আহমাদ ইশতিয়াক
সাতবাড়িয়ায় একদিনে পাকিস্তানী সেনা ও রাজাকারেরা ৬০০ জনকে হত্যা করেছিলো। দিনটি ১২ই মে পাবনার সাতবাড়িয়া গণহত্যা দিবস।
একাত্তরে এই দিনটি ছিল বুধবার। পাবনার সুজানগর থানার পদ্মা নদী তীরবর্তী নিভৃত একটি ইউনিয়ন সাতবাড়িয়া। সকাল আনুমানিক সকাল ৬টা। সাতবাড়িয়ার বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দাদের তখনও পুরোপুরি ঘুম ভাঙেনি।
.
এমন সময়ই স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় আটটি ট্রাকে করে ৩০০ জনেরও বেশী পাকিস্তানি সেনা পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী একে একে সাতবাড়িয়ায় ইউনিয়নে প্রবেশ করে।
.
একপর্যায়ে তারা বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে ইউনিয়নের অন্তত ২০টি গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে ঢুকে পড়ে।
.
রাজকারদের সহযোগি পাকিস্তানি সেনারা গ্রামবাসীদের নিজ নিজ ঘর থেকে বের করে লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। এদিন দুপুর পর্যন্ত চলা বর্বরোচিত এই গণহত্যায় শহীদ হন অন্তত ৬০০ নিরীহ গ্রামবাসী।
.
মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী সময় থেকেই সাতবাড়িয়া ইউনিয়নটি ছিল রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এক জনপদ। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন থেকে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানেও সম্মিলিতভাবে অংশ নিয়েছিলেন সাতবাড়িয়ার বাসিন্দারা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাবনা ২ আসন থেকে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন সাতবাড়িয়ার বাসিন্দা ও পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আহমেদ তফিফ উদ্দিন। একাত্তরের মার্চে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ঘোষিত অসহযোগ আন্দোলনের শুরু থেকেই সাতবাড়িয়া ডিগ্রী কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ ফজলুল হকের তত্ত্বাবধানে ইউনিয়নের আগ্রহী ছাত্র তরুণেরা প্রশিক্ষণ শুরু করে।
.
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সাতবাড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের তরুণদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করেন আহমেদ তফিজ উদ্দিন। যুদ্ধের প্রথম পর্যায়েই তিনি ভারতের কেচোয়াডাঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পান।
.
এসময় সাতবাড়িয়ার অনেক ছাত্র তরুণ প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে ভারতে পাড়ি জমায়। অনেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে রণাঙ্গনের যুদ্ধে অংশ নিতে শুরু করে। ফলে যুদ্ধের প্রথম পর্যায়েই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকারদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিনত হয় সাতবাড়িয়া ইউনিয়নের গ্রামগুলো।
.
২৪ এপ্রিল দুপুরে স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় একটি জিপ ও একটি পিকআপ সহযোগে ১০-১২ জন পাকিস্তানি সেনা সাতবাড়িয়ায় এসে পুরো ইউনিয়ন রেকি করে।
.
এসময় তারা পুরো ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রাম, রাস্তাঘাট, বাজার, স্কুল-কলেজ ও ঈদগাহ এলাকা নিয়ে বিস্তৃত একটি নকশা তৈরি করেছিলো। রেকি শেষে সেদিন বিকেলের দিকে পাকিস্তানি সেনা ও রাজকারেরা পুনরায় পাবনায় ফিরে যায়।
.
পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ১২ মে ভোরে পাবনা শহর থেকে আটটি ট্রাক করে দুইশোরও বেশী পাকিস্তানি সেনা, রাজাকার ও মিলিশিয়া বাহিনীর সদস্যরা সুজানগর থানায় আসে। অন্যদিকে রাজাকারদের সহযোগিতায় নদীপথে গানবোট নিয়ে অগ্রসর হয় আরও শতাধিক পাকিস্তানি সেনা।
.
এসময় সাতবাড়িয়ার জামায়াত নেতা ও থানা শান্তি কমিটির সদস্য আমিন উদ্দিন খান ওরফে টিক্কা খান, সুজানগর থানার রাজাকার কমান্ডার ও জামায়াত নেতা গোলাম মোস্তফা ও মধু মৌলভী প্রমুখ তাদের সাতবাড়িয়ায় নিয়ে আসে।
.
একপর্যায়ে আগত সেনারা সাতবাড়িয়া ইউনিয়নে প্রবেশ করে তাদের তৈরীকৃত ম্যাপ অনুযায়ী বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে যায়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রাম, রাস্তাঘাট তাদের অপারেশনের পুরোপুরি আওতায় আসে।
.
নকশার পরিকল্পনা অনুযায়ী পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের তারাবাড়িয়া ঈদগাহের কাছ থেকে অপারেশন শুরু করার কথা থাকলেও ঈদগাহ রাস্তা থেকে একটু দূরে থাকায় তারা সে পথে আর এগোয়নি।
.
একপর্যায়ে হানাদার সেনারা রাজাকারদের দেখানো পথ অনুযায়ী ইউনিয়নের কুড়িপাড়া,শ্যামনগর, নিশ্চিন্তপুর, কাচুরী, তারাবাড়ীয়া, ফকিৎপুর, সাতবাড়ীয়া, নারুহাটি, সিন্দুরপুর, হরিরামপুর, ভাটপাড়া, কন্দর্পপুর এবং গুপিনপুরসহ অন্তত ১৫টি গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি ঘেরাও করে।
.
এসময় সেনা ও রাজাকারেরা বাড়ির বাসিন্দাদের ঘর থেকে জোরপূর্বক বের করে খোলা জায়গায় একত্রিত করতে শুরু করে। নারীদের উপর চালানো হয় পৈশাচিক শারীরিক নির্যাতন। একপর্যায়ে পাকিস্তানি সেনারা জড়ো করা গ্রামবাসীদের সারিবদ্ধভাবে লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার শুরু করে।
.
গুলিবিদ্ধ অবস্থায় বেশীরভাগ গ্রামবাসীই এসময় শহীদ হন। আহত গ্রামবাসীদের অনেককেই বেয়নেট চার্জ করে মৃত্যু নিশ্চিত করে হানাদারেরা। এদিন সাত সকালে শুরু হওয়া পৈশাচিক এই গণহত্যা চলেছিল দুপুর পর্যন্ত। নারকীয় এই গণহত্যায় শহীদ হন অন্তত ৬০০ নিরীহ বাসিন্দা। যাদের মধ্যে ছিলেন নারী, বৃদ্ধ থেকে কোলের শিশুও।
.
গণহত্যার পরবর্তীতে অন্তত দুই শতাধিক লাশ পার্শ্ববর্তী পদ্মা নদীতে ভাসিয়ে দেয় হানাদার সেনা ও রাজাকারেরা। গণহত্যার পূর্বে এবং পরবর্তীতে পুরো ইউনিয়নে ব্যাপক পরিসরে লুটপাট চালিয়েছিল রাজাকারেরা। ধর্ষণ, লুটপাট ও গণহত্যা শেষে গান পাউডার ছিটিয়ে তারা বেশীরভাগ বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়।
.
বর্বরোচিত এই গণহত্যার পরেও থেমে যাননি সাতবাড়িয়ার বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দারা। স্বজন হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করে বহু গ্রামবাসীই গণহত্যার পরবর্তীতে নতুন করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন।
.
সুজানগর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও মুক্তিযোদ্ধা এসএম শামসুল আলম বলেন, ‘এই গণহত্যার পরে সাতবাড়িয়ার ইউনিয়নবাসীদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ যোগদানে গণজোয়ার দেখা দিয়েছিলো।
