৩০ আগস্ট ১৯৭১ সাল। আমাদের পরিবারে নেমে এলো এক ভয়ঙ্কর বীভৎস ঘটনা-এক নিমিষে সবকিছু ওলটপালট হয়ে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক বিরল ঘটনার জন্ম দেয়। তখনো ফুটফুটে অন্ধকার, সকালের অরুণ আলোর অপেক্ষায় প্রকৃতি। রাজারবাগ পুলিশ লাইনের মসজিদের চিরপরিচিত সুললিত কণ্ঠে মুয়াজ্জিনের ফজরের আজান শেষে আবার ঘুমিয়ে পড়া। নিস্তব্ধ ঢাকা শহরের ৩৭০ আউটার সার্কুলার বাড়িটিও নিঝুম ঘুমে। মা নামাজ শেষে গুনগুন করে কোরআন শরীফ পড়ছেন আর পাশের ঘরে প্রতিদিনের রেওয়াজ করার জন্য মৃদু সুরে ভৈরবীতে গলা সেধে চলেছে আমাদের সবার ছোট মণি শিমুল বিল্লাহ। পশুদের বুটের আওয়াজে মা আর শিমুলের অস্ফুট চিৎকার। ওদের চিৎকারে ঘুমিয়ে থাকা সবাই উঠে গেল। বেশ কয়েকটি ট্রাক আর জিপে করে আসা পাকসেনারা পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে। আমাদের বাসাটি মিলিশিয়া বাহিনীর সেনা দ্বারা অবরোধ করে ফেলেছে। ফোন লাইন কাটা, পালাবার কোনো পথ খোলা নেই। আমাদের সবার ধারণা, তিন দিন আগে ভাই মেওয়া বিল্লাহ আর বোন মিনু বিল্লাহ সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য আগরতলার মেলাঘরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। ওরা নিরাপদে পৌঁছে যাওয়ার পর আলতাফ ভাইসহ আমরা অন্য ভাইরা পালাক্রমে চলে যাব। আলতাফ ভাই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের জন্য কিছু গান টেপ করে নিজে বহন করে চলে যাবেন সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। ওরা কি পথে ধরা পড়ে গেছে, নাকি ওরা যে ভারতের মেলাঘরে চলে গেছে তার খবর পেয়ে আমাদের বাড়ি ঘেরাও করেছে? কে জানত তার চেয়েও আরও ভয়াবহ বীভৎস দৃশ্য আর ইতিহাসের বর্বরতম ঘটনা জানা হতে যাচ্ছে।
একজন মেজর অথবা ক্যাপ্টেনমার্কা অফিসার হুঙ্কার দিয়ে বলল, আলতাফ মাহমুদ কোন হ্যায়? আলতাফ ভাই এগিয়ে এসে বললেন- ম্যায় আলতাফ হু। বলার সাথে সাথেই মেজর পিস্তলের ডাঁট দিয়ে মাথায় প্রচন্ড আঘাত করলে আলতাফ ভাই এক নিমিষে মাটিয়ে লুটিয়ে পড়েন। মেজরের নির্দেশে কয়েকজন আর্মি আলতাফ ভাইকে ঘিরে ফেলে পেটে এবং ঘাড়ের উপর বন্দুকের বাঁট দিয়ে আঘাত করতে করতে ড্রয়িং রুম দিয়ে সামনে বারান্দায় নিয়ে গেল। আমাদের চার ভাই এবং আবুল বারাক আলভিকে পিঠমোড়া করে বন্দুকের ডাঁট দিয়ে মারতে মারতে বাড়ির সামনে দেয়ালের পাশে কাঁঠাল গাছের নিচে লাইন করে দাঁড় করে রাখে। পাশের বাসা এবং আমাদের দোতলা থেকেও কয়েকজন যুবককে লাইনে এনে দাঁড় করায়। গত রাতে আলভি মেলাঘর থেকে এসেছে খালেদ মোশাররফের বার্তা নিয়ে- আলতাফ মাহমুদ যেন অতি তাড়াতাড়ি মেলাঘরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে পড়েন।
