেশ!

    October 8, 2026

    ঐতিহাসিক ৮ই অক্টোবরঃ শোষকের বিরুদ্ধে সোহরাওয়ার্দী-বঙ্গবন্ধুর ‘নৌকা’ প্রতীকের আনুষ্ঠানিক অভিযাত্রা!

    October 8, 2026

    দারিদ্র্যসীমার নিচে দেশের সোয়া ৬ কোটি মানুষ!

    October 8, 2026

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.