।। আহমাদ ইশতিয়াক।।
.
ক্র্যাকপ্লাটুনের গেরিলারা কখনোই ধরা পড়তেন না। তাঁদের আসলে ধরিয়ে দেয়া হয়েছিলো। কে ধরিয়ে দিয়েছে তা সবাই জানেন। সে হলো ফরিদ। আইভি রহমানের ছোট ভাই, জিল্লুর রহমানের শালা। ঢাকা কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ জালাল উদ্দিনের ছেলে।
আরেকজন হলেন আব্দুস সামাদ বীর প্রতীক। সামাদ ভাইকে অনেকে ভয়ঙ্কর ব্লেম দেন, তবে আমি সামাদ ভাইকে তেমন একটা দোষ দিবোনা কারণ তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেই ধরা পড়েছিলেন এবং ভয়ঙ্কর টর্চারের পর নির্যাতন সইতে না পেরে শেষপর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
মূলত মূল কালপ্রিটটা ছিল ফরিদ। ফরিদ ছিল ক্র্যাকপ্লাটুনের গেরিলা বদিউল আলম বদির বন্ধু। ঊনসত্তর সত্তর সালে বদিও আইয়ুব খানের ছাত্র সংগঠন এনএসএফ করতো এবং পাণ্ডা ছিল। সেই সূত্রেই বদির সঙ্গে ফরিদের দহরম মহরম ছিল।
.বদি যে মুক্তিযুদ্ধের যোগ দিয়েছেন তা ফরিদকে জানাননি। কারণ তখনো ফরিদ ছিল পাকিস্তানি চর। দিনের বলায় বদি ফরিদদের বাসায় গিয়ে তাস খেলতেন। আর রাতের বেলায় অপারেশনে যেতেন। এভাবেই বেশ কয়েকটি অপারেশনে অংশ নেন বদি। একপর্যায়ে ফরিদ টের পেয়ে যায় বদির মুক্তিযুদ্ধের সংশ্লিষ্টতা। জেনেও সে না জানার ভান করে তক্কে তক্কে ছিলোও।
.২৫ আগস্ট রাতে ঢাকা শহরে ক্র্যাকপ্লাটুনের গেরিলারা দুর্ধর্ষ অপারেশন ডেস্টিনেশন আননোন করার পড় নড়ে চড়ে বসে পাকিস্তানি প্রশাসন। বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি অফিসার গেরিলাদের অপারেশনে প্রাণ হারিয়ে ছিল। যাদের মধ্যে লেফটেন্যান্ট কর্নেল , মেজর থেকে কয়েকজন ক্যাপ্টেনও ছিল।
.এরপরই পাকিস্তানিরা পাগলা কুকুরের মতো হয়ে যায়। গেরিলাদের ধরতে তখন চিরুনি অভিযানে নামে পাকিস্তান বাহিনী ও আলবদরেরা। একই সঙ্গে চলে গোয়েন্দাদের তৎপরতা। পাকিস্তানপন্থীদের দেয়া হয় মোটা অংকের পুরস্কারের লোভ।
এমন সময়ই সেই সুযোগ কাজে লাগায় ফরিদ। আগেই পাকিস্তানিদের নির্দিষ্ট সময় জানিয়ে দেয়। প্রতিদিনের মতো সকাল ১০টা/ ১১টার দিকে বদিও ঠিক সময় মতো তাস খেলতে ফরিদদের ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসের প্রিন্সিপ্যালের বাসায় যায়।
সেখানে আরও দুজন ছিল। জাফর ও পারভেজ হাসান। যদিও তারা গেরিলা বা পাকিস্তানি চর না।
.বদি ঘুণাক্ষরেও টের পাননি ফরিদ যে তাঁকে ধরিয়ে দিবে। তাস খেলার মাঝে ফরিদ মাঝেমাঝে উঁকি ঝুঁকি দিলে বদির খানিকটা সন্দেহ হয়। কিন্তু ফের তাস খেলায় মনোযোগ দিয়েছিলেন। তাস খেলার এক পর্যায়ে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পাকিস্তানি সেনাদের একটি দল ঢাকা কলেজের প্রিন্সিপ্যালের বাড়িটি ঘেরাও করে ফেলে।