এদিকে আলতাফ ভাইকে আলাদা করে মেজরের জেরার পর জেরা- মাল কাহা, হাতিয়ার কাহা? আলতাফ ভাই বেশ জোরে জবাব দিল-জানি না। এমনি রাইফেলের বাঁট দিয়ে সজোরে আঘাত করল পেটে। যন্ত্রনায় কুঁকড়ে পরে গেলেন তিনি। সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কিছু না পেয়ে এরপর তারা যাকে হাজির করলো- আমরা সবাই চমকে উঠলাম।
দুজন জওয়ান ধরাধরি করে আলতাফ ভাইয়ের সামনে দাঁড় করাল একজনকে। প্রথমে চেনা যাচ্ছিল না। মনে হলো ওর উপর প্রচন্ড অত্যচার হয়েছে। প্লাটুন কমাণ্ডার সামাদ ভাই। সামাদ ভাইও ধরা পড়ে গেছেন? আলতাফ মাহমুদের সামনে সামাদ ভাইকে দাঁড় করিয়ে মেজর জিজ্ঞাসাবাদ করলো। সামাদ ভাই স্বীকারোক্তি দিল। যে রেখে গেছে সেই সব বলে দিল। আমরা বুঝলাম- সব শেষ হয়ে গেল। মেজর এবার আলতাফ ভাইয়ের মাথায় পিস্তল ধরে বলল- দশ গোনার ভেতর অস্ত্রের সন্ধান না দিলে সবাইকে মেরে ফেলবে।
আলতাফ এবার ধীর পায়ে পাশের বাড়ির দেয়াল ঘেঁষা কাঁঠাল গাছের নীচে শান বাঁধানো হাউজের নীচে অস্ত্রের সন্ধান দিলেন। তাঁকেই নির্দেশ দিলো অস্ত্রগুলো উত্তোলনের। রক্তাক্ত দেহে অস্ত্র ভর্তি চারটি ট্রাঙ্ক তুললেন তিনি, আমাদেরকে দিয়ে সেগুলো তোলানো হলো আর্মি জীপে। এবার আমাদের সবাইকে জিপে তুলে নিয়ে গেল এমপি হোস্টেলে মিলিশিয়া বাহিনীর হেডকোয়ার্টারে। আমাদেরকে দিয়েই অস্ত্রের ট্রাঙ্কগুলো নামিয়ে সেগুলোর সামনে দাঁড় করিয়ে আমাদের ছবি তুলল।
প্রথম থেকেই আলতাফ মাহমুদকে আলাদা করে ফেলা হয়। ঘন্টা দুয়েক দাঁড় করিয়ে প্রত্যেকের নাম লিস্ট করে। আমরা চার ভাই ও আলভিকে ধরে চারতলা স্টাফকোয়ার্টারের নিচে একটা ছোট রান্না ঘরে ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। অন্ধকার রান্না ঘরে হুড়মুড় করে কয়েকজনের ওপর পড়লাম। দশ ফুট বাই দশ ফুট ঘরের ভেতর ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ জন,মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহে নানা বয়সের লোকজনকে ধরে এনেছে। অনেকেই বিড়বিড় করে দোয়া-দরুদ পড়ছেন। এখানে পাকিস্তান আর্মি ছাড়াও ভারত থেকে আগত বিহারী রিফ্যুজিরা ছিলো। আমাদেরকে আনার পরই ওরা উল্লাস করলো, অশ্লীল গালি দিয়ে স্বাগত জানালো। কিছুক্ষন পর একএকজন করে নাম ডেকে পাশের ঘরে নিয়ে যাওয়া শুরু করলো আর শুনা যেতে থাকলো শুধু চিৎকার আর আর্তনাদের কান্না।