।। মিহিরকান্তি চৌধুরী।।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে দাসপ্রথা এক অন্ধকার অধ্যায়। আফ্রিকা, ইউরোপ, আমেরিকা কিংবা এশিয়া—সবখানেই কোনো না কোনো সময়ে মানুষকে মানুষ হিসেবে নয়, বরং সম্পদ বা পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আমরা প্রায়শই আটলান্টিক দাসবাণিজ্যের কথা শুনি, যেখানে লক্ষ লক্ষ আফ্রিকানকে জোরপূর্বক আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত একটি বাস্তবতা হলো ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দাসবাণিজ্য, যার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল সিন্ধুপ্রদেশের করাচি শহর। আঠারো ও উনিশ শতকে করাচি কেবল একটি বন্দরনগরী নয়, বরং আফ্রিকান দাসদের অন্যতম বড় বাজার ছিল।
এই প্রবন্ধে আমরা করাচির দাসবাণিজ্যের উত্থান, শ্রেণিবিন্যাস, সামাজিক অবস্থান, সংস্কৃতি, মুক্তি-পরবর্তী পরিস্থিতি এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাদের উত্তরসূরিদের জীবনযাত্রা নিয়ে আলোচনা করব।
দাসবাণিজ্যের প্রেক্ষাপট
উনবিংশ শতকের ব্রিটিশ আগমনের পূর্বে করাচি মূলত আরব ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত ভারত মহাসাগরীয় দাসবাণিজ্যের একটি প্রধান ঘাঁটি ছিল। আরবরা আফ্রিকার পূর্ব উপকূল—বিশেষত জাঞ্জিবার ও সোয়াহিলি অঞ্চল থেকে দাস সংগ্রহ করত। স্থানীয় আফ্রিকান গোষ্ঠীগুলোকে আক্রমণ করে বা যুদ্ধে বন্দী করে তাদের জোরপূর্বক জাহাজে তুলে আনা হতো। প্রথমে এই দাসরা মুসকাটে আসত, সেখান থেকে আবার করাচিতে পাঠানো হতো বিক্রির জন্য। স্থানীয়ভাবে এদের বলা হতো ‘শিদি’ (Sheedi)।
১৮৩০-এর দশকে করাচিতে দাস আমদানির সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। ১৮৩৭ সালে ব্রিটিশ নৌ-অফিসার কমান্ডার থমাস গ্রিয়ার কারলেসের হিসাব অনুযায়ী, কেবল ওই বছরেই প্রায় দেড় হাজার দাস করাচিতে এসেছিল। যদিও ব্রিটিশরা ১৮৪৩ সালে সিন্ধু দখল করে দাসপ্রথা বিলুপ্ত ঘোষণা করে, তারপরও গোপনে দাস কেনাবেচা চলতে থাকে আরও কয়েক দশক।
দাসদের শ্রেণিবিন্যাস
করাচির দাসবাজারে দাসদের নানা শ্রেণিতে ভাগ করা হতো। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
১। শিদি (Sheedi): পূর্ব আফ্রিকা থেকে আনা কিশোর-কিশোরীরা, যাদের মাছ ধরা, নৌচালনা ও গৃহকর্মে ব্যবহার করা হতো।
২। হবশি (Hubshee): আবিসিনিয়া (বর্তমান ইথিওপিয়া) থেকে আনা দাস। এরা তুলনামূলকভাবে দামী ছিল, বিশেষ করে সুন্দরী নারীরা অভিজাত পরিবারে উচ্চমূল্যে বিক্রি হতো। দাম ১৭০ থেকে ৫০০ রুপি পর্যন্ত উঠতে পারত।
৩। মকরানি (Makrani): মকরান উপকূল থেকে আনা এক জনগোষ্ঠী, যাদের উৎস আফ্রিকা ও বালুচ জাতিগোষ্ঠীর মিশ্রণে তৈরি।
৪। গাডো (Gaado): স্থানীয় সিন্ধি পুরুষ ও আফ্রিকান দাস নারীর সন্তান।
৫। কাম্বরানি (Qambrani): গাডো বংশোদ্ভূত যারা তুলনামূলক উচ্চ সামাজিক মর্যাদা অর্জন করেছিল।
দাসদের সামাজিক ভূমিকা ও জীবনযাত্রা
করাচি ও সিন্ধের সমাজে দাসদের ভূমিকা ছিল বহুমুখী। কেউ কৃষিকাজে নিয়োজিত হতো, কেউ আবার সৈনিক, প্রাসাদ প্রহরী, অশ্বপালক বা রাজকীয় ভৃত্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করত। তবে নারীদের ভূমিকা ছিল প্রধানত গৃহকর্মে, এবং সমাজে তাদের চাহিদাই ছিল বেশি।
আশ্চর্যজনকভাবে, ইউরোপ ও আমেরিকার নির্মম দাসপ্রথার তুলনায় সিন্ধের দাসপ্রথাকে সমসাময়িক ইউরোপীয় ভ্রমণকারীরা তুলনামূলক ‘সহনশীল’ বলে বর্ণনা করেছেন। অনেকে বলেছেন, দাসরা তাদের প্রভুর পরিবারের সদস্যের মতোই থাকত। কিছু ক্ষেত্রে তারা প্রভাবশালী অবস্থানেও উন্নীত হতো। উদাহরণস্বরূপ, প্রখ্যাত যোদ্ধা হোশু শিদি (Hoshu Sheedi) ছিলেন দাসবংশোদ্ভূত, যিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ১৮৪৩ সালের যুদ্ধে সাহসিকতার পরিচয় দেন।
তাদের সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল নৃত্য, সংগীত ও ঢোলবাদন। রিচার্ড বার্টন তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে উল্লেখ করেছেন, করাচির মঙ্গোপীর মেলায় শিদি সম্প্রদায় বিশেষ আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নাচ-গান করত। এই সাংস্কৃতিক উপাদান এখনো টিকে আছে।
মুক্তির পর পরিস্থিতি
ব্রিটিশরা দাসপ্রথা আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করলেও মুক্ত দাসদের জীবন সহজ ছিল না। অনেকে পূর্বের প্রভুর কাছেই চাকর-শ্রমিক হিসেবে থেকে যায়। আবার অনেকে করাচি ও সিন্ধের বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি গড়ে তোলে। করাচির লিয়ারি (Lyari) এলাকায় গড়ে ওঠে বৃহৎ শিদি বসতি, যা আজও তাদের অন্যতম প্রধান আবাসস্থল।
তারা নানা পেশায় যুক্ত হয়—ডক শ্রমিক, গাড়োয়ান, জেলে, নৌকাচালক ইত্যাদি। কৃষিকাজ জানা লোকেরা মালির অঞ্চলে গিয়ে খেত-খামারে কাজ করতে থাকে। সময়ের সাথে সাথে এরা সিন্ধি সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়, যদিও অর্থনৈতিক দিক থেকে তারা প্রায়ই বঞ্চিত অবস্থায় থেকেছে।
উত্তরসূরিদের বর্তমান জীবন
আজও করাচির লিয়ারি অঞ্চলে শিদি সম্প্রদায়ের বংশধরেরা বসবাস করছে। তারা দারিদ্র্য ও অবহেলার শিকার হলেও তাদের সংস্কৃতি আজও জীবন্ত। বিশেষত শিদি নাচ এবং মুগারমান ঢোল তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে আছে। মাজার, বিয়ে কিংবা সামাজিক উৎসবে এরা ঐতিহ্যবাহী নাচ পরিবেশন করে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, লিয়ারির নারীরা সামাজিকভাবে বেশ মুক্ত ও প্রাণবন্ত। রাজনৈতিক মিছিল থেকে শুরু করে নির্বাচনী বিজয় উদযাপনে তাদের গান-নাচ—সবই প্রমাণ করে যে দাসপ্রথার অন্ধকার অতীত সত্ত্বেও তারা নিজেদের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক শক্তি ধরে রেখেছে।
ঐতিহাসিক তাৎপর্য
করাচির দাসপ্রথা আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়:
১। মানবসভ্যতার বহুমুখী ইতিহাস: দাসপ্রথা শুধু আটলান্টিকের ইতিহাস নয়, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও সমানভাবে প্রভাব ফেলেছে।
২। সংস্কৃতির মিশ্রণ: আফ্রিকান দাসরা সিন্ধি সমাজে এক অনন্য সাংস্কৃতিক মাত্রা যোগ করেছে, যা আজও সংগীত, নৃত্য ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে দৃশ্যমান।
৩। অবহেলার বাস্তবতা: শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও শিদি সম্প্রদায় এখনো প্রান্তিক ও দরিদ্র।
৪। প্রতিরোধ ও আত্মমর্যাদা: হোশু শিদির মতো ব্যক্তিত্ব প্রমাণ করেছেন যে দাস বা তাদের বংশধরেরাও স্বাধীনতার সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে।
উপসংহার
করাচির দাসপ্রথার ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানবসভ্যতার উন্নতির পেছনে কত অন্ধকার অধ্যায় লুকিয়ে আছে। দাসত্ব ছিল অর্থনীতি, রাজনীতি ও ক্ষমতার খেলায় ব্যবহৃত নিষ্ঠুর এক ব্যবস্থা। কিন্তু এর মধ্য দিয়েই জন্ম নিয়েছে নতুন সংস্কৃতি, সংগীত, নৃত্য এবং সামাজিক পরিচয়।
আজকের লিয়ারি ও সিন্ধের শিদি সম্প্রদায় সেই ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। তারা প্রমাণ করে দিয়েছে, নিপীড়ন ও দাসত্বের শিকড় থেকে জন্ম নিয়েও একটি জনগোষ্ঠী নিজেদের সাংস্কৃতিক শক্তি ও মানবিক মর্যাদা বজায় রাখতে পারে। ইতিহাসের আলোচনায় তাই করাচির আফ্রিকান দাসদের স্থান কেবল প্রান্তিক কোনো অধ্যায় নয়, বরং এক অনন্য মানবিক কাহিনি—যা আমাদের শেখায় স্বাধীনতা, সংস্কৃতি ও সমতার মূল্য।
লেখক পরিচিতিঃ
লেখক, অনুবাদক ও নির্বাহী প্রধান, টেগোর সেন্টার সিলেট।