.বদি মুহূর্তেই বুঝতে পেরে যায় সে ধরা পড়ে গেছে। রান্না ঘর দিয়ে পালাতে গিয়ে পা ফসকে যায়। এমন সময় পকেটে আত্মহত্যার জন্য বিষাক্ত পটাশিয়াম সায়ানাইড ছিল তার। কিন্তু তিনি মুখে তুলতেই পাকিস্তানিরা পুরোপুরি ধরে ফেলে। ক্র্যাকপ্লাটুনের গেরিরালা পকেটে পটাশিয়াম সায়ানাইড রাখতেন যেন নিশ্চিত ধরা পড়ছেন এমন মুহূর্তে এটি খেয়ে আত্মহত্যা করতে পারেন। যেন তাও ধরা না খান। এরপর বদিকে নিয়ে যাওয়া হয় তেজগাঁও নাখালপাড়ার ড্রাম ফ্যাক্টরির পাশে এমপি হোস্টেলের মিলিটারি টর্চার সেলে।
.সেখানে তাঁর উপর নির্যাতন শুরু হলেও তিনি ছিলেন নির্বিকার। নানা পর্যায়ে অত্যাচার করতে করতে জিজ্ঞেস করছিলো তাঁর সহযোদ্ধাদের নাম। তিনি প্রথমে বলেছিলেন তোমরা যা ইচ্ছে তা করতে পারো। কিন্তু আমি বলবোনা আমার সহযোদ্ধাদের নাম। তাঁকে এতোটাই নির্মম নির্যাতন করা হয়েছিলো যে বদির একটি চোখ বেরিয়ে এসেছিলো।
.তাঁর দুহাত ও পায়ে রড দিয়ে চূড়ান্ত পাশবিক কায়দায় পিটিয়ে হাড় ভেঙে দেয়া হয়েছিলো। একই সঙ্গে বদিকে ইলেকট্রিক শক দেয়া হয়েছিলো যেন নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে সঙ্গীদের নাম প্রকাশ করেন। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তিনি আত্মহত্যা করার পরিকল্পনা করেছিলেন বদি।
.প্রথমে তিনি তার দিয়ে আত্মহত্যা করতে গেলেও পারলেন না। এরপর তিনি অতিষ্ঠ হয়ে খোঁড়ানো অবস্থাতেই এক হানাদার সদস্যকে ধরে মারতে লাগলেন। উদ্দেশ্য তাঁকে যেন গুলি করে মেরে ফেলা হয়।
.এদিকে বদিকে প্রচণ্ড নির্যাতনের পরও গেরিলাদের কোন তথ্যই বের করতে পারেনি পাকিস্তানিরা। তখন তাঁদের হাতে অপশন আরেকটি। ২৮ আগস্ট রাতে ইস্কাটন থেকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আব্দুস সামাদকে ধরেছিলেন গেরিলারা। ফরিদের মাধ্যমে পাকিস্তানিরা জানতে পারে সামাদ ক্র্যাকপ্লাটুনের গেরিলা। তাঁকেও টানা দুইদিন ভয়ঙ্কর টর্চার করে পাকিস্তানিরা। একপর্যায়ে সামাদ অসহনীয় নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে স্বীকার করেন।
.তখন তার তথ্যের ভিত্তিতে ২৯/ মগবাজারের বাড়িতে অভিযান চালায় পাকিস্তানিরা। উদ্দেশ্য আজাদ, জুয়েল, কাজী কামালকে ধরা। রাত ২টার দিকে অপারেশনের সময় কাজী কামাল এক পাকিস্তানি সেনার থেকে অস্ত্র কেড়ে নিয়ে গুলি করে ভাগ্যক্রমে পালিয়ে যেতে পেরেছিলেন। । গুলিবিদ্ধ হয়ে সেখান থেকে সেখানে পড়ে ছিলেন আজাদের খালাতো ভাই ফেরদৌস আহমেদ জায়েদ, টগর ও গোলাম গাউসে আজম।
.সেদিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শহীদ আজাদের খালাতো ভাই গোলাম গাউসে আজম আমাকে বলেছিলেন, ‘রাত দুইটার দিকে পাকিস্তানী বাহিনী রেইড করে আমাদের বাড়িতে। আজাদদা, কাজীদা, জুয়েল এবং বাশার তাস খেলছিলো। আমরা সবাই তখন ঘুমিয়ে গিয়েছিলা। দরজা ভেঙে তারা আমাদের ঘুম থেকে তুললো। এরপর তারা আজাদদাকে খুঁজছিলো। আর বলছিলো ‘আজাদ কাহা হে? তুম আজাদ হে বলে আজাদদাকে ধরতেই তিনি মাগফার উদ্দিন চৌধুরী তাঁর আসল নাম বললেন। তখন ক্যাপ্টেন বোখারি বললো, তুমি মিথ্যা বলছো। তুমিই আজাদ।
.এসময় তারা স্টোর রুমে ফসফরাস পেল, পেয়েছিলো একটি থ্রি টু পিস্তল। পিস্তল পেয়ে তারা আমাকে গালি দিয়ে জিজ্ঞেস করলো এটি কি। আমি বললাম ‘আমি জানিনা।’ তখন আমাকে ঘুষি মারলো। আমি তীব্র ব্যথায় বসে পড়লাম। তখন বাম পায়ের বুটের আঘাত করলে আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। তারপর আমাকে একটানা নির্যাতন করলো। আজাদ দাদাকে যখন পাকিস্তানী মেজর সরফরা ঘুষি মারলো তখন কাজী দাদা স্টেনগান থাবা দিয়ে নিয়ে ধস্তাধস্তি শুরু করে ব্রাশ ফায়ার করে পালিয়ে যায়।
.এরপর আজাদ দাদা, জুয়েলদা সহ বাকি সবাইকে আটক করে গাড়িতে তুলে ফেললো। এরপর আমার হাত ধরে বললো তুম চল। তখন আম্মা পাকিস্তানী মেজরকে বললো, তুমি কাকে নিয়ে যাচ্ছো। আমার দুই ছেলে এখানে গুলিবিদ্ধ। একটাকে অন্তত রেখে যাও। তখন তাদের তাড়া থাকায় তারা আমাকে রেখে চলে গেল।’
.এদিন রাতে পাকিস্তানিরা এলিফ্যান্ট রোডের বাসা থেকে আটক করেছিল ক্র্যাকপ্লাটুনের মুক্তিযোদ্ধা মাসুক সাদেক চুল্লু, পুরনো পল্টনের বাসা থেকে গ্রেফতার হয়েছিলেন আজিজুস সামাদ। অন্যদিকে মালিবাগের বাসা থেকে গ্রেফতার হয়েছিলেন শামসুল হক আর ফার্মগেটের বিমানবন্দর সড়ক থেকে ধরা পড়েছিলেন আবুল বাসার।’ এই অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর মেজর সরফরাজ ও ক্যাপ্টেন বোখারি।
.সেদিন রাতে এলিফ্যান্ট রোডের ‘কণিকা’ বাড়ি থেকে আটক করা হয় শাফী ইমাম রুমি, সাইফ ইমাম জামি, শরীফ ইমাম সহ বাড়ির সকল পুরুষ সদস্যকে।
শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তাঁর ৭১ এর দিনগুলি গ্রন্থে লিখেছিলেন সেই রাতের বর্ণনা।’ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ নিচে গেটে ধমাধম শব্দ আর লোকের গলা শুনে চমকে জেগে উঠলাম। বাড়ির সামনের পুবদিকের জানালার কাছে উঁকি দিয়ে দেখি সর্বনাশ! সামনের রাস্তায় মিলিটারি পুলিশ। উত্তর দিকের জানালা দিয়ে দেখলাম আমার পুরো বাগান ভরে মিলিটারি পুলিশ দাড়িয়ে আছে। অর্থাৎ বাড়িটা একবারে চারদিক দিয়ে ঘিরে ধরেছে…।