আমার আগে তিন ভাইয়ের ডাক পড়ে, ওদের আর্ত চিৎকারে আমি দুহাতে কান চেপে ধরি। এরপর আমার ডাক আসে। প্রথমে একটা গালি দিয়ে শুরু করল। ‘শালা বানচোৎ মুক্তি হ্যায়’। এরপর এলোপাতাড়ি পিটাতে পিটাতে মাটিতে ফেলে দিয়ে দুজন উপুড় করে পা টেনে ধরে দুদিকে। কাঁধ থেকে পা পর্যন্ত মাংসপেশীতে কসাইয়ের কোপানোর স্টাইলে পেটানো। সুবেদার মেজর সফিক গুল এসে চুল ধরে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করল- আওর হাতিয়ার কাহা? বললাম- জানি না। সাথে সাথে ঘুষি। ছিটকের দেয়ালের গায়ে পড়লাম। আবার টেনেহিঁচড়ে দাড় করিয়ে জিজ্ঞেস করল- ‘তুম তো মুক্তি হো, তোমহারা বাল ইতনা বড়, মুক্তি কা বাল বড় হোতা হ্যায়?’ এসব বলতে বলতে আমার চুল ধরে টেনে হিঁচড়ে পাশের রুমে নিয়ে ফেলে দিল। এখানে শুরু হলো আবার জেরা। প্রথমে নাম জিজ্ঞেস করে বলল- তুম মুসলমান হায়, মুসলমান বানচোৎ কলমা বুলাও। আমি কলেমা বলার পর নির্দেশ দিল- পাতলুন উতারো। খুলে ফেললাম, একেবারে উলঙ্গ। ভালো করে দেখে বলল- উছকি খৎনা হুয়া। এবার আরেক অফিসার শুরু করল নতুন জেরা- কবে ভারত গিয়েছি, কী প্রশিক্ষন নিয়েছি, অস্ত্র কোথায়? যতোবার না বলি- ততোবার নির্যাতন। প্রচন্ড এক লাথি এবং থাপ্পড়ে আমার কানের কানের পর্দা ফেটে রক্ত ঝরতে লাগল। কোন কথা বের করতে না পেরে আবার পাঠাল রান্নাঘরে।
রান্নাঘরে এমন কেউ নেই যার উপর নির্যাতন হয়নি। কয়েকজনকে দেখে মনে হলো বেশ সম্ভ্রান্ত পরিবারের।অত্যাচারে ঠোঁট মুখ ফুলে গেছে। পরনের কাপড়ে রক্তের চিহ্ন। পরে জানতে পারলাম, শরীফ ইমাম, জাহানারা ইমামের স্বামী এবং অল্প বয়সের ছেলেটির নাম জামী। রুমি ধরা পড়ে যাওয়ার পর ওদের বাসায় রেইড করে পিতাপুত্রকে ধরে এনেছে। বিকেলের দিকে দ্বিতীয় রাউন্ডে আবার জেরা, আবার টর্চার। একটা সেলের ভেতর ঢুকিয়ে মাথার উপর এবং চারদিক থেকে সার্চলাইটের মত আলো জ্বালিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ। মনে হলো আমার চুলগুলো পুড়ে যাচ্ছে, শরীর থেকে ঘাম ঝরছে।ক্যাপ্টেন আদেল শাসিয়ে গেল, আজ রাতে ডেমরা বাঁধের উপর নিয়ে ব্রাশফায়ার করে মেরে ফেলবে।
রাত ৯-১০টার দিকে সবাইকে লাইন বেঁধে দাঁড় করিয়ে বাসে তুলল। সেই রাতে রাখল রমনা থানার হাজতে। পরদিন সকালে আবার স্টাফ কোয়ার্টার, আবার একই কায়দায় জেরা, নির্যাতন। সকাল, বিকেল দুবার। রাতে আবার রমনা থানা হাজত। হাজতে আলতাফ ভাই ছাড়াও জুয়েল, বদি, হাফিজ ভাই, চুল্লু ভাই, রুমি, আজাদ প্রমুখ। ভালো ক্রিকেটার জুয়েলকে আগেই চিনতাম, হাফিজ ভাই প্রায়ই বাসায় আসতেন আলতাফ মাহমুদের কাছে। দ্বিতীয় রাতে বদিকে দেখলাম না। বীর মুক্তিযোদ্ধা বদিকে ওরা নির্যাতন করে মেরে ফেলে। পরপর চার রাত আমাদের রমনা থানায় রাখা হয়। চতুর্থ রাতে রুমী, জুয়েল, আজাদকে আর দেখলাম না।
