মহান বিজয় দিবসে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান ঘিরে একাধিক স্থানে উত্তেজনা তৈরি হলেও সাহস করে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান স্লোগান দিয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। এসব ঘটনার মধ্যে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে এক ছাত্রলীগ কর্মীকে আটক ও পাবনার ইশ্বরদীতে বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে জামায়াতে ইসলামীর কর্মীরা মারধর করে।
গতকাল ১৬ই ডিসেম্বর, মঙ্গলবার সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, পাবনার ইশ্বরদীতে শহিদদের স্মরণে পুষ্পমাল্য অর্পনের সময় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বাঁধা দিলেও তারা সাহস করে এ স্লোগান দেন। সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে কৃষক শ্রমিক জনতা পার্টি’র সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে পুষ্পমাল্য অর্পনের সময় জয় বাংলা স্লোগান দেন।
এরপর ঢাকা জেলা ছাত্রলীগের কর্মীরা জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিতে এলে শেখ শিমন (২১) নামে এক ছাত্রলীগ কর্মীকে আটক করা হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধের ভেতর থেকে তাকে আটক করে আশুলিয়া থানা পুলিশ।
এদিকে পাবনার ঈশ্বরদীতে বিজয় দিবসে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়াকে কেন্দ্র করে মারধরের ঘটনা ঘটে। এ সময় এক বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে মারধর করেন স্বাধীনতাবিরোধীরা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে ঈশ্বরদীতে ‘ভারতীয় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা’দের পক্ষ থেকে আনুমানিক সকাল ১০টার দিকে আলহাজ মোড়ে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় স্তম্ভে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়। এর নেতৃত্বে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন কোম্পানি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী সদরুল হক সুধা। শ্রদ্ধা জানানোর পরপরই উপস্থিত বীর মুক্তিযোদ্ধারা ‘মুক্তিযুদ্ধের হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেকবার’ বলে কয়েকবার স্লোগান দেন। আর এতেই তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে আশপাশে ঘাপটি মেরে থাকা স্বাধীনতাবিরোধিরা।
জানা যায়, বিজয় স্তম্ভের সামনে সারিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা সদরুল হক সুধা ও মুক্তিযোদ্ধা আবুল বাশার বাদশা ছিলেন। স্লোগানের একপর্যায়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা সদরুল হক, আবুল বাশারসহ অন্যরা ‘জয় বাংলা’ বলে স্লোগান দেন। তারা শ্রদ্ধা জানিয়ে চলে যাওয়ার সময় সেখানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীরা এসময় মুক্তিযোদ্ধাদের ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের প্রতিবাদ জানায়। একপর্যায়ে এ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তাদের বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকজনের নাম উচ্চারণ করে তাদের খুঁজতে থাকে সন্ত্রাসীরা। পরে মনোয়ার হোসেন নামে এক বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে কিল-ঘুষি মারে এই দেশবিরোধী রাজাকারের ঊত্তরসূরীরা।
মুক্তিযুদ্ধকালীন ঈশ্বরদী অঞ্চলের কোম্পানি কমান্ডার কাজী সদরুল হক সুধা বলেন, “বীর মুক্তিযোদ্ধারা জয় বাংলা স্লোগান দিতেই পারে। জয় বাংলা স্লোগান তো আওয়ামী লীগ বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের স্লোগান না। এই স্লোগান মুক্তিযোদ্ধাদের স্লোগান। বিজয়ের স্লোগান দেওয়ার পর কতিপয় ব্যক্তি আমাদের একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে লাঞ্ছিত করেছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা।”
কারা হামলা চালিয়েছে জানতে চাইলে সদরুল হক সুধা এ প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান।
অন্যদিকে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এক মুক্তিযোদ্ধা ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিলে তা নিয়ে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠান স্থগিত ঘোষণা করে উপজেলা প্রশাসন।
উপজেলা প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেলা ১১টার দিকে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এতে বক্তব্য দেন বীর মুক্তিযোদ্ধা বছির উদ্দিন। তিনি বক্তব্যের শেষাংশে বলেন, ‘ইতিহাস মোছা যাবে না। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই আমরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম। বঙ্গবন্ধুকেই আমরা মানি, জাতির পিতা হিসেবেই মানি। সেদিন রণযুদ্ধে জয় বাংলা ছাড়া অন্য কোনও স্লোগান কি ছিল? এই বাংলাদেশেই মুক্তিযোদ্ধা থাকবে। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।’
তার বক্তব্য শেষে ‘মুজিববাদ মুর্দাবাদ’ বলে স্লোগান দেয় এনসিপির সন্ত্রাসীরা। জাতীয় যুবশক্তি ময়মনসিংহের সংগঠক আল মামুন, গণ অধিকার পরিষদের মুক্তাগাছা উপজেলার সভাপতি শাহীনুর আলমসহ আরও অন্তত ১৫-২০ জন সন্ত্রাসী সেখানে উপস্থিত ছিল। তারা মঞ্চে উঠে ‘মুজিববাদ মুর্দাবাদ’ স্লোগানে প্রতিবাদ জানাতে থাকলে সে সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কৃষ্ণ চন্দ্র অনুষ্ঠান স্থগিত ঘোষণা করেন।
এদিকে টাঙ্গাইলে সখিপুরে কাদেরিয়া বাহিনীর অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধারা জয় বাংলা স্লোগান দিলেও সেখানে কোন ধরণের উত্তেজনা তৈরি হয়নি।
