রাজিক হাসান
অধিকাংশ মানুষ বলবে, “এটা অসম্ভব; কেউ যদি এতই শক্তিশালী হয়, তবে তার পক্ষে হারা সম্ভব নয়।” আর ঠিক এই ধরণের চিন্তাভাবনাই এক একটি সাম্রাজ্যকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়।
ইতিহাস আমাদের যা শিক্ষা দেয় তা হলো, রোমান, মঙ্গোলীয়, ব্রিটিশ বা সোভিয়েত, যে সব বড় সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছে, তার কারণ এই নয় যে শত্রু তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত করেছিল। বরং তারা ব্যর্থ হয়েছিল কারণ তারা বারবার একই ভুল করে গেছে। এমনকি যখন স্পষ্ট বোঝা গেছে যে সেই কৌশল কাজ করছে না, তবুও তারা পরিস্থিতির চাপে তা পরিবর্তন করতে পারেনি। প্রতিটি পদক্ষেপ তাদের একই পরিণতির দিকে নিয়ে গেছে।
হরমুজ প্রণালীতে যা ঘটেছে তা কোনো সংকট নয়, এটি কোনো ভুল হিসাব নয়, কিংম্বা ইরানি ভূখণ্ডে মার্কিন বোমা পড়ার কোনো আকস্মিক উপজাতও নয়। হরমুজ প্রণালীতে যা ঘটছে তা হলো আধুনিক ভূ-রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে নিখুঁতভাবে সম্পাদিত একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত পরিকল্পনা।
চীন এই মুহূর্তটির জন্য পরিকল্পনা শুরু করেছিল অনেক আগেই। বেইজিং এবং তেহরানের মধ্যে ২৫ বছরের ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারিত্ব ২০২১ সালে কেবল কোনো কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে স্বাক্ষরিত হয়নি।
চীন কেবল দর্শক হিসেবে বসে নেই; তারা এই পরিস্থিতির পেছনের আসল কারিগর।
চীন হঠাৎ করে ইরানের সাথে এই অংশীদারিত্বে জড়ায়নি; চীন ইরানকে বেছে নিয়েছে। চীনের ইরানকে প্রয়োজন ছিল এবং চীন তার ধৈর্যশীল, সুশৃঙ্খল ও অ-পশ্চিমা পদ্ধতিতে ঠিক সেই প্রেক্ষাপটের স্থাপত্য তৈরি করেছে যা এখন সবার চোখের সামনে উন্মোচিত হচ্ছে।
এদিকে আমেরিকা দাবি করেছে তারা ইরানের প্রতিরক্ষা ধ্বংস করেছে, কিন্তু ইরানের কৌশল হলো “ডিপ ডাইভিং”। তারা তাদের মিসাইল সিটি এবং কমান্ড সেন্টারগুলো মাটির গভীরে এবং পাহাড়ে লুকিয়ে রেখেছে, যা পুরোপুরি ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব।
ইরান এমন একটি দেশ যাকে গত চার দশক ধরে আমেরিকা অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। এমন ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রাখা হয়েছে যা ইরানের তেল রপ্তানি শূন্যে নামিয়ে আনার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। অথচ সেই ইরান এখন হরমুজ প্রণালীতে কেবল ট্রানজিট ফি থেকেই প্রতি মাসে আনুমানিক ৬০০ মিলিয়ন ডলার আয় করছে।
যে ‘চোকপয়েন্ট’ বা প্রতিবন্ধকতাকে ইরানের ভয় পাওয়ার কথা ছিল, তারা সেটাকেই আয়ের উৎসে পরিণত করেছে। তারা নিজের দুর্বলতাকে অস্ত্রে রূপান্তরিত করেছে।
এই যুদ্ধে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হল ইউরোপ। গত ৮০ বছর ধরে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে সফল অর্থনৈতিক শক্তি, সেটি এখন এমন এক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে যা ১৯৩০-এর দশকের পর সবচেয়ে বিপজ্জনক অর্থনৈতিক মুহূর্তের মুখোমুখি হচ্ছে।
