।। আমিনুল হক।।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চূড়ান্ত অবনতি, রেকর্ড পরিমাণ নারী ও সংখ্যালঘু নির্যাতন, রাজনৈতিক নিষ্পেষণ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কুক্ষিগতকরণ এবং মৌলবাদী উগ্রপন্থীদের হিংস্র চোখ রাঙানির কারণে বাংলাদেশে মানুষের যখন ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা তখন ডঃ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার পবিত্র ঈদ উল ফিতর উদযাপনের জন্য ঢাকায় আয়োজন করেছে সুলতানি আমলের ঈদ আনন্দ মিছিল। এই মিছিলের একটি প্রতিকৃতি নেটিজেনদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে নানান চর্চা। গাধার পিঠে উলটো করে বসা নাসিরউদ্দিন হোজ্জার প্রতিকৃতিটিকে কেউ বলছেন স্বয়ং ডঃ ইউনুসের প্রতিকৃতি, কেউ বা বলছেন জামাতে ইসলামের আমির শফিকুল ইসলামের প্রতিকৃতি, আবার কেউ বলছেন ডঃ ইউনুস এবং শফিকুল ইসলামের সংকর প্রতিকৃতি। প্রতিকৃতিটি দিয়ে আক্ষরিক অর্থেই দেশের বর্তমান অবস্থার একটা স্বরুপ ফুটে উঠেছে। কেননা ডঃ ইউনুসের নেতৃত্বে এবং জামায়াতে ইসলামের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বাংলাদেশ উল্টোপথেই যাত্রা করেছে।
ডঃ ইউনুস ক্ষমতায় বসেই বলেছিলেন তিনি রিসেট বাটন টিপে দিয়ে দেশের অতীত মুছে দিবেন। অতীত বলতে তিনি যে মূলত আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তিকে বুঝিয়েছেন তা অন্তর্বর্তী সরকারের বিগত আটমাসের কার্যকলাপেই প্রমাণিত। সাম্প্রতিক কিছু উদাহরণ থেকে বাংলাদেশের উল্টোযাত্রার চিত্র খুব প্রকটভাবেই দৃশ্যমান।
বাংলাদেশের মূল পররাষ্ট্রনীতি হচ্ছে সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ এই পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেই বৈদিশিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। অথচ ডঃ ইউনুস ক্ষমতায় বসার আগেই প্রতিবেশী ভারতকে সেভেন সিস্টার্স নিয়ে হুমকি দিয়েছেন। সেই থেকে শুরু। বিগত আটমাসে তার সরকারের উপদেষ্টা থেকে শুরু করে সমন্বয়ক প্রতিনিধিরা প্রতিনিয়ত ভারতবিরোধী বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ চীন সফরে ডঃ ইউনুস বাংলাদেশকে বঙ্গোপসাগর এলাকার একমাত্র অভিভাবক হিসেবে উল্লেখ করে ল্যান্ড লকড সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলোতে চীনের ব্যবসা সম্প্রসারণের আহবান জানিয়েছেন।
ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী বলেছিলেন, তুমি চাইলে বন্ধু পরিবর্তন করতে পারবে কিন্তু প্রতিবেশী না। কূটনীতিতে এই বিষয়টি খুবই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়। অথচ শুধুমাত্র সস্তা জনপ্রিয়তা লাভের জন্য বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ক্রমাগত ভারতবিরোধী বয়ান তৈরি করে যাচ্ছে, ক্ষেত্রবিশেষে দিচ্ছে হুমকি। এতে সাময়িকভাবে বাংলাদেশের ভারতবিরোধী গোষ্ঠী তুষ্ট হলেও দেশকে যে একটি আশু সংকটের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে তা ডঃ ইউনুস বুঝতে পারছেন না। তিনি বরং উলটো যাত্রাই বেছে নিয়েছেন।
বিগত বছরগুলোতে বৈশ্বিক ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ সরকার গুরুত্বপূর্ণ কার্যকর রেখেছে। জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কারণে বাংলাদেশে মৌলবাদী অপশক্তি একাধিকবার চেষ্টা করা সত্ত্বেও এদশে শেকড় গাড়তে পারেনি। অথচ ডঃ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের মাত্র আটমাসের শাসনামলে বাংলাদেশ আজ বিশ্ব দরবারে পরিচিতি পাচ্ছে পরবর্তী আফগানিস্তান হিসেবে। ডঃ ইউনুসের বাংলাদেশে নতুন সুযোগ দেখছে ইসলামী উগ্রপন্থীরা এই শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইম পত্রিকায়। সরকার এই প্রতিবেদনকে বিভ্রান্তিকর এবং একপক্ষীয় হিসেবে উল্লেখ করলেও, বাস্তবতা হচ্ছে বর্তমান সরকারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েই বাংলাদেশে ইসলামী মৌলবাদীদের বাড় বাড়ন্ত হয়েছে। এই সরকারের আমলে মুক্তি দেয়া হয়েছে শীর্ষ স্থানীয় জঙ্গী নেতাদের। দেশব্যাপী প্রকাশ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করছে হিজবুত তাহরির সহ নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন মৌলবাদী সংগঠন। দেশব্যাপী ভাংচুর করা হচ্ছে ভাস্কর্য, প্রতিমা, মাজার ও ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উপসানালয়। অন্ধ হলেই যেমন প্রলয় বন্ধ হয় না, তেমনি সরকার যতোই অস্বীকার করুক না কেন, বিশ্বব্যাপী বাংলাদেস ইতোমধ্যেই মৌলবাদী রাষ্ট্রের তকমা পেয়ে গিয়েছে। এখানেও সেই উলটো যাত্রা।
শেখ হাসিনার শাসনামলে নারী ক্ষমতায়নের সকল সূচকে বাংলাদেশ ছিলো এশিয়ার শীর্ষ স্থানে। অথচ মাত্র আটমাসের ব্যবধানে বাংলাদেশে নারীরা এখন ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছে। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন বৃদ্ধি পেয়েছে রেকর্ড পরিমানে। মোরাল পুলিশিং পেয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ। নারীরা কি ড্রেস পড়ে বাইরে যাবে, কি করতে পারবে, কি পারবে না সেটা ঠিক হচ্ছে মৌলবাদীদের ইশরায়। নারী হেনস্থাকারীরা পাচ্ছে বীরের মর্যাদা। থানা ঘেরাও করে হেনস্থাকারীকে মুক্ত করে আনছে তৌহিদী জনতা, আর অভিযোগকারীকে দেয়া হচ্ছে খুন এবং ধর্ষণের হুমকি। নারীদের কন্ঠরোধ করা এবং তাদেরকে ঘরের ভিতর বন্দী করার এই অপচেষ্টা ক্রমাগত বাড়ছে, আর পিছিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
উলটো পথে, উলটো রথে বাংলাদেশের এই যাত্রায় আশ্চর্য ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে ডঃ ইউনুস এবং কথিত সমন্বয়কবাহিনীর ব্যক্তিগত প্রাপ্তিযোগে। কথিত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে হঠাৎ পাওয়া এই ক্ষমতাকে তারা কাজে লাগাচ্ছে নিজেদের আখের গুছাতে। আইন- আদালত, প্রশাসন সবকিছুকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তারা শুরু করেছে মবের শাসন। রাষ্টপতি কিংবা সেনাপ্রধান কেউই রক্ষা পাচ্ছে না তাদের হুমকি-ধামকি থেকে। তাদের মুখে শোনা যাচ্ছে আশ্চর্য দম্ভোক্তি, উই হ্যাভ একসেস টু এভরিথিং। এভাবে তারা জনমানসে নিজেদের ক্ষমতার দাপট প্রতিষ্ঠা করছে এবং সেই ক্ষমতাকে ব্যবহার করছে নিজদের ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করতে।
শ্রম মামলায় দন্ডপ্রাপ্ত ডঃ ইউনুস ক্ষমতায় বসে তার বিরুদ্ধে চলমান সকল মামলা প্রত্যাহার করেছেন। নিজের প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ কল্যাণের ৬৬৬ কোটির কর মওকুফ করেছেন, বাতিল করেছেন অন্যান্য সকল প্রতিষ্ঠানের কর মামলাসমূহ যাতে রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়েছে অন্ততপক্ষে দুই হাজার কোটি টাকা। গ্রামীণ ব্যাংক দখল করে সেটাকে দিয়েছেন পাঁচ বছরের কর অব্যাহতি। গ্রামীণ টেলিকম ট্রাস্টের নামে নিয়েছেন প্রাইভেট হাসাপাতালের অনুমোদন, গ্রামীণ ট্রাস্টের নামে নিয়েছেন গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন। এখানেই শেষ নয়, গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস নামক নতুন প্রতিষ্ঠান খুলে নিয়েছেন জনশক্তি রপ্তানীর লাইসেন্স। শোনা যাচ্ছে গ্রামীণ ফুড এন্ড বেভারেজ এর মাধ্যমে বার এর লাইসেন্স নেয়াও প্রক্রিয়াধীন। অর্থাৎ শিক্ষা থেকে মদ, ডঃ ইউনুস বাদ দিচ্ছেন না কিছুই!