শেষ রাতের পরের সকালে আবার স্টাফ কোয়ার্টার। আমাদের যে রুমে রাখা হলো তার পাশে পরপর তিনটি রুম। মাঝখানে খোলা চত্বর। প্রতিদিনের মত রুটিন জেরা আর নির্যাতন। আলতাফ ভাইয়ের উপর অমানুষিক নির্যাতনের সময় আমরা তাঁর চিৎকার আর গোঙানির শব্দ শুনতাম। এই কন্ঠ আমাদের চেনা। সকাল ১০টা/১১টার দিকে এক সেপাই আমার চুল ধরে পাশের বাথরুমে ঠেলে ভরে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। সেখানে দেখি পরপর তিনটি দেহ লাশের মত পরে আছে।সব শোয়া, আধমরার মত। হাফিজ ভাই আর আলতাফ ভাই, অন্যজনকে চিনতে পারিনা। এত অত্যাচার করেছে, চেনার উপায় নাই। আলতাফ ভাইয়ের কপালে হাত রেখে দেখলাম জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে।ভেজা বাথরুমে শোবার জায়গা শুকিয়ে গেছে। ওদের এই অবস্থা দেখে আমার যন্ত্রনার কথা ভুলে গেলাম। মনে হলো- এই তিনটি প্রাণের বেঁচে থেকে লাভ নেই। মৃত্যুই ওদের জন্য শ্রেয়। মৃত্যুই ওদের শান্তি আর প্রশান্তি বয়ে আনবে।
ঘন্টাখানেক পর সেই সেপাই আমাকে হেঁচড়ে বারান্দায় নিয়ে বুট দিয়ে লাথি মেরে বলল ময়দানে যেতে। সেখানে কর্ণেল হিজাজী নিজে ইন্টারোগেশন করছে। সন্দেহভাজনদের রেখে দিচ্ছে। কাউকে কাউকে কোরান শরীফ ছুঁয়ে শপথ করাচ্ছে পাকিস্তানের জন্য কাজ করতে, তারপর ছেড়ে দিচ্ছে। অনেকটা লটারীর মত আমরা চারভাই এবং আলভি এই দলে পড়ে গেলাম। দুজন সেপাই আমাদের গেটের বাইরে ফেলে দিয়ে আসলো।
হায়েনার খাঁচা থেকে বের হয়ে আসলাম মুক্ত বাতাসে। আকাশের পানে তাকিয়ে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হলো- এ কী করলে আলতাফ ভাই? জীবন বাজি রেখে সব দোষ নিজের কাঁধে বহন করে স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করে আমাদের আর সমগ্র বাঙালি জাতিকে ঋনী করে গেলে। আমি তো এ জীবন চাইনি। আজো আমি এই জীবন মৃত্যু ছায়াকে বহন করে চলছি- আজীবন চলতে হবে। জানি একদিন এ জাতিকে অমৃত সুরের ভাণ্ডার উপহার দিতে অমন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে আসতেই হবে। শহীদ আলতাফ মাহমুদ সময়ের ‘কালপুরুষ’ অনন্তের স্থায়ী নির্দেশক ‘আদম সুরত’। কোরআন আর বেদে পিতৃঋণ শোধ করার কথা আছে। ভ্রাতৃঋণ শোধ করার কথা বলা নেই- আমি এই ভ্রাতৃঋণ কেমন করে শোধ করবো?
[সদ্য প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা দিনু বিল্লাহ’র গ্রন্থ ‘টয় হাউজ থেকে ১৯৭১-মৃত্যু ছায়াসঙ্গী’ বই থেকে সংক্ষেপিত]