মাহবুব জামান
ধন্যবাদ ,সম্মিলিত উদ্যোগ !!! যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বিস্তর। এ পর্যন্ত একজনও পেলাম না যে এই চুক্তিকে ভালো বলেছে।
সম্প্রতি ৪২ টি সামাজিক-সাংস্কৃতিক,মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক, ছাত্র-যুব-শিশু-নারী সংগঠন সম্মিলিতভাবে কিছু অনুষ্ঠান করেছে।
গণহত্যা দিবসে আলোর মিছিল, স্বাধীনতা দিবসে পতাকা মিছিল,পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা দারুন সফল হয়েছে।
শুনেছি এই দেশধ্বংশী চুক্তি নিয়ে তারা এবার সকল সংসদ সদস্যদের জন্য স্মারকলিপি তৈরী করছে। এমনকি কৃষি,শিল্প,স্বাস্থ্য, শিক্ষা,জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে কি কি ক্ষতি হবে তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংগঠন ,ফেডারেশনের সাথেও মত বিনিময় করবে।
তারই প্রস্তুতি হিসাবে তারা ভালো একটা সার্ভে করেছে।
পরিসংখ্যানের ছাত্র হিসাবে তাদের স্যাম্পল সাইজ,
প্রশ্নমালা, বয়স-ধর্ম-লিঙ্গ বিন্যাস, শহর-গ্রাম, পেশা ইত্যাদি বিবেচনা দেখে মুগ্ধ হলাম।
সহজ ভাষায় কোথায় কি প্রভাব পড়বে, সুন্দর করে বলা আছে এখানে। বলা যায় সার্বজনীন আবেদন আছে এই সার্ভেতে।
আমি হুবহু তুলে দিলাম। আপনাদের পর্যবেক্ষণ ও মতামত চাই।
চুক্তি সাধারণত দ্বিপক্ষীয় হয়। এখানে দুই পক্ষ সই করলেও,স্বার্থ শুধু একপক্ষের। শুধু অসম নয়,অন্য পক্ষকে বিকলাঙ্গ ও ধ্বংস করে দেয়ার চুক্তি এটা।সহজ কথায় বললে, আমেরিকার সাথে এই নতুন চুক্তির ফলে সাধারণ মানুষের জন্য ভালো খবরের চেয়ে ভয়ের জায়গাটাই বেশি। এর ফলে দাম বাড়বে,উৎপাদন কমবে, স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়বে।
কেন জিনিসের দাম বাড়তে পারে, তা নিচে দেওয়া হলো:
১. আমেরিকার কৃষকরা সরকার থেকে বিশাল অংকের ভর্তুকি পায়, তাই তারা খুব কম দামে মাংস (গরু, মুরগি) বা দুধ উৎপাদন করতে পারে। যখন এই পণ্যগুলো বাংলাদেশে কোনো শুল্ক ছাড়া ঢুকবে, তখন আমাদের সাধারণ খামারিরা (যারা কোনো ভর্তুকি পায় না) তাদের সাথে দামের লড়াইয়ে টিকে থাকতে পারবে না। শুরুতে এগুলো সস্তা মনে হলেও, এর ফলে আমাদের দেশের সাধারণ খামারিরা লোকসানে পড়ে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে। একবার দেশি খামারগুলো শেষ হয়ে গেলে, পরে আমেরিকান কোম্পানিগুলো তাদের ইচ্ছামতো দামে খাবার বিক্রি করবে।
ডিমের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। আমাদের পোল্ট্রি শিল্প মুখ থুবড়ে পড়বে।
২. পোশাকের দাম: আমরা সাধারণত সস্তা সুতা দিয়ে কাপড় বানাই। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী আমেরিকার বাজারে সুবিধা পেতে হলে আমাদের বেশি দামে আমেরিকার তুলা বা সুতা কিনতে হবে। এই বাড়তি খরচের কারণে সাধারণ মানুষের জন্য জামাকাপড়ের দাম বাড়বে। রপ্তানিক্ষেত্রেও এর বিরূপ প্রভাব পড়বে।