ডঃ ইউনুস থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে থেমে নেই সমন্বয়ক বাহিনীও। ছাত্র প্রতিনিধিদের যারা সরকারের উপদেষ্টা পদে আছেন তারা কেউই কোটির নীচে কোন ডিল করেন না। শুধু আর্থিক দুর্নীতিই নয়, ক্ষমতা প্রদর্শনের হেন কোন সুযোগ নেই যেটা তারা কাজে লাগাচ্ছে না। এমনকি ঈদের জামাতও পড়ছে বিশেষ কাতারে দাঁড়িয়ে। আর রাজপথে থাকা সারজিস, হাসনাত, মাসুদরা কি করছেন তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে সবাই ইতোমধ্যে জানেন। কিছুদিনা আগেও পকেটে দুই হাজার টাকা না থাকা সারজিস দেড়শো গাড়ি নিয়ে এলাকায় শোডাউন দিচ্ছে, মাসুদের জন্য তার এলাকায় তৈরি হচ্ছে শত শত তোরণ। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে এই শীর্ষ সমন্বয়করা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের দশটি ভিআইপি রুপ দখল করে রেখেছেন, যাতে হোটেল কর্তৃপক্ষের লোকসান হয়েছে অন্তত পঞ্চাশ কোটি টাকা। ওয়েস্টিন, আমারিসহ অন্যান্য ফাইভস্টার হোটেলগুলোতেও রয়েছে তাদের দখলকৃত রুম। এক বছর আগেও বিশ্ববিদ্যলয়ের হলে থাকা এবং ক্যান্টিনে খাওয়া এই ছেলেগুলো এখন ফাইভস্টার ছাড়া থাকতে পারে না, পাজেরো, ল্যান্ডক্রূজার ছাড়া চড়তে পারে না!
হুসাইন মোহাম্মদএরশাদ তার শাসনামালে মোল্লাদের খুশি করার জন্য আরবের প্রানী হিসেবে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে বেশ কিছু উট নিয়ে এসেছিলেন। সেই উট নিয়ে এতোই আলোড়ন তৈরি হয়েছিলো, কিছু মানুষ নাকি উটের মুত্র পবিত্র হিসেবে খাওয়া শুরু করেছিলো। দেশের তৎকালীন স্বৈরশাসনের মাঝেও উট নিয়ে মানুষের এই আদিখ্যেতা দেখেই শামসুর রহমান লিখেছিলেন তার অমর সৃষ্টি, উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মাত্র আটমাসের শাসনামলে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটা সেক্টর ধ্বংসের উপক্রম হওয়া সত্ত্বেও ডঃ ইউনুসের ব্যাপারে তার অনুসারীদের স্তুতিবাক্যের ফুলঝুরি এবং ডঃ ইউনুস ও তার সহযোগীদের ব্যক্তিগত প্রাপ্তিযোগের উম্ফলন দেখে বেচে থাকলে নিশ্চিতভাবেই তিনি লিখতেন উদ্ভট গাধার পিঠে চলেছে বাংলাদেশ!
[লেখক পরিচিতিঃ আমিনুল হক, সাবেক কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক]