আবু মকসুদ
ইউনুসকে লাথি এবং থুতু না দিয়ে নিউইয়র্কবাসী যে সংযত আচরণের পরিচয় দিয়েছে, সে জন্য তাদের আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। সত্যি বলতে, এমন সংযম দেখানোর জন্যও যথেষ্ট মানসিক শক্তির প্রয়োজন হয়। কারণ মানুষের ক্ষোভ যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন নিজেকে সংযত রাখা সহজ কাজ নয়। বিশেষ করে সেই ক্ষোভের পাত্র যদি হয় এমন একজন মানুষ, যার হাতে ক্ষমতা থাকার সময় অন্যায়, নির্যাতন আর নিপীড়নের অসংখ্য অভিযোগ জমা হয়েছে। তবু নিউইয়র্কবাসী শারীরিক নিগ্রহের পথে হাঁটেনি। আমি তাদের এই আচরণকে সাধুবাদ জানাই। শারীরিক নিগ্রহ অসভ্যতা, আর প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজের সভ্যতাটুকু বিসর্জন দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
যদিও ইউনুস নিজে একজন মহা অসভ্য। এখানে অসভ্যতা বলতে আমি তার ব্যক্তিগত আচার-আচরণকেই শুধু বোঝাচ্ছি না, বোঝাচ্ছি তার শাসনামলে তৈরি হওয়া সেই রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশকে, যেখানে ভিন্নমতাবলম্বী মানুষের ওপর হামলা, নির্যাতন এবং হেনস্তার ঘটনাগুলোকে কোনো কোনো মহল যেন স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। যে দেশে ক্ষমতার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে একদল মানুষ নিজেদের আইন, বিচার ও জবাবদিহির ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করে, সেখানে সভ্যতার মুখোশ খুলে পড়তে বেশি সময় লাগে না। ইউনূসের আমলে তার সমর্থক ও পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত বলে বিবেচিত বিভিন্ন গোষ্ঠীর হাতে অসংখ্য মানুষ নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ এই সময়েও আমাদের শুনতে হয়েছে নীতিকথা, গণতন্ত্রের বয়ান, মানবাধিকারের সবক। কী চমৎকার পরিহাস! যাদের মুখে সভ্যতার বুলি, তাদের আশপাশেই যখন অসভ্যতার এমন দাপট, তখন সেই বুলির মূল্য নির্ধারণ করবে কে?
নিউইয়র্কে যা ঘটেছে, তাকে আমি ইউনুসের কর্মের প্রতিক্রিয়া হিসেবেই দেখি। মানুষ চিরকাল নীরব দর্শক হয়ে থাকে না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভ একসময় প্রকাশের পথ খুঁজে নেয়। ক্ষমতাবানরা প্রায়ই ভুলে যায়, তাদের চারপাশে সাজানো প্রশংসার আসরটাই পৃথিবীর শেষ সত্য নয়। দেশের বাইরে গেলেও তারা পেছনে ফেলে আসা কর্মকাণ্ডের স্মৃতি দেশের সীমানায় আটকে রাখতে পারে না। মানুষ মনে রাখে, কে কোন সময়ে কী বলেছে, কী করেছে, কাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, আর কাদের বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ক্ষমতার দাপটে যারা মানুষের কান্না শুনতে পায় না, তাদের জন্য একদিন সেই মানুষের ক্ষোভই সবচেয়ে বড় শব্দ হয়ে ফিরে আসে।
সত্যি বলতে কী, নিউইয়র্কে কেউ ক্ষুব্ধ হয়ে ইউনুসের মুখে থুতু দিলে, এমনকি তার মুখে প্রস্রাব করে দিলেও, মানুষের ক্ষোভের তীব্রতা বুঝতে পারতাম। তার কর্মকাণ্ডের জন্য জনরোষ কতটা গভীর হতে পারে, সেটি বোঝার জন্য খুব বেশি রাজনৈতিক বিশ্লেষণের দরকার নেই। তবে কোনো কাজের প্রতি মানুষের ক্ষোভ বোঝা আর সেই কাজকে নৈতিকভাবে সমর্থন করা এক বিষয় নয়। আমি শারীরিক নিগ্রহকে সমর্থন করি না। কিন্তু সেই কারণে ইউনূসের প্রতি মানুষের ক্ষোভকে অস্বীকার করারও কোনো কারণ দেখি না। বরং যারা আজ তার প্রতি মানুষের ক্ষোভ দেখে বিস্মিত হচ্ছে, তাদের উচিত নিজেদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন রাখা, এই ক্ষোভের পেছনে কী কী অভিজ্ঞতা, কী কী ঘটনা এবং কী কী বঞ্চনা কাজ করছে।
