২০১৬ সালে গুলশানের হোলি আর্টিজানে যখন জঙ্গিরা কুপিয়ে আর গুলি করে বিদেশি নাগরিকসহ বিশজন মানুষ হত্যা করেছিল, তখন পুরো বাংলাদেশ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেই ভয়াবহতার পর থেকেই কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট বা সিটিটিসি একটা সক্রিয় ও বিশেষায়িত বাহিনী হিসেবে কাজ করে আসছিল। কল্যাণপুর থেকে পাতারটেক, নারায়ণগঞ্জ থেকে টাঙ্গাইল, একের পর এক জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালানো এই ইউনিটটা এখন বিলুপ্ত হতে চলেছে। এটিইউর সাথে মিলিয়ে নতুন নামে একটা ইউনিট হবে, যার নাম ঠিক হয়েছে স্পেশাল সিকিউরিটি ইউনিট। কাগজে-কলমে হয়তো এটাকে প্রশাসনিক পুনর্গঠন বলা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো দেশের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও বিশেষায়িত জঙ্গিবিরোধী কাঠামোটা ভেঙে দেওয়া হচ্ছে।
এই সিদ্ধান্তের সময়টা একটু বিশ্লেষণের আতশ কাঁচের নিচে আনা যাক। বর্তমানে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো প্রভাবশালী অবস্থানে আছে, তাদের মধ্যে বিএনপি আর জামায়াতে ইসলামী অন্যতম। এই দুটো দলের জঙ্গিবাদের সাথে সম্পর্কটা নতুন কিছু না, এটা ইতিহাসে লেখা আছে।
২০০১ থেকে ২০০৬, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে বাংলাদেশে ইসলামি জঙ্গিবাদ যেভাবে মাথা তুলেছিল, সেটা এই প্রজন্মের অনেকেই ভুলে গেছে। জেএমবি, হরকাতুল জিহাদ, শাহাদাতে আল হিকমা, এই সংগঠনগুলো সেই সময়ে রাষ্ট্রীয় আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বেড়ে উঠেছিল বললে অত্যুক্তি হয় না। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট একসাথে ৬৩টি জেলায় বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল, যেটা সেই সময়ে বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছিল। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এর আগে ময়মনসিংহের সিনেমা হলে বোমা, রমনা বটমূলে বোমা, উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা, সবকিছুই একটা ধারাবাহিক পরিকল্পনার অংশ ছিল। আর সেই পুরো সময়টায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার এই জঙ্গিদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, বরং তৎকালীন মন্ত্রীরা জেএমবির অস্তিত্বই অস্বীকার করে গেছেন।
জামায়াতে ইসলামীর প্রসঙ্গে আসলে একটু ভিন্ন প্রেক্ষাপট দরকার। এই দলটার মূল পরিচয়ই হলো ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সাথে মিলে গণহত্যা, ধর্ষণ আর বুদ্ধিজীবী হত্যায় সক্রিয় অংশগ্রহণ। রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী যে নামেই ডাকা হোক, এদের নেতৃত্বে ছিল জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতারা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একের পর এক রায়ে এই ঐতিহাসিক সত্য প্রমাণিত হয়েছে। মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সহ জামায়াতের বহু শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের রায় হয়েছে। এই দলটা যখন বিএনপির হাত ধরে আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে, তখন সেটাকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এই দুটো দলের পুনরুত্থানের সময়ে ঠিক যখন সবচেয়ে সক্রিয় ও অভিজ্ঞ জঙ্গিবিরোধী ইউনিটটা ভেঙে দেওয়া হচ্ছে, তখন প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই আসে যে এটা কি নিছক প্রশাসনিক সংস্কার, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে। সিটিটিসি শুধু একটা ইউনিট না, এটা বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি, অভিজ্ঞতা আর নেটওয়ার্কের সমষ্টি। সাইবার ক্রাইম তদন্ত থেকে শুরু করে বোম্ব ডিসপোজাল, সোয়াট থেকে শুরু করে ইন্টেলিজেন্স অ্যানালাইসিস, এই বিভাগগুলো তৈরি হয়েছে অনেক ব্যর্থতা আর সাফল্যের মধ্য দিয়ে। এই পুরো কাঠামোটা এখন একটা নতুন নামের ভেতরে হারিয়ে যাবে।
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ কোনো কাল্পনিক হুমকি না। হোলি আর্টিজান, শোলাকিয়া, বাগমারা, এগুলো সাম্প্রতিক ইতিহাস। এই ইতিহাস ভুলে যাওয়া বা ভুলিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো এই জঙ্গিবাদকে একসময় লালন করেছে বা অন্তত চোখ বুজে থেকেছে, তারা যখন আবার কেন্দ্রে ফেরে, তখন জঙ্গিবিরোধী কাঠামো ভাঙার সিদ্ধান্তটা নিছক কাকতালীয় মনে করার কারণ নেই।(আওয়ামীলীগ পেইজ)
