তানভীর আহমেদ
আবারও অস্থির সময়ের মুখোমুখি ব্রিটেন। এই অস্থিরতার শুরু ব্রেক্সিটকে কেন্দ্র করে। কনসারভেটিভের তুখোড় নেতা ডেভিড ক্যামেরনের বিদায়ের পর থেকে নেতৃত্ব সংকটে পড়েছে ব্রিটেন। ক্যামেরনের পর টেরেসা মে, বরিস জনসন, লিজ ট্রাসের পর হাল ধরেছিলেন ঋষি সুনাক; তবুও টোরির পতন ঠেকাতে পারলেন না। ৩৬৫ আসনসহ বিশাল বিজয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হলেন স্যার কিয়ার স্টারমার। ৭ মে স্থানীয় নির্বাচনে ১৫শ কাউন্সিলরের পরাজয়ে ভূমিধস পতনের পর নিজ দলের বিরোধিতার মুখে পড়েছেন স্টারমার। নিজ দলের ক্যাবিনেট মন্ত্রীসহ প্রায় ৮০ এমপি ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনাস্থা জানিয়েছেন। স্টারমারের বিদায় হলে ১০ বছরে ৭ বার প্রধানমন্ত্রী বদল করবে ব্রিটেন। এখন মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে চাইবে না লেবার এমপিরা; নেতা বদলের রোডম্যাপের পথেই হাঁটছে ক্ষমতাসীনরা।
তবে নতুন নেতা এসেই কি ব্রিটেনের নাটকীয় পরিবর্তন করতে পারবে? তাহলে যে এমপি ও মন্ত্রীরা কিয়ার স্টারমারের অপসারণ চাইছেন, তারা গত দুই বছর কী করলেন? একই টিম দুই বছরে পারল না—কিয়ার স্টারমারকে পরিবর্তন করলেই তারা নাইজেল ফারাজকে ঠেকিয়ে দিতে পারবেন—এমন কী যাদুমন্ত্র আছে তরুণ এই রাজনীতিবিদের হাতে? নেতা নির্বাচনে লেবার পার্টি গত এক দশক ধরে ভুল করে আসছে। ডেভিড মিলিব্যান্ডের পরিবর্তে তারা পছন্দ করেছিল এড মিলিব্যান্ডকে। তারপর আমরা দেখলাম জেরেমি করবিনের বদলে ইউনিয়নিস্টরা বেছে নিয়েছিল স্যার কিয়ার স্টারমারকে। সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের পর লেবারের কাছে ভালো অপশন হতে পারত ডেভিড মিলিব্যান্ড অথবা জেরেমি করবিন। কিন্তু দুষ্ট রাজনীতি ভালো নেতাদের সুযোগ দেয়নি, যার ফলাফল লেবার পার্টি ভোগ করছে গত এক দশকের বেশী সময় ধরে।
একই ঘটনা টোরি পার্টিতেও সমানভাবে বিদ্যমান। ডেভিড ক্যামেরনের পর বরিস জনসন বা ঋষি সুনাকই টোরির যোগ্য নেতা ছিলেন; দুইজনের কাউকেই টিকতে দেয়নি অভ্যন্তরীণ কোন্দল। ঋষি সুনাকের পতনের পর আবারও নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়েছে কনসারভেটিভ। এই মুহূর্তে স্যার কিয়ার স্টারমার সরে গেলে লেবারের জন্য সবচেয়ে যোগ্য প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন ম্যানচেস্টারের মেয়র এন্ডি বার্নহাম। কিন্তু এখানেও রাজনীতির মারপ্যাঁচ। এমপি নির্বাচিত না হলে প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না এন্ডি বার্নহাম; তাই উপনির্বাচন ছাড়া এন্ডিকেও এমপি বানানো যাচ্ছে না। লন্ডনের মেয়র স্যার সাদিক খানও জানিয়ে দিয়েছেন লেবার লিডার হওয়ার কোন আগ্রহ নেই তার; তাই এই দুইজন নেতাকে বাইরে রেখেই নতুন নেতার খোঁজ করতে হবে লেবার পার্টিকে। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং অথবা ক্যাথরিন ওয়েস্টের চেয়ে সাবেক ডেপুটি এঞ্জেলা রায়নার এগিয়ে থাকবেন এমপিদের পছন্দের তালিকায়।
