বারনই নদের তীরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধের উপর দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটি কাঁচা ঘর এখন ভগ্নস্তূপ। টিনের বেড়া ফুটো, মাটির দেয়াল ভাঙা, ঘরের ভেতরে ঝুলছে মশারি, নিচে শুয়ে আছে কুকুর। মানুষগুলো কোথায়? কেউ পালিয়েছে ভয়ে, কেউ আত্মগোপনে। যারা পালাতে পারেনি, তারা এখনো কাঁপছে। গত বুধবার দুই দফা হামলার পর সাঁওতালপাড়ার বাসিন্দারা সবকিছু ফেলে চলে গেছেন। শুধু রয়ে গেছেন অমলা দাসী নামের এক বৃদ্ধা, যিনি হাঁটতে পারেন না বলে পালাতে পারেননি।
এই হামলার পেছনে আছে স্থানীয় বিএনপি নেতা বাবলু। তার জমির সামনে সাঁওতালরা বাড়ি বেঁধেছে—এটাই তার রাগের কারণ। যদিও জমি পাউবোর, তবুও বাবলুর দাবি, “এরা আমাদের জমির সামনে বাড়ি করেছে, খুব অত্যাচার করে।” অত্যাচার কী? সাঁওতালরা তাঁদের ধর্মীয় আচার পালন কেনো করে ৯৮% মুসলমানের দেশে এই ইস্যুতে, বাবলু তাদের অকথ্য ভাষায় গালাগালি করেন রোজ দুইবেলা। সাঁওতালরা প্রতিবাদ জানাতেই শুরু হয় প্রতিশোধের পালা। দুপুরে এবং সন্ধ্যায় দুই দফা হামলা চালানো হয় সাঁওতালপাড়ায়। হামলাকারীরা হাঁসুয়া, বল্লম, ছোরা নিয়ে এসেছিল।
পুলিশ এসেছিল, শান্তির কথা বলে চলে গেছে। কিন্তু হামলাকারীরা ফিরে এসেছে পুলিশের চোখের সামনেই। বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়েছে, জিনিসপত্র লুট করা হয়েছে। শ্যামল মুর্মুর বাড়ি থেকে দশ হাজার টাকা লুট হয়েছে, ২৫টি কবুতর নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ঘরের হাঁড়িতে পচে যাওয়া ভাত এখনো পড়ে আছে পরিকল্পিত একটি হামলার স্বাক্ষী হিসেবে।
বাবলুর স্ত্রী ডলি বেগম বলেছেন, “পুলিশ বলে গেছে সাঁওতালরা তাদের বাড়িতে থাকবে। কেউ যেন কিছু না বলে।” এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, রাষ্ট্র এখানে কতটা নিষ্ক্রিয়, কতটা পক্ষপাতদুষ্ট। রাষ্ট্র যদি তার নাগরিকদের রক্ষা না করে, তাহলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব কী?
এই ঘটনা শুধু সাঁওতালদের বিরুদ্ধে হামলা নয়, এটা বাংলাদেশের সকল নাগরিকের জন্য একটি প্রশ্ন। আমরা কি এমন একটি দেশ চাই, যেখানে ক্ষমতাধররা ইচ্ছেমতো দুর্বলদের ওপর হামলা চালাবে? যেখানে পুলিশ শুধু দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে? যেখানে রাষ্ট্রের ভূমিকা হবে শুধু কথার বুলি আওড়ানো?