.দু’জনে পুবদিকের ছোট বারান্দায় বেরোলাম। শরীফ বলল, ‘কে ডাকেন? কি চান?’ নিচে থেকে কর্কশ গলায় উর্দুতে কেউ বলল, ‘নিচে এসে দরজা খুলুন। এত দেরি করছেন কেন?’ শরীফ আবার বলল, ‘ঘুম ভাঙতে দেরি হয়েছে। এত রাতে কি দরকার?’ এবার অন্য একজন একটু মোলায়েমভাবে উর্দুতে বলল, ‘বিশেষ কিছু নয়। দরজা খুলুন…।
.একজন খুব অল্পবয়সী আর্মি অফিসার দাড়িয়ে আছে, তার পাশে ও পেছনে তাগড়া চেহারার অনেকেই। আমি কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম, ‘হোয়াট ক্যান উই ডু ফর ইউ?’ অফিসারটি হাত তুলে সালাম দেবার ভঙ্গি করে ইংরেজিতে বলল, ‘আমার নাম ক্যাপ্টেন কাইয়ুম। তোমাদের বাড়িটা একটু সার্চ করব। আমি বললাম, ‘কেন, কি জন্য?’ ‘এমন কিছু না। এই রুটিন সার্চ আর কি। তোমাদের বাড়িতে মানুষ কয়জন? কে কে থাকে?’ আমি বললাম, ‘আমি, আমার স্বামী, শ্বশুর, দুই ছেলে, ভাস্তে।’ ‘ছেলেদের নাম কি? ‘রুমী, জামী’। ওরা এগিয়ে এলো…।
ক্যাপ্টেন কাইয়ুমের সঙ্গে ওই সুবেদার আর তিন-চারজন সশস্ত্র এম.পি, ঘরের ভেতরে ঢুকল…। জিগ্যেস করলাম, ‘কেন, ওদের নিচে যেতে বলছ কেন?’ ক্যাপ্টেন কাইয়ুম বলল, ‘কিছু না, একটুখানি রুটিন ইন্টারোগেশান করব।’
শরীফের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘আপনিও নিচে আসুন।’ ওদের সঙ্গে সঙ্গে আমিও নিচে নেমে এসে দেখলাম রুমী, জামী, মাসুম আর হাফিজ পোর্চে দাড়িয়ে আছে। ক্যাপ্টেন কাইয়ুম পোর্চে এসে শরীফকে বলল, ‘এটা আপনার গাড়ি? চালাতে পারেন?’ শরীফ ঘাড় নাড়লে সে বলল, ‘আপনি গাড়ি চালিয়ে আমাদের সঙ্গে আসুন।’ আমি ভয় পেয়ে বলে উঠলাম, ‘কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?’ ক্যাপ্টেন কাইয়ুম শান্ত মৃদুস্বরে বলল, ‘এই তো একটু রমনা থানায়। রুটিন ইন্টারগেশান। আধঘন্টা পৌনে একঘন্টার মধ্যেই ওরা ফিরে আসবে।’ ক্যাপ্টেনের ইঙ্গিতে কয়েকজন পুলিশ গাড়ির পেছনে উঠে বসল। আমি ব্যাকুল হয়ে বলে উঠলাম, ‘আমিও যাব আপনাদের সঙ্গে।’
শরীফ এতক্ষণ একটাও কথা বলেনি, এবার আমার চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলল, ‘তুমি থাক। বাবা একলা।’ তবু আমি বলতে লাগলাম, ‘না, না, আমি যাব।’ তাকিয়ে দেখলাম কয়েকজন পুলিশ রুমী, জামী, মাসুমদের হটিয়ে রওনা হয়ে গেল। ক্যাপ্টেন কাইয়ুম শরীফের পাশের সিটে উঠে বসল। শরীফ গাড়ি ব্যাক করে বেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।’
একই সঙ্গে সেদিন শেষরাতে ঘুম থেকে তুলে ২০ নিউ ইস্কাটন রোডের বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয় গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ হাফিজুর রহমানকেও। ইস্কাটনের আরেকটি বাড়ি থেকে আটক হন আবু বকর।
.৩০ আগস্ট সাত সকালে পাকিস্তানী সেনারা রাজারবাগের ৩৭০ আউটার সাকুলার রোডের বাসা থেকে আটক করে সুরকার ও মুক্তিযুদ্ধ সংগঠক আলতাফ মাহমুদ, আবুল বারাক আলভী, লিনু বিল্লাহ, দিনু বিল্লাহ, নুহে আলম বিল্লাহ, খাইরুল আলম বিল্লাহ সহ মোট ছয়জনকে।
