সাইফুল্লাহ্ আল মামুন
বিকশিত হওয়ার আগেই বর্বরতার থাবায় ঝরে যাওয়া একটি ফুলের নাম শেখ রাসেল। দীপ্যমান জ্যোতি ছড়ানোর আগেই নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে নিভে যাওয়া তারার নাম শেখ রাসেল।
আজ ১৮ অক্টোবর। বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতার কনিষ্ঠ সন্তান শেখ রাসেলের শুভ জন্মদিন। প্রতিটি জন্মদিন আনন্দ ছড়ায়, অথচ ১৮ অক্টোবর আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। এই দিনে উৎসবের বদলে আমরা নীরবে দাঁড়াই এমন এক সত্যের সামনে, যেখানে জীবনের গল্প শুরু হতেই শেষ হয়ে গিয়েছিল।
১৯৬৪ সালের এই দিনে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে জন্ম নিয়েছিল শেখ রাসেল। ততদিনে বঙ্গবন্ধুর জীবনের বড় অংশ কেটেছে কারাগারে আর আন্দোলনের মাঠে। এরপর ছয় দফার রাজনীতি, আগরতলা মামলা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সবকিছুর ভেতর দিয়ে এগোচ্ছিল একটি পরিবার। সেই উত্তাল সময়ের ঘরে রাসেল ছিল সবচেয়ে ছোট, তাই সবচেয়ে আদরের। বাবা প্রায়ই ঘরের বাইরে, মা সংসার আর আন্দোলনের মাঝখানে অতন্দ্র প্রহরী। এমন ঘরে কনিষ্ঠ সন্তানের কাছে ভাই-বোনেরাই হয়ে ওঠে পুরো পৃথিবী।
পরিবারের সদস্যদের স্মৃতিচারণে রাসেলের যে ছবি বারবার উঠে আসে, তা এক দুরন্ত, কৌতূহলী ও মায়াময় শিশুর। যার হাসিতে ছিল ভোরের শিশির, চোখে ছিল দুরন্ত আকাশ।
বড় বোন শেখ হাসিনার ‘আমাদের ছোট রাসেল সোনা’ প্রবন্ধের পরতে পরতে আমরা খুঁজে পাই স্মার্ট, বিচক্ষণ, মেধাবী, সাহসী ও মানবিক শেখ রাসেলকে।
শেখ হাসিনা তাঁর অতি আদরের ছোট ভাই রাসেলের স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন:
“ওর সবকিছু যেন ছিল ব্যতিক্রম। ও যে খুবই মেধাবী তার প্রমাণ অনেকভাবে আমরা পেয়েছি। আমাকে হাসুপা বলে ডাকত। কামাল ও জামালকে ভাই বলত আর রেহানাকে আপু। কামাল ও জামালের নাম কখনও বলতো না। আমরা অনেক চেষ্টা করতাম নাম শেখাতে, মিষ্টি হেসে মাথা নেড়ে বলতো ভাই। দিনের পর দিন আমরা যখন চেষ্টা করে যাচ্ছি- একদিন বলেই ফেলল ‘কামমাল’, ‘জামমাল’। তবে সব সময় ভাই বলেই ডাকত।
চলাফেরায় বেশ সাবধানি কিন্তু সাহসী ছিল, সহসা কোনও কিছুতে ভয় পেতো না। কালো কালো বড় পিঁপড়া দেখলে ধরতে যেত। একদিন একটা বড় ওলা (বড় কালো পিঁপড়া) ধরে ফেললো আর সাথে সাথে কামড় খেল। ছোট্ট আঙুল কেটে রক্ত বের হলো। সাথে সাথে ওষুধ দেওয়া হলো। আঙুলটা ফুলে গেছে। তারপর থেকে আর পিঁপড়া ধরতে যেত না। কিন্তু ওই পিঁপড়ার একটা নাম নিজেই দিয়ে দিল। কামড় খাওয়ার পর থেকেই কালো বড় পিঁপড়া দেখলেই বলতো ‘ভুট্টো’। নিজে থেকেই নামটা দিয়েছিল।”
একজন মানুষ কতটা হৃদয়বান তা স্পষ্ট হয় পশুপাখির প্রতি তার মমত্ববোধ ও ভালোবাসা প্রকাশে। শেখ রাসেলের জীবনের এই দিকটিও ফুটে উঠেছে শেখ হাসিনার লেখায়:
