বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যয় নিয়ে “পাশের দেশে ১৪ হাজার কোটি টাকায় হয়, রূপপুরে ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি” বলে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা তথ্যগতভাবে ভুল ও বিভ্রান্তিকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।
বিস্তারিত বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিনি ভারতের কুডাঙ্কুলাম প্রকল্পের সঙ্গে রূপপুরের তুলনা করে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি প্রকল্পকে এক করে উপস্থাপন করেছেন।
রূপপুর বনাম কুডাঙ্কুলাম: মৌলিক পার্থক্য
১. প্রযুক্তির তারতম্য
রূপপুরে ব্যবহৃত হচ্ছে রাশিয়ার অত্যাধুনিক তৃতীয় প্রজন্মের (Generation III+) VVER-1200 রিঅ্যাক্টর। এটি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ ও উন্নত প্রযুক্তি।
অন্যদিকে, ভারতের কুডাঙ্কুলামের প্রথম দুই ইউনিটে ব্যবহৃত হয়েছে দ্বিতীয় প্রজন্মের VVER-1000 রিঅ্যাক্টর। প্রযুক্তিগত উন্নততা, নিরাপত্তা স্তর ও দক্ষতায় VVER-1200 অনেক এগিয়ে।
২. প্রকল্পের ধরন ও সুযোগ-সুবিধা
রূপপুর একটি পূর্ণাঙ্গ টার্নকি প্রকল্প। রোসাটম শুধু প্ল্যান্ট বানিয়ে দিচ্ছে না, বরং:
ডিজাইন
সরঞ্জাম সরবরাহ ও ইনস্টলেশন
কমিশনিং
কর্মীদের প্রশিক্ষণ
প্রথম তিন বছরের পূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ
সবকিছু এই চুক্তির আওতায়। বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুতে শূন্য থেকে শুরু করেছে বলে এসব সেবা চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হয়েছে।
কুডাঙ্কুলামে ভারত পারমাণবিক শক্তির অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দেশ। তাই ভারত নিজস্ব প্রশিক্ষিত জনবল দিয়ে পরিচালনা করবে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও অনেক কাজ নিজেরাই করছে। জ্বালানি হিসাবে ইউরোনিয়াম সরবরাহের জন্য ভারতের আলাদা চুক্তি রয়েছে। রোসাটম সেখানে মূলত নির্মাণকাজে সীমাবদ্ধ।
৩. ব্যয়ের যৌক্তিকতা
রূপপুরের মোট ব্যয় ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১.৩৯ লাখ কোটি টাকা)। এতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, টার্নকি সুবিধা ও প্রশিক্ষণসহ সবকিছু অন্তর্ভুক্ত। কুডাঙ্কুলামের প্রথম দুই ইউনিট (২০০০ মেগাওয়াট) ২০০২ সালের মূল্যে খরচ হয়েছিল অনেক কম। কিন্তু পরবর্তী ইউনিটগুলোতে খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চুক্তির সময়ের ব্যবধান (১৫ বছরেরও বেশি), মুদ্রাস্ফীতি, প্রযুক্তির উন্নয়ন ও চুক্তির শর্তের পার্থক্যের কারণে সরাসরি তুলনা করা যায় না।
৪. অন্যান্য আন্তর্জাতিক তুলনা
রোসাটমের একই ধরনের আধুনিক VVER-1200 প্রকল্পে:
হাঙ্গেরির Paks II (২৪০০ মেগাওয়াট): ১৩-১৫ বিলিয়ন ডলার
মিশরের El-Dabaa (৪৮০০ মেগাওয়াট): প্রায় ২৮-৩০ বিলিয়ন ডলার
রূপপুরের ব্যয় এসব প্রকল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তারেক রহমান পারমাণবিক প্রকল্পের জটিলতা, প্রযুক্তির তারতম্য, টার্নকি বনাম নন-টার্নকি চুক্তি এবং বাংলাদেশের শূন্য থেকে শুরু করার বাস্তবতা উপেক্ষা করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন। রূপপুর প্রকল্প বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে ঐতিহাসিক মাইলফলক, যা দেশকে নির্ভরযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ সরবরাহে সহায়তা করবে।
(তথ্যসূত্র: রোসাটম অফিসিয়াল চুক্তি দলিল, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সংস্থা IAEA প্রতিবেদন এবং স্বাধীন প্রকল্প বিশ্লেষণ)