ক্র্যাকপ্লাটুনের মুক্তিযোদ্ধা ও শিল্পী আবুল বারাক আলভী আমাকে বলেছিলেন, ‘আলতাফ ভাইয়ের বাসায় ঢুকতেই তাঁরা বললো ‘মিউজিক ডিরেক্টর সাব কৌন হ্যায়?’ আলতাফ ভাই বললেন, ‘আমি’। তখন তাঁকে মারতে মারতে মাটি খুঁড়ে বেড় করা হয়েছিলো অস্ত্র। মার্শাল কোর্টে যখন তাঁকে তোলা হলো তখন তাঁর মধ্যে কোন ভাবান্তর ছিলোনা। অথচ আমরা সবাই ভীষণ আতংকিত। তিনি যেন বুঝেই গিয়েছিলেন তাঁর গন্তব্য। আলতাফ ভাই বলেছিলেন, ‘ আমার সঙ্গে যারা এসেছে, আমি ছাড়া আর কেউই অস্ত্রের ব্যাপারে কিছু জানে না।’ তিনি সবাইকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন।’
.ক্র্যাকপ্লাটুনের গেরিলা ইশতিয়াক আজিজ উলফাত আমাকে বলেছিলেন,২৯ আগস্ট রাতে ও ৩০ আগস্ট সকালে ঢাকা শহরে গেরিলাদের ধরতে মোট ৪৪টি বাড়িতে অভিযান চালিয়েছিলো পাকিস্তানী বাহিনী। আটক করা হয়েছিলো ১৫/২০ জন গেরিলা ও ৪০ জনের মতো গেরিলাদের স্বজনকে। আটককৃত সবাইকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তেজগাঁও নাখালপাড়ার ড্রাম ফ্যাক্টরি সংলগ্ন এমপি হোস্টেলের মিলিটারি টর্চার সেলে। এখানে দুইটি কক্ষে চরম পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হয় আটককৃত গেরিলাদের।
টর্চার সেলে কেমন নির্যাতন করা হয়েছিলো আমাকে বলেছিলেন আবুল বারাক আলভী ও লিনু বিল্লাহ।ভাগ্যক্রমে টর্চার সেল থেকে ফিরে আসা লিনু বিল্লাহ আমাকে বলেছিলেন,
একজন করে ডাকছে, প্রতিজনের জন্য সময় নির্ধারিত ১৫-২০ মিনিট। এর মধ্যে তারা যা যা জিজ্ঞেস করবে তার পুরোপুরি জবাব দিতে হবে। প্রথমেই সহযোদ্ধাদের নাম, আর্মসের সন্ধান জানতে চাইল। যতবার অস্বীকার করা হবে, নির্যাতনের মাত্রা ততটাই বাড়বে। আমাদের ৪ ভাইয়ের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালাল। প্রথমে ৫ জন মিলে শরীরের পেছন দিকে গজারি লাঠি দিয়ে পেটাত। ওটার আঘাত যে কতটা তীব্র ছিল তা একটু বলি। ছাড়া পাওয়ার ২ বছর পর্যন্ত আমি উঠতে পারতাম না। এক প্রকার অবশ ছিলাম। শরীর নিস্তেজ হয়ে এলে নখের মধ্যে কাঁচি ঢুকিয়ে দিত। রশি ছিল, রশিতে ২ হাত উঁচু করে বেঁধে পেটাত। প্লাস দিয়ে নখ উপড়ে ফেলে হাতের ওপর অবিশ্রান্ত বেতের বাড়ি চলত। যখন পালা শেষ হয়ে যেত, তখন আবার একজন একজন করে টর্চার সেলে ঢোকানো হতো।. ‘হাফিজ ভাইয়ের সঙ্গে আমার সর্বশেষ দেখা হয়েছিলো টর্চার সেলে। তাঁর উপর এতোটাই টর্চার করা হয়েছে যে তাঁর দুচোখ বের বেরিয়ে গেছে। সারা শরীরে পৈশাচিক নির্যাতন চিত্র। তিনি বারবার বলছিলেন তোমরা আমাকে গুলি করো তাহলে আমি বেঁচে যাই। এরপরেও তিনি কোন তথ্য স্বীকার করেননি। আমার বোধহয় এরপর উনি আর আধা ঘণ্টা হয়তো বেঁচে ছিলেন।’