“আমাদের একটা পোষা কুকুর ছিল; ওর নাম টমি। সবার সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব ছিল। ছোট্ট রাসেলও টমিকে নিয়ে খেলতো। একদিন খেলতে খেলতে হঠাৎ টমি ঘেউ ঘেউ করে ডেকে ওঠে, রাসেল ভয় পেয়ে যায়। কাঁদতে কাঁদতে রেহানার কাছে এসে বলে, টমি বকা দিচ্ছে। তার কথা শুনে আমরা তো হেসেই মরি। টমি আবার কিভাবে বকা দিল। কিন্তু রাসেলকে দেখে মনে হলো বিষয়টা নিয়ে সে বেশ গম্ভীর। টমি তাকে বকা দিয়েছে এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না, কারণ টমিকে সে খুব ভালোবাসতো। হাতে করে খাবার দিত। নিজের পছন্দমতো খাবারগুলো টমিকে ভাগ দেবেই, কাজেই সেই টমি বকা দিলে দুঃখ তো পাবেই।”
নিজের কষ্ট লুকাতে পারা সহজ কথা নয়। সমাজ ও পরিবারের প্রতি দায়িত্ববান মানুষরা স্বভাবতই নিজের কষ্ট লুকিয়ে রাখতে সচেষ্ট থাকে। শৈশবেই শেখ রাসেলের মধ্যকার এই গুণটিতে বিমোহিত হয়েছিলেন বড় বোন শেখ হাসিনা। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বন্দি অবস্থার বর্ণনা থেকে বিষয়টা আমাদের কাছে সুস্পষ্ট হয়। তিনি লিখেছেন:
“আমাদের ধানমন্ডির ১৮ নম্বর সড়কে (পুরাতন) একটা একতলা বাসায় বন্দি করে রাখে। ছোট্ট রাসেলও বন্দি জীবনযাপন করতে শুরু করে। ঠিকমতো খাবার-দাবার নেই। কোনো খেলনা নেই, বইপত্র নেই, কী কষ্টের দিন যে ওর জন্য শুরু হলো।
বন্দিখানায় থাকতে আব্বার কোনও খবরই আমরা জানি না। কোথায় আছেন কেমন আছেন কিছুই জানি না। প্রথম দিনে রাসেল আব্বার জন্য খুব কান্নাকাটি করত। তার ওপর আদরের কামাল ভাইকে পাচ্ছে না, সেটাও ওর জন্য কষ্টকর। মনের কষ্ট কীভাবে চেপে রাখবে আর কীভাবেই বা ব্যক্ত করবে। চোখের কোণে সব সময় পানি। যদি জিজ্ঞাসা করতাম, ‘কি হয়েছে রাসেল?’ বলত ‘চোখে ময়লা’। ওই ছোট্ট বয়সে সে চেষ্টা করত মনের কষ্ট লুকাতে।”
শেখ রাসেলের মধ্যে সচেতন অভিভাবক, অতিথিপরায়ণতা আর প্রগাঢ় ব্যক্তিত্বের জন্মজাত বৈশিষ্ট্য ছিল। যা ফুটে উঠেছে শেখ হাসিনার লেখায়:
“….শুরু হল এয়ার রেইড। আক্রমণের সময় সাইরেন বাজত। রাসেল এ ব্যাপারে খুবই সচেতন ছিল। যখনই সাইরেন বাজত বা আকাশে মেঘের মতো আওয়াজ হত, রাসেল তুলা নিয়ে এসে জয়ের কানে গুঁজে দিত। সব সময় পকেটে তুলা রাখত।
যা হোক স্বাধীনতার পরে একজন ভদ্রমহিলাকে রাসেলের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলো। রাসেলকে পড়ানো খুব সহজ কথা ছিল না। শিক্ষককে তার কথাই শুনতে হতো। প্রতিদিন শিক্ষয়িত্রীকে দুটো করে মিষ্টি খেতে হবে। আর এ মিষ্টি না খেলে সে পড়বে না। কাজেই শিক্ষিকাকে খেতেই হতো। তা ছাড়া সব সময় তার লক্ষ্য থাকত শিক্ষিকার যেন কোনও অসুবিধা না হয়। মানুষকে আপ্যায়ন করতে খুব পছন্দ করত।