ইউরোপের নিজস্ব পর্যাপ্ত জ্বালানি কখনোই ছিল না; তারা সবসময় এটি আমদানি করেছে। আর যতদিন পর্যন্ত এই আমদানি সস্তা এবং নির্ভরযোগ্য ছিল, ততদিন এই মডেলটি চমৎকারভাবে কাজ করেছে। জার্মানি সস্তা রাশিয়ান গ্যাস আমদানি করে এবং তা দিয়ে বিশ্বের সেরা সব পণ্য তৈরি করে ইউরোপের শিল্পের হৃদপিণ্ডে পরিণত হয়েছে।
সস্তা জ্বালানি ভেতরে আসত আর বিএমডব্লিউ (BMW) এবং রাসায়নিক পণ্য বাইরে যেত, এটাই ছিল জার্মান অর্থনৈতিক মিরাকল এবং এটি পুরো মহাদেশকে শক্তি যুগিয়েছিল। এখন সেই ভিত্তি ধ্বংসের মুখে। ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শুরু হয়েছে ইউরোপের পতন। আর এই ইরান যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ ইউরোপের সেই পতন ত্বরান্বিত করেছে।
অধিকাংশ মানুষ মনে করেন ইসরাইল আমেরিয়াকর বন্ধু। আমেরিকা প্রতি বছর ইসরায়েলকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দেয়, জাতিসংঘে ইসরায়েলকে রক্ষা করে, ইসরায়েলকে বাঁচাতে যুদ্ধবিমান পাঠায়।
কিন্তু আসল সত্যিটা হল, ইসরায়েল আমেরিকার মিত্র নয়; বরং ইসরায়েল হলো আমেরিকার স্থলাভিষিক্ত বা প্রতিস্থাপন (Replacement)।
এই যুদ্ধে সরাসরি লড়াইয়ে ইরান জয়ী হচ্ছে, তবে ভূ-রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে ইসরায়েল।
আমেরিকা এবং ইরান যখন একে অপরকে রক্তাক্ত করে দুর্বল করে ফেলবে, তখন সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠবে ইসরায়েল।
আমেরিকার পতনের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হবে, ইসরায়েল তা দখল করবে।
যুদ্ধের ফলে ইসরায়েল একটি আঞ্চলিক “হেজিমনি” বা প্রধান শক্তিতে পরিণত হবে।
অনেকে মনে করেন আমেরিকার পতনে চীন জিতবে, কিন্তু আমেরিকার পতন বিশ্ব ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলবে, যা শেষ পর্যন্ত চীনের অর্থনীতির জন্যও ক্ষতি বয়ে আনবে।
লড়াইয়ের ময়দানে ইরান টিকে থাকলেও, দীর্ঘমেয়াদী ক্ষমতার রাজনীতিতে প্রকৃত বিজয়ী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে ইসরায়েল।
ইসরায়েল গোপনে চায় আমেরিকা এই যুদ্ধে হেরে যাক বা অন্তত পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যাক। কারণ, আমেরিকা যতক্ষণ শক্তিশালী থাকবে, ততক্ষণ ইসরায়েলকে আমেরিকার ওপর নির্ভর করতে হবে।
আমেরিকা যখন ইরানের সাথে যুদ্ধে তার সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি ক্ষয় করবে, তখন মধ্যপ্রাচ্যে যে ক্ষমতার শূন্যতা (power vacuum) তৈরি হবে, তা পূরণ করবে ইসরায়েল।
আমেরিকা ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করছে, তার তরুণ ছেলে-মেয়েদের মরতে পাঠাচ্ছে, নিজের অর্থনীতি ধ্বংস করছে, অথচ এই সবকিছুর মূল সুবিধাভোগী আমেরিকা নয়। মূল সুবিধাভোগী হলো ইসরায়েল।
অর্থাৎ আমেরিকার পতন হলে চীন, রাশিয়া এবং ইসরাইল এরা সবাই লাভবান হবে।
প্রশ্ন হল, এখন আমেরিকা কী করবে?