আবুল বারক আলভী আমাকে বলেছিলেন, ‘নির্যাতনের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে কেউ দাঁতে দাঁত চেপেও সহ্য করতে পারেনি। যেমন সামাদও একই। মার খেতে খেতে একটা পর্যায়ে আমার এমন হয়েছিল যে, ওরা পেটাচ্ছিল কিন্তু আর অনুভুতি কাজ করছিল না। ২ হাতসহ পুরো শরীরেই রক্ত জমাট বেঁধে গেছে। ২ হাত দিয়ে টপটপ করে রক্ত ঝরছে।’
লিনু বিল্লাহ আমাকে সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আলতাফ ভাই আর জুয়েলকে আমি ১ তারিখ পর্যন্ত দেখেছি। বদি আর হাফিজ ভাইকে ৩১ তারিখের পর আর দেখিনি। হাফিজ ভাই বোধহয় সেদিনই শহীদ হলেন। বাকের, আজাদ, রুমিসহ যারা নিখোঁজ হলো তাদের ৩১ তারিখের পর আর দেখিনি। একটা ঘটনা মনে পড়ছে। ৩০ তারিখের কথা। টর্চার সেলে বদিকে এতটাই টর্চার করেছিলো যে বদির পুরো শরীর রক্তে ভেজা। হঠাৎ বদি দৌড় দিলো যেন ওকে পেছন থেকে গুলি করে মেরে ফেলে। কিন্তু তা হয়নি। কিছুটা গিয়েই বদি পড়ে গেল।তখন বদিকে ধরে নিয়ে এসে আমাদের রুমে রাখল। তখন ওরা বদিকে বলছিল, ‘তুমি ভাগতে চাও? তোমাকে তো গুলি করে মারব না, টর্চার করেই মারব।’
কিন্তু গেরিলাদের আর কেউই প্রচণ্ড নির্যাতন সহ্য করেও স্বীকার করেননি সহযোদ্ধাদের কারো নাম। বিনিময়ে বেশীরভাগ গেরিলা ও গেরিলাদের স্বজনেরা ফিরে আসতে পারলেও গেরিলা সহ মোট ১০ জন কখনোই আর ফিরে আসতে পারেননি।
ধারনা করা হয় ভয়ঙ্কর নির্মম নির্যাতনের পড় ৩১ আগস্ট থেকে ৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অজ্ঞাত স্থানে তাঁদের হত্যা করা হয়। যারা ফিরে আসতে পারেননি তাঁরা হলেন শহীদ বদিউল আলম বদি বীর বিক্রম, শহীদ মাগফার উদ্দিন চৌধুরী আজাদ বীর বিক্রম, শহীদ আবদুল হালিম জুয়েল বীর বিক্রম, শহীদ শাফী ইমাম রুমী বীর বিক্রম, শহীদ সৈয়দ হাফিজুর রহমান, শহীদ আবু বকর বীর বিক্রম, শহীদ আলতাফ মাহমুদ। শহীদ সাংবাদিক আবুল বাশার, শহীদ সেকান্দার হায়াত খান ও শহীদ মনোয়ার।
এখানে শহীদ সেকান্দার হায়াত খান ও শহীদ মনোয়ার ছবিটি নেই। তাঁদের ছবি পাইনি। এই ছবিতে থাকা নিখোঁজ বাকি আট গেরিলা হলেন উপর থেকে বাম থেকে ডানে শহীদ বদিউল আলম বদি বীর বিক্রম, শহীদ আবদুল হালিম জুয়েল বীর বিক্রম, শহীদ আবু বকর বীর বিক্রম, শহীদ মাগফার উদ্দিন চৌধুরী আজাদ বীর বিক্রম, শহীদ সাংবাদিক আবুল বাশার, শহীদ শাফী ইমাম রুমী বীর বিক্রম, শহীদ সৈয়দ হাফিজুর রহমান, ও শহীদ আলতাফ মাহমুদ।
চুয়ান্ন বছর আগে ঠিক আজকের রাতেই ধরা পড়েছিলেন ক্র্যাকপ্লাটুনের দুঃসাহসিক সেই গেরিলারা। তাঁদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।