২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে সংঘটিত জঙ্গি হামলা ও দাঙ্গা দমনে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় পুলিশ বাহিনী ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। পরবর্তী সময়ে দাঙ্গা-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে একাধিক পরিবর্তন আনে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত। তবে শুরু থেকেই নতুন পোশাকের রঙ ও মান নিয়ে অসন্তোষ ছিল বাহিনীর ভেতরে ও বাইরে।
এখন একাধিক সূত্র বলছে, শত শত কোটি টাকা ব্যয়ের পর পুলিশ আবারও আগের পোশাকে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের যুক্তি ছিল—আগের পোশাক জনমনে বিতর্ক তৈরি করেছিল, তাই বাহিনীর ভাবমূর্তি পুনর্গঠনে রঙ পরিবর্তন জরুরি। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সময় তীব্র আপত্তি ওঠে। শুধু রঙ নয়, নতুন পোশাকের কাপড়ের মান নিয়েও প্রশ্ন তোলে পুলিশ সদস্যদের একটি অংশ।
পুলিশ সূত্রের দাবি, দুজন সাবেক উপদেষ্টা, সাবেক প্রধান উপদেষ্টার এক বিশেষ সহকারী (যিনি পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন) এবং পুলিশের ভেতরের প্রায় এক ডজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার সিদ্ধান্তেই পোশাক পরিবর্তনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন ইউনিটে বাধ্যতামূলকভাবে নতুন পোশাক চালু করা হয়। এ খাতে অন্তত কয়েক শ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে।
একই সূত্রের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রভাবশালী চক্র পুলিশের বিভিন্ন কেনাকাটায় প্রভাব বিস্তার করে আসছে। তাদের পছন্দের ঠিকাদারের মাধ্যমে কাপড় সংগ্রহ ও পোশাক প্রস্তুতের কাজ সম্পন্ন হয়।
অভিযোগ রয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চপর্যায়ের কিছু মহলের সঙ্গে যোগসাজশে এই খাত থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকার পরিবর্তনের পর আবারও আগের পোশাকে ফেরার দাবি জোরালো হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন ইতোমধ্যে বিবৃতিতে বলেছে, আগের পোশাকই বাহিনীর ঐতিহ্য বহন করে। বিবৃতির পর বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনায় এসেছে বলে জানা গেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরও এ বিষয়ে পৃথক বৈঠক করেছে বলে জানিয়েছেন ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা। তার দাবি, আগের পোশাকে ফেরার বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান পোশাক নিয়ে বাহিনীর ভেতরে অসন্তোষের কথাও উঠে এসেছে। অনেক সদস্যের মতে, নতুন ইউনিফর্ম দেখতে বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীদের পোশাকের মতো। কনস্টেবল থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একাংশ মনে করছেন, এতে বাহিনীর স্বাতন্ত্র্য ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং মনোবলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে—এমন তথ্য একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আরও জানান, পোশাক পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় সাবেক সরকারের দুই প্রভাবশালী উপদেষ্টা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করা এক সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছিলেন। পাশাপাশি পুলিশের অন্তত এক ডজন কর্মকর্তা পেছন থেকে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন, যাদের মধ্যে চারজন ইতোমধ্যে অবসরে গেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, তারাই একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। এ সিন্ডিকেট ভাঙার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলকে অবহিত করার প্রস্তুতি রয়েছে।
উল্লেখ্য, বাহিনী সংস্কারের অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের নভেম্বরে পুলিশের পোশাক পরিবর্তন করে ‘লৌহ রঙের’ নতুন ইউনিফর্ম চালু করে। তবে তা চালুর পর থেকেই মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। নতুন পোশাকের সঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও বিভিন্ন বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের পোশাকের সাদৃশ্য নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
বিষয়টি নতুন সরকারের দায়িত্বশীলদের নজরে এসেছে এবং তারা আবারও পুরোনো ইউনিফর্মে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করছেন বলে জানা গেছে।
ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশের নতুন ইউনিফর্ম নির্ধারণে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট রঙের পোশাক সরকার অনুমোদন দেয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত বছরের ১৪ই নভেম্বর থেকে সব মহানগর পুলিশ ‘লৌহ রঙের’ নতুন ইউনিফর্ম পরে দায়িত্ব পালন শুরু করে।
পর্যায়ক্রমে দেশের জেলা পর্যায়ের পুলিশও একই ইউনিফর্ম ব্যবহার শুরু করে। তবে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ও স্পেশাল প্রটেকশন ব্যাটালিয়নের (এসপিবিএন) ক্ষেত্রে আগের পোশাক বহাল রাখা হয়।
ইউনিফর্ম চূড়ান্ত হওয়ার পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, পুলিশ, র্যাব ও আনসার বাহিনীর জন্য নতুন পোশাক নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে এবং এর মাধ্যমে বাহিনীর আচরণ-আচরণেও পরিবর্তন আনতে হবে।
তবে বাস্তবে পোশাক পরিবর্তনের পরও পুলিশের আচরণে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি—এমন অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
সমালোচকদের মতে, নতুন পোশাকে অনেক সদস্যকে বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীর মতো দেখায়; সাধারণ মানুষ অনেক ক্ষেত্রে তাদের পুলিশ হিসেবে সহজে চিহ্নিত করতে পারছে না।
পুলিশের ইউনিফর্ম পরিবর্তনের পর নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞরা মত দেন—শুধু পোশাক বদলালেই কাঙ্ক্ষিত সংস্কার সম্ভব নয়। সদস্যদের মানসিকতা, পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতায় পরিবর্তন না আনলে কেবল রঙ পরিবর্তনে কার্যকর ফল মিলবে না। অতীতেও একাধিকবার ইউনিফর্ম পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু বাহিনীর কাঠামোগত বা আচরণগত রূপান্তর তেমন দৃশ্যমান হয়নি—এ কথাও তারা স্মরণ করিয়ে দেন।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নুর মোহাম্মদ বলেন, কেবল পোশাকের রঙ বদলালেই চলবে না; মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। তার মতে, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে পুলিশকে সরাসরি জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে।
তিনি মনে করেন, আগের ইউনিফর্মেই বাহিনীর ঐতিহ্য নিহিত রয়েছে এবং পোশাক দিয়ে মনমানসিকতা বদলায় না। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো পেশাগত প্রশিক্ষণ জোরদার ও স্বাধীনভাবে কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে পুলিশের মনোভাবেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
