রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত পাঁচ তারকা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ছয় মাসে অর্ধশত কোটি টাকারও বেশি লোকসান করেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় হোটেলটির লোকসান বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে।
হোটেলটির একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, সমন্বয়ক-উপদেষ্টাদের ১০ টি রুম দখল করে দীর্ঘদিন থাকার কারণে সে রুমগুলো ভাড়া দিতে পারছে না হোটেল কর্তৃপক্ষ।
হোটেলটির চলতি ২০২৪–২৫ অর্থবছরের অর্ধবার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক হোটেল চেইন ইন্টারকন্টিনেন্টাল বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেডের (বিএসএল) একটি প্রতিষ্ঠান। । গত সপ্তাহে বিডি সার্ভিসেস চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই–ডিসেম্বর) আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেই আর্থিক প্রতিবেদন থেকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের আয়, ব্যয় ও লোকসানের তথ্য পাওয়া গেছে।
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই–ডিসেম্বরে কোম্পানিটি আয় করেছে ৬৭ কোটি টাকা। তার বিপরীতে সব ধরনের খরচ ও কর বাদ দেওয়ার পর ডিসেম্বর শেষে হোটেলটির লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫১ কোটি টাকা। এ লোকসানের পেছনে বড় কারণ আয় কমে যাওয়া ও ব্যাংকঋণের সুদহার বৃদ্ধি। ২০২৩ সালের জুলাই–ডিসেম্বরে হোটেলটি আয় করেছিল ৯০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে পাঁচ তারকা এই হোটেলের আয় ২৩ কোটি টাকা বা প্রায় ২৬ শতাংশ কমে গেছে। আয় কমলেও হোটেলটির খরচ খুব বেশি কমেনি। এ কারণে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে হোটেলটি।
হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বছরের জুলাইয়ে শুরু হওয়া কোটাবিরোধী আন্দোলন থেকে ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে আগস্টে সরকার বদল ও তার পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে হোটেল ব্যবসা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাতে দুই মাসের বেশি সময় তারকা হোটেলগুলোর বড় অংশই ছিল অতিথিশূন্য। জুলাই আন্দোলনে শাহবাগ এলাকা রূপ নিয়েছিল অন্যতম আন্দোলনকেন্দ্রে। এ কারণে আন্দোলনের পুরোটা সময়জুড়ে দেশি–বিদেশি পর্যটক শূন্য হয়ে পড়েছিল শাহবাগ এলাকায় অবস্থিত ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল। এ সময় নানা অনুষ্ঠান আয়োজনও প্রায় বন্ধ ছিল হোটেলটিতে। যার ধাক্কা লেগেছে হোটেলটির আয়ে। সরকার বদলের পর সেপ্টেম্বর–অক্টোবর থেকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরতে শুরু করে। এ কারণে অক্টোবর–ডিসেম্বর প্রান্তিকে ব্যবসা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়।
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই–ডিসেম্বরের ৬৭ কোটি টাকা আয়ের বিপরীতে হোটেলটির পরিচালন ও প্রশাসনিক ব্যয় ছিল ১২৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিচালন খরচ ছিল ৩৩ কোটি টাকা, হোটেলের প্রশাসনিক খরচ ছিল প্রায় ২২ কোটি টাকা। আর হোটেলের মালিকানা প্রতিষ্ঠান বিডি সার্ভিসেসের প্রশাসনিক খরচ ছিল প্রায় ৭১ কোটি টাকা, যার বড় অংশই হোটেল পুনঃসংস্কারে নেওয়া ঋণের সুদ বাবদ ব্যয়।
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুলাই–সেপ্টেম্বরে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ২৩ কোটি টাকার ব্যবসা করেছিল। অথচ ওই তিন মাসে হোটেলটির পরিচালন ও প্রশাসনিক খরচ বাবদ ব্যয় করতে হয় ৫৭ কোটি টাকা। ফলে ওই তিন মাসেই হোটেলটি ৩০ কোটি টাকা লোকসান করে। তার বিপরীতে অক্টোবর–ডিসেম্বর প্রান্তিকে এসে আগের প্রান্তিকের চেয়ে হোটেলটির আয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪৪ কোটি টাকায়। তার বিপরীতে ওই প্রান্তিকে পরিচালন ও প্রশাসনিক খরচ বাবদ ব্যয় করতে হয় ৬৭ কোটি টাকা। গত অক্টোবর–ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে লোকসান দাঁড়ায় ১৮ কোটি টাকা। আর ছয় মাসের হিসাবে এই লোকসান দাঁড়ায় প্রায় ৫১ কোটি টাকায়।
হোটেলের একটি সুত্র জানিয়েছে, হোটেলের ভিভিআইপি একটি স্যুট, যেটির প্রতিদিনের ভাড়া দুই লক্ষ টাকার বেশি সেটা উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভূইয়ার দখলে, ২ টি জুনিয়র স্যুট যেটির দৈনন্দিন ভাড়া ১ লক্ষ টাকার বেশি তারা দখল করেছে। দুইটি জুনিয়র স্যুট যার একটি হাসনাত আব্দুল্লাহ অন্যটি সারজিস আলমের দখলে।
একইসাথে ডাবল বেডের আরও ৭ টি রুম, যেগুলোর ভাড়া গড়ে ৫০ হাজার টাকার বেশি সেগুলো বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের জন্যে অলিখিতভাবে বরাদ্দ রয়েছে।
আগস্ট মাসের ১১ তারিখ থেকেই এসব রুম দখলে রেখেছেন তারা। গত আট মাসে এই রুমগুলোর ভাড়া বাবদ হোটেল কর্তৃপক্ষের আয় হতো অন্তত ৬ কোটি টাকা।
এছাড়াও উপদেষ্টা, সমন্বয়ক ও তাদের গেস্টদের খাবারের বিল ও পানীয়(মদ) বিলও অন্তত ৫ কোটি টাকা দেয়নি বলে জানিয়েছে হোটেলটির একাধিক কর্মকর্তা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হোটেলটির এক কর্মকর্তা বলেন, জুলাই–আগস্টের ছাত্র–জনতার আন্দোলন চলাকালে হোটেল ব্যবসায় বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। তাই জুলাই–সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, পরে তা আর প্রতিষ্ঠানটি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। উপদেষ্টা সারজিস-হাসনাত-আসিফ ও তাদের অন্য নেতাকর্মীরা হোটেলটির ১০ টি রুম দখল করে রেখেছে। সমন্বয়ক- ছাত্র উপদেষ্টাদের রুম দখল: ছয় মাসে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বেড়েছে লোকসান।