৩. চিকিৎসা খরচ: আমেরিকান কোম্পানির দামি ওষুধ ও চিকিৎসার যন্ত্রপাতি সরাসরি আমাদের বাজারে আসার সুযোগ পাবে। এতে ওষুধের দাম ও হাসপাতালের খরচ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি আছে।
৪. বিদ্যুৎ ও গ্যাস: বাংলাদেশ আগামী ১৫ বছর শুধু আমেরিকার কাছ থেকেই প্রচুর জ্বালানি (গ্যাস) কিনতে বাধ্য থাকবে। বিশ্ববাজারে অন্য কোথাও সস্তায় গ্যাস পাওয়া গেলেও আমরা তা নিতে পারব না। ফলে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম কমার সম্ভাবনা কমে যাবে।
৫. নতুন ট্যাক্স বা কর: সরকার আমেরিকান
৪,৪০০ টি পণ্য থেকে কোনো ট্যাক্স পাবে না। এতে সরকারের কোষাগারে বড় ঘাটতি হবে। সেই টাকা উসুল করতে সরকার সাধারণ মানুষের ওপর অন্য জিনিসের মাধ্যমে বেশি ভ্যাট বা ট্যাক্স চাপিয়ে দিতে পারে
৬. চুক্তিতে ওষুধের মেধাস্বত্ব (IPR) এবং আমেরিকান মানদণ্ড (FDA) সরাসরি গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত সস্তায় জেনিরিক (Generic) ওষুধ বানিয়ে বিশ্বের দরবারে নাম করেছে। কিন্তু এই চুক্তির ফলে আমেরিকার অনেক দামী পেটেন্ট করা ওষুধ সরাসরি আমাদের বাজারে আসবে এবং স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে সেই মানের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে ওষুধের দাম বাড়াতে হবে।
৭. চুক্তির ‘লক ইন’ পদ্ধতির কারণে বাংলাদেশ বিলিয়ন ডলারের প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) শুধু আমেরিকার কাছ থেকে কিনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
যদি পাশের দেশ বা অন্য কোনো দেশ থেকে ভবিষ্যতে আমরা সস্তায় জ্বালানি পাই, তবুও আমরা এই চুক্তি থেকে বের হতে পারব না। দামী আমেরিকান জ্বালানি ব্যবহারের কারণে দেশে বিদ্যুতের দাম এবং রান্নার গ্যাসের দাম বছরের পর বছর চড়া থাকবে, যা সব ধরনের উৎপাদন খরচকে বাড়িয়ে দেবে।
৮. ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব ও ইন্টারনেট খরচ
আমেরিকান টেক কোম্পানিগুলো (যেমন: মেটা, গুগল, অ্যামাজন) বাংলাদেশে ব্যবসা করলেও সরকার তাদের ওপর খুব একটা নিয়ন্ত্রণ বা ট্যাক্স বসাতে পারবে না। সরকার যখন ডিজিটাল সেবা থেকে রাজস্ব পাবে না, তখন মোবাইল ইন্টারনেটের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক বসানোর মাধ্যমে সেই ক্ষতি পোষানোর চেষ্টা করতে পারে, যা ডিজিটাল শিক্ষা ও ব্যবসার জন্য খরচ বাড়িয়ে দেবে।
উপসংহার: সহজ কথায়, আমেরিকা এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের বাজারের প্রতিটি সেক্টরে (কৃষি, শিল্প, টেকনোলজি, এমনকি আইনি ব্যবস্থা) নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। শুরুতে হয়তো কিছু ঝকঝকে বিদেশি পণ্য বাজারে দেখা যাবে, কিন্তু এর বিনিময়ে বাংলাদেশের নিজস্ব উৎপাদন ক্ষমতা এবং সরকারের নীতি নির্ধারণী ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়বে, যার চড়া মাশুল দিতে হবে সাধারণ ক্রেতাকেই সারাজীবন।
আরো অনেক তথ্য লুকিয়ে আছে এই চুক্তির ছত্রে ছত্রে।