আমেরিকা বোমা হামলা তীব্রতর করতে পারে। তখন ইরান তাদের আরও ভূগর্ভস্থ মিসাইল ঘাঁটি সক্রিয় করবে। ইরানের হামলার পরিমাণ এবং কার্যকারিতা বৃদ্ধি পাবে, ফলে আমেরিকার আরও বেশি ইন্টারসেপ্টর (ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী) ব্যয় হবে। আমেরিকার জন্য গাণিতিক হিসাব কঠিন হয়ে পড়বে। আমেরিকার ইন্টারসেপ্টর দ্রুত ফুরিয়ে যাবে, তেলের দাম বেড়ে যাবে এবং বিশ্ব অর্থনীতি আরও বিপর্যস্ত হবে। আমেরিকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা দুর্বল হয়ে পড়বে।
আমেরিকা ইরানে স্থল সৈন্য পাঠাতে পারে। ইরান গত ২৫ বছর ধরে পাহাড়ের নিচে এমন সব গোপন ঘাঁটি তৈরি করে পরিকল্পনা করছে যা সম্পর্কে আমেরিকা জানেই না। তারা এমন সব অস্ত্র ব্যবস্থা তৈরি করেছে যা বিশেষভাবে স্থলযুদ্ধের জন্য ডিজাইন করা এবং যা এখনো ব্যবহার করা হয়নি। একই সাথে ইরাক কুয়েত ও সৌদি আরবে সৈন্য পাঠাবে এবং ইয়েমেন দক্ষিণ দিক থেকে সৌদি আরবে আক্রমণ করবে। জিসিসি (GCC) বিশৃঙ্খলার মধ্যে ভেঙে পড়বে। উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলো অবরুদ্ধ হয়ে যাবে। পিছু হটার মতো কোনো জায়গা থাকবে না।
আমেরিকা ইরানের সাথে আলোচনার চেষ্টা করতে পারে। ইরান বলবে,”আমরা তখনই আলোচনা করব যখন আপনারা আমাদের শর্ত মেনে নেবে।” শর্তগুলো হলো, উপসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকান সামরিক ঘাঁটিগুলো বন্ধ করতে হবে; আমাদের মিত্র হিজবুল্লাহ, ইয়েমেন, ফিলিস্তিনি এবং ইরাককে চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং নিষেধাজ্ঞা স্থায়ীভাবে তুলে নিতে হবে। আমেরিকা বলবে, “আমরা কখনোই এই শর্তগুলো মেনে নেব না।” ইরান বলবে, “তাহলে আমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাব।”
আমেরিকা চীন ও রাশিয়াকে দিয়ে ইরানের ওপর চাপ দেওয়ার অনুরোধ করতে পারে।
চীন বলবে, “আমরা ছাড়ে ইরানের তেল কিনছি, এই যুদ্ধ ইরানকে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি দিয়েছে। আমাদের অর্থনীতি লাভবান হচ্ছে। আমরা কেন ইরানকে চাপ দেব?”রাশিয়া বলবে, “ইরান আমাদের মিত্র। ইরান উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোরে অবস্থিত যা আমাদের ভারত মহাসাগরের সাথে যুক্ত করে। আমাদের ইরানকে প্রয়োজন। আমরা কেন ইরানকে চাপ দেব?” আমেরিকা একা হয়ে পড়বে।
ধরি আমেরিকা কিছুই করল না, শুধু বোমা হামলার মাধ্যমে ইরানের পতনের জন্য অপেক্ষা করল। তখন কী হবে? ইরানের পতন হবে না।
প্রতিটি বোমা হামলার পর লাখ লাখ ইরানি মানুষ রাস্তায় নেমে আসবে। ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিশেষভাবে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে তারা ঠিক এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করে টিকে থাকতে পারে। তাদের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার পরও ইরান কোনো নেতা ছাড়াই পুরো এক সপ্তাহ যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিল। কেউ বোমা মেরে ইরানকে আত্মসমর্পণ করাতে পারবেন না।
প্রতিটি পদক্ষেপের পরিণতি একই। আমেরিকাকে শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য ছাড়তেই হবে। এই যুদ্ধই হবে “আমেরিকান সাম্রাজ্যের” শেষ অধ্যায়।