তবে দুই বছর পরপর প্রধানমন্ত্রী বদলের এই পরিস্থিতি ব্রিটেনকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দুর্বল করে তুলবে। অর্থনীতির এই ধস ঠেকানো কঠিন হবে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ঠেকানো অসম্ভব—ইউরোপের সাথে বাণিজ্যচুক্তি ও ফ্রি মুভমেন্ট ইস্যুতে সমঝোতা না করলে, পুনরায় ইউনিয়নে না ঢুকলে ব্রিটেনের পতন ঠেকানো মুশকিল হবে। জ্বালানি সংকট ও নিরাপত্তার ঝুঁকি সামলানো ব্রিটেনের একার পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
ইমিগ্রেশন নীতির লাগাম টেনে ধরার বাণী শুনিয়ে নাইজেল ফারাজের উত্থান ব্রিটেনের জন্য সাময়িক ও লোভনীয় অফার মনে হলেও, কার্যত এক ব্যক্তির দল—নাইজেল ফারাজের টিম—১৬ থেকে ১৯ শতাংশ অভিবাসীকে বাদ দিয়ে কোনো পলিসি করে টিকতে পারবে না। এভাবে ইমিগ্রেন্টদের বাদ দিয়ে দেশ চালানোর চিন্তা করলে ইমিগ্রেন্টরা নিজস্ব রাজনৈতিক দল গঠন করে ব্রিটেনের রাজনীতির সমীকরণ বদলে দিতে পারে। টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল তার প্রকৃত উদাহরণ।
এনএইচএস-এর ২১ শতাংশ স্টাফ বিদেশি নাগরিক; যুক্তরাজ্যের ৪২% ডাক্তারের জন্মই বিদেশে; ২৫ শতাংশ কেয়ার ওয়ার্কারের জন্ম ব্রিটেনের বাইরে। ব্রিটেনের ৭০% বিশ্ববিদ্যালয় আর্থিক সংকটে পড়ে দেউলিয়া হয়ে যাবে, যদি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা ব্রিটেনে পড়তে না আসে। তাই নাইজেল ফারাজ ইমিগ্রেশন নিয়ে যা বলছেন, ভোটে জেতার পর আদৌ সেই পলিসি বাস্তবায়ন করতে পারবেন কিনা, সেটি বড় প্রশ্ন। কারণ নাইজেল ফারাজের রিফর্ম ইউকের চেয়ে পুরোনো দল কনসারভেটিভ ও লেবারের বাঘা বাঘা রাজনীতিবিদ ও গবেষকরা শত বছর হিসেব কষে বের করেছেন—ইমিগ্রেন্ট ছাড়া ব্রিটেন অচল। আর একারণেই লেবার ইমিগ্রেশন নিয়ে কঠোর নীতি তৈরি করেও বারবার ইউটার্ন নিচ্ছে। কারণ তারা বোঝে, এই অসম ও বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে ব্রিটেনের বহুজাতিক সমাজব্যবস্থাকে ভেঙে চুরমার করে দেবে।
আর ব্রিটেনের নাদান জনগণের অবস্থা হয়েছে আমাদের জেন-জিদের মতো—তারা হুজুকে মাতে। হুজুকে মেতে ব্রেক্সিট করেছে; হুজুকে মেতে তারা বরিস ও ঋষি সুনাককে বিদায় দিয়েছে; হুজুকে মেতে তারা লেবারের যোগ্য নেতা পছন্দ না করে কিয়ার স্টারমারকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছে; এখন তারা বলছে, কিয়ার স্টারমারকে বিদায় নিতে তারা নাইজেল ফারাজকে প্রধানমন্ত্রী বানাতে চায়! ব্রিটেনের প্রচলিত প্রবাদকে সম্মান জানিয়েই হয়তো কিয়ার স্টারমারের বিদায় হচ্ছে—“ওয়েদার, ওমেন অ্যান্ড উইজডম—থ্রি ডব্লিউ সত্য।”