ওর নিজের আলাদা একটা ব্যক্তিত্ব ছিল। নিজের পছন্দের ওপর খুব বিশ্বাস ছিল। খুব স্বাধীন মত নিয়ে চলতে চাইতো। ছোট মানুষটার চরিত্রের দৃঢ়তা দেখে অবাক হতে হতো। বড় হয়ে সে যে বিশেষ কেউ একটা হবে তাতে কোনও সন্দেহ ছিল না।”
বঙ্গবন্ধুর ছোট কন্যা শেখ রেহানা রাসেল সম্পর্কে এক স্মৃতিচারণে বলেন, “শেখ রাসেল আমাদের ভালোবাসা। আব্বার সঙ্গে আমার ও রাসেলের জাপান, মস্কো ও লন্ডন বেড়ানোর সুযোগ হয়। রাষ্ট্রীয় সফর বলেই রাসেল বিদেশিদের সঙ্গে খুব সৌজন্যমূলক ব্যবহার করত। সে ছোট্ট হলেও বুঝতে পারত কোথায়, কীভাবে চলতে হবে, কী শিখতে হবে। ঢাকায় ফিরে আমি যখন মা ও সবার কাছে ওর এই সুন্দর ব্যবহারের গল্প করেছি তখন সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনেছে। লন্ডনে বিখ্যাত মাদাম তুসোর মিউজিয়ামে আমরা যখন বেড়াতে যাই রাসেলের বিস্ময় আর কাটে না। আমরা দুজন আব্বার সাথে নাটোরের উত্তরা গণভবনেও গিয়েছি। রাসেল সেখানে মাছ ধরত, আমরা বাগানে ঘুরে বেড়াতাম। ঢাকার গণভবনেও রাসেল মাছদের খাবার খাওয়াত। ফুপাতো ভাই আরিফ তার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। তারা দুজন একই স্কুলে পড়ত এবং একসঙ্গে খেলত। টুঙ্গিপাড়ায় তাদের একটা খুদে বাহিনী ছিল, যাদের সঙ্গে খালের পানিতে সাঁতার কাটা, ফুটবল খেলায় মেতে থাকত তারা।”
শেখ রাসেলের মধ্যে স্বভাবজাত দুরন্তপনা ও স্পষ্টবাদিতা ছিল। যা ফুটে উঠেছে বঙ্গবন্ধুর লেখায়। কারাগারের রোজনামচায় শিশুপুত্র রাসেল সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, “… রাসেল একবার আমার কোলে, একবার তার মার কোলে, একবার টেবিলের ওপরে উঠে বসে। আবার মাঝে মাঝে আপন মনেই এদিক-ওদিক হাঁটাচলা করে। বড় দুষ্ট হয়েছে, রেহানাকে খুব মারে। রেহানা বললো, ‘আব্বা দেখেন আমার মুখখানা কী করেছে রাসেল মেরে।’ আমি ওকে বললাম, তুমি রেহানাকে মার? রাসেল বললো, ‘হ্যাঁ মারি।’ বললাম, ‘না আব্বা আর মেরো না।’ উত্তর দিলো, ‘মারবো।’ কথা একটাও মুখে রাখে না।”
শেখ রাসেলের মধ্যে ছোট বয়সেই দেখা যেত মেধা আর বিচক্ষণতার ঝলক। সেই মেধা ও বিচক্ষণতায় মুগ্ধতা ছড়ানো ছোট্ট রাসেল প্রশ্ন করত, জানতে চাইত, আর বড়দের আলোচনায় বড় বড় চোখে তাকিয়ে থাকত। তার সহপাঠী ও পরিচিতজনদের স্মৃতিচারণে একটি সহজ, প্রাণবন্ত, সবার সঙ্গে মিশে যাওয়া শিশুর ছবি পাওয়া যায়।
রাসেলকে নিয়ে তার শিক্ষিকা গীতালি দাশগুপ্তা বলেন, ‘শেখ রাসেলকে একবার যেটা শিখিয়েছি, তা সে কোনো দিন ভোলেনি। অত্যন্ত মানবিক ছিল সে। একই সঙ্গে মেধা ও মননের অপূর্ব সমাহার ছিল রাসেলের কচি মনে।’
