নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার সদস্যরা ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসে হামলার পরিকল্পনা করছিল বলে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ওয়াশিংটন থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার এই গ্রেপ্তারের ব্যবস্থা নেয়।
এর আগে, ২০২২ সালে শেখ হাসিনার সরকারের আমলে বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) সহযোগিতায় প্রশিক্ষণ নেওয়া এই সংগঠনের ৩২ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। ড. ইউনূস ক্ষমতা দখলের পর গত বছরের সেপ্টেম্বরে বান্দরবান জেলা ও দায়রা জজ আদালত তাদের জামিনে মুক্তি দেয়।
মুক্তির এক বছরের মধ্যেই এই প্রশিক্ষিত জঙ্গিরা মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের হত্যার পরিকল্পনা করছিল বলে তথ্য পাওয়া যায়, যা দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, মার্কিন দূতাবাসে হামলার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টির পরিকল্পনা করছিল জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া।
এই তথ্য ওয়াশিংটন থেকে পাওয়ার পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) যৌথ অভিযান চালিয়ে ৪ জনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতরা বান্দরবানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্যদের মধ্যে ছিল বলে নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি নেই, বাংলাদে জঙ্গিবাদের ঝুঁকিতে নেই- গত এক বছরে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সামনে এমন বক্তব্য দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরের উপদেষ্টা এবং দায়িত্বশীরা। কিন্তু মার্কিন দূতাবাসে হামলাচেষ্টার মত ভয়ঙ্কর ঘটনায় এটাই প্রতীয়মান হয় যে, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বশীলদের বক্তব্যগুলোর সাথে এই জঙ্গি আটকের ঘটনা পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। কারাগারে মব সন্ত্রাসের হুমকি দিয়ে জঙ্গি মহিবুল্লাহকেও বের করে আনা হয়।
এমনকি সারাবিশ্বকে স্তব্ধ করে দেওয়া হলি আর্টিজানের জঙ্গি হামলার ঘটনাকে ‘সাজানো নাটক’ বলে মন্তব্য করেছেন বর্তমান পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও। যা সেই হামলায় নিহত দেশি-বিদেশি নাগরিকদের পরিবার-স্বজনকে ব্যথিত করেছে।
শেখ হাসিনার সরকারের সময় এই ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারকে ‘ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের ওপর হয়রানি’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক গোয়েন্দা তথ্যে তাদের জঙ্গি তৎপরতার প্রমাণ মিলেছে, যা ইউনূস সরকারকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনায় বাধ্য করেছে।
ডিবি প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, “গ্রেপ্তারকৃতরা কেএনএফের কাছ থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। তারা মার্কিন দূতাবাসে হামলার পরিকল্পনা করছিল। আমরা তদন্ত অব্যাহত রেখেছি।”
র্যাবের মুখপাত্র কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, “এই সংগঠন দেশের জন্য হুমকি। ২০২২ সাল থেকে তাদের ৮২ জন সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছে। আমরা তাদের কার্যক্রমের ওপর নজর রাখছি।”
এর আগে, গত জুন মাসের শেষদিকে মালয়েশিয়ায় ৩৬ জন বাংলাদেশি জঙ্গিকে আটক করেছিল দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তারা আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত ছিল। আটককৃতদের কয়েকজনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর পর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা দাবি করেছিলেন তাদের জঙ্গিবাদের জন্য আটক করা হয়নি। তার এমন বিভ্রান্তিকর বক্তব্য মালয়েশিয়া সরকার সহজভাবে নেয়নি।
গত বছরের জুলাই-আগস্টে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের জন্য সংঘাত চলছিল যখন, সেসময় বাংলাদেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে কয়েক হাজার দুর্ধর্ষ অপরাধী ও জঙ্গিকে মুক্ত করে দেওয়া হয়, যারা পালিয়ে গিয়ে নাশকতা ও অপরাধে যুক্ত হয়েছে। অধিকাংশই ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। ইউনূস সরকারের স্টেকহোল্ডারদের তৎপরতায় দুর্ধর্ষ অনেক জঙ্গি জামিনে বেরিয়ে এসেছে। আটককৃতদের ‘ইসলামী ব্যক্তিত্ব’ এবং শেখ হাসিনার সরকারের ‘ষড়যন্ত্রের শিকার’ আখ্যা দিয়ে তাদের জঙ্গিবাদ সম্পৃক্ততা ও অপরাধকে আড়াল করা হয়েছে।
মার্কিন দূতাবাসে হামলাচেষ্টার এ ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা জঙ্গিদের জামিনে মুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন এবং জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছেন।
এ ঘটনার পর ইউনূস সরকার মার্কিন দূতাবাসের নিরাপত্তা জোরদার করেছে এবং জঙ্গি তৎপরতা রোধে আরও কঠোর নজরদারির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।