ইউনুস এবং তার সমর্থকদের একটা বিষয় বোঝা দরকার। ক্ষমতা কোনো স্থায়ী সম্পত্তি নয়, আর মানুষের ধৈর্যও অফুরন্ত নয়। আজ যারা ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে নিজেদের অপরাজেয় ভাবছে, কাল তাদেরও জনতার সামনে দাঁড়াতে হতে পারে। তখন কোনো আন্তর্জাতিক পরিচিতি, কোনো পুরস্কার, কোনো বিশেষণ কিংবা কোনো প্রচারযন্ত্রই মানুষের সব প্রশ্নের উত্তর হয়ে উঠবে না। মানুষের কাছে শেষ পর্যন্ত হিসাব দিতে হয় কাজের। কে কত বড় ব্যক্তিত্ব, কে কত বিখ্যাত, কে পৃথিবীর কোন মঞ্চে কত সম্মান পেয়েছে, সেসবের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে সে মানুষের সঙ্গে কী আচরণ করেছে।
নিউইয়র্কবাসীর সংযত আচরণ আমাকে মুগ্ধ করেছে। তারা প্রতিবাদের ভাষায় নিজেদের সীমা অতিক্রম করেনি। এই সংযমের মধ্যেই একটা শিক্ষা আছে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে অন্যায়েরই পুনরাবৃত্তি করার প্রয়োজন নেই। একজন অসভ্য আচরণ করলেই তার প্রতিবাদকারীকে অসভ্য হয়ে উঠতে হবে, এমন কোনো বিধান নেই। বরং প্রতিবাদকারী যখন নিজের নৈতিক অবস্থান অক্ষুণ্ণ রাখে, তখন তার প্রতিবাদের শক্তি আরও বেড়ে যায়। ইউনুসের প্রতি মানুষের ক্ষোভ যত প্রবলই হোক, সেই ক্ষোভ প্রকাশের ক্ষেত্রে নিউইয়র্কবাসীর সংযম প্রশংসার যোগ্য।
একেই আমি প্রকৃতির বিচার বলি। প্রকৃতির বিচার সব সময় বজ্রপাতের মতো নেমে আসে না, কখনো কখনো তা মানুষের চোখের ভাষায়, প্রতিবাদের কণ্ঠে, উপেক্ষার ভঙ্গিতে কিংবা জনসমক্ষে একজন ক্ষমতাবান মানুষের অস্বস্তিতে প্রকাশ পায়। যে মানুষ একসময় অন্যের অসহায়ত্বের মূল্য বোঝেনি, তাকে যখন নিজের অস্বস্তির মুখোমুখি হতে হয়, তখন ইতিহাসের নির্মম রসিকতাটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ক্ষমতা মানুষকে সাময়িকভাবে নিরাপদ রাখতে পারে, কিন্তু মানুষের স্মৃতি থেকে মুক্তি দিতে পারে না।
তবে ইউনুসের জন্য এই বিচার এখানেই শেষ হয়ে যায়নি। নিউইয়র্কের ঘটনা বড়জোর একটি দৃশ্য, পুরো নাটক নয়। মানুষের ক্ষোভের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি কোনো একটি দিনের প্রতিবাদে হবে না। যে অন্যায় হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যে নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা মানুষ বলছে, যে ক্ষত তৈরি হয়েছে, সেসবের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রত্যেকটি ঘটনার তদন্ত, প্রত্যেকটি অভিযোগের বিচার এবং প্রত্যেকটি অন্যায়ের উপযুক্ত প্রতিকার চাইতে হবে। এখানে কোনো বিশেষ ব্যক্তির জন্য বিশেষ ছাড় থাকতে পারে না। পরিচয় যত বড়ই হোক, ক্ষমতার আসন যত উঁচুই হোক, আইনের চোখে জবাবদিহির প্রশ্নটি সবার জন্য সমান হওয়া উচিত।
ইউনুস হয়তো ভাবছে, সময়ের সঙ্গে সবকিছু মুছে যাবে। মানুষ ভুলে যাবে, ক্ষোভ স্তিমিত হয়ে আসবে, আর ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে তার কর্মকাণ্ডের হিসাবও ইতিহাসের কোনো ধুলোমাখা তাকে ঠাঁই পাবে। কিন্তু মানুষের স্মৃতিকে এত সস্তা ভাবার কোনো কারণ নেই। ইতিহাসে অনেক ক্ষমতাবান মানুষ এসেছে, নিজেদের অপরিহার্য ভেবেছে, চারপাশে প্রশংসাকারীদের ভিড় দেখে আত্মতৃপ্তিতে ভুগেছে। তারপর একদিন সময় তাদের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেছে, মানুষের জন্য কী রেখে গেলে?
ইউনুসকেও সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে।
মানুষ তার অন্যায়ের পাই পাই হিসাব চাইবে। সেই হিসাব গালিগালাজের নয়, ব্যক্তিগত আক্রোশের নয়, প্রতিহিংসারও নয়। সেই হিসাব হবে ন্যায়বিচারের, জবাবদিহির এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার। যারা নির্যাতিত হয়েছে, তাদের বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। যারা অন্যায় করেছে, তাদের জবাবদিহি করার দায় আছে। আর যারা ক্ষমতায় থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি, তাদেরও নিজেদের ভূমিকার ব্যাখ্যা দিতে হবে।
নিউইয়র্কবাসী সংযম দেখিয়েছে। এবার সময়ের পালা। আর সময়ের আদালতে কোনো নোবেল পুরস্কার, কোনো আন্তর্জাতিক পরিচিতি কিংবা কোনো ক্ষমতার আসন চিরস্থায়ী ঢাল হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক, যুক্তরাজ্য প্রবাসী।