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। সেই রাতের আঁধার শুধু একজন রাষ্ট্রনায়ককে নয়, একটি গোটা পরিবারকে কেড়ে নিল। মাত্র ১০ বছরের ছোট্ট রাসেলকেও ওরা ছাড়েনি। বাবা-মা, ভাই-ভাবিদের সঙ্গে পৃথিবীর নিকৃষ্টতম হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়েছিল তাকে। ইতিহাসের পাতায় এমন নৃশংসতার নজির খুব কম আছে, যেখানে একটি শিশুকেও রেহাই দেওয়া হয়নি। একটি শিশু, যার হাতে অস্ত্র নেই, মুখে স্লোগান নেই, যে কেবল নিরাপত্তার খোঁজে মায়ের আঁচল আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিল, তাকেও বুলেটের মুখোমুখি হতে হলো। ঘটনার প্রত্যক্ষ বিবরণ ও বিচারিক নথিতে সেই রাতের যে বর্ণনা আছে, তা পড়ে আজও পাথরের হৃদয় কেঁপে ওঠে।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে।” এই পৃথিবী সুন্দর, তাই বাঁচতে চাওয়াটাই স্বাভাবিক। দশ বছরের একটি শিশুর কাছে এই ভুবন আরও সুন্দর, কারণ তার চোখে তখনো স্বপ্ন ছাড়া কিছু নেই। সেই শিশুর কাছ থেকেই কেড়ে নেওয়া হলো তার ভুবন। কোনো রাজনৈতিক মতভেদ, কোনো আদর্শিক বিরোধ এই হত্যাকে ব্যাখ্যা করতে পারে না। এটি ছিল মানবতার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অপরাধ।
রাসেলকে নিয়ে দুই বাংলার খ্যাতিমান কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘শিশুরক্ত’ কবিতায় লিখেছিলেন,
তুই তো গল্পের বই, খেলনা নিয়ে
সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন বয়সেতে ছিলি!
তবুও পৃথিবী আজ এমন পিশাচি হলো
শিশুরক্তপানে গ্লানি নেই?
সর্বনাশী, আমার ধিক্কার নে!
যত নামহীন শিশু যেখানেই ঝরে যায়
আমি ক্ষমা চাই, আমি সভ্যতার নামে ক্ষমা চাই।”
শেখ রাসেল এখন আর জন্মদিনের মোমবাতি নেভাতে পারে না। তবু প্রতিটি অক্টোবরে শিউলির গন্ধে ফিরে আসে সেই নিষ্পাপ হাসি। শরতের ভোরে শিউলি ঝরে পড়ে, আর আমাদের মনে পড়ে আরেকটি ঝরে যাওয়া জীবনের কথা।
প্রকৃতি যেন প্রতিবছর এই দিনে স্মরণ করিয়ে দেয়, কিছু হারানো কখনো পুরোপুরি হারায় না।
আজ শেখ রাসেলকে স্মরণ করা মানে কেবল অতীতের শোক ফিরিয়ে আনা নয়। এর মধ্যে আছে এক গভীর দায়ও। প্রতিটি শিশুর নিরাপদ শৈশবের অধিকার নিশ্চিত করা, সহিংসতা ও ঘৃণার রাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং ইতিহাসের সত্যকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা, এসবই রাসেলের স্মৃতির প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা। শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ও আলোকিত বাংলাদেশ গড়াই হতে পারে তাকে দেওয়া সবচেয়ে বড় উপহার।
রাসেল শুধু একটি নাম নয়। রাসেল প্রতিটি শিশুর নিষ্পাপ হাসি, এক চিরন্তন ভালোবাসার প্রতীক।
শুভ জন্মদিন, শেখ রাসেল। তুমি বেঁচে আছো, আর বেঁচে থাকবে লাল-সবুজের প্রতিটি হৃদয়ে।
লেখক: সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় অর্থ ও পরিকল্পনা উপ-কমিটি।
