দেশের প্রথম সারির সংবাদপত্র দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার এবং দেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট ভবনে গত বৃহস্পতিবার রাতে একদল হামলাকারী ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। পরদিন উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর কার্যালয়েও হামলা ও অগ্নিসংযোগের পর দেশের কবি, লেখক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মীরা আতঙ্কে আছেন। বিশেষ করে প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লেখক-সাংবাদিক ও অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতিকর্মীরা নানাভাবে হুমকি ধমকি পাচ্ছেন। তারা সপরিবারে আতঙ্কে আছেন।
জুলাইযোদ্ধারা প্রকাশ্যে অনলাইন ও অফলাইনে তাদেরকে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি জামায়াতের গুপ্ত সংগঠন শিবিরের পদধারী নেতা এবং সন্ত্রাসী কর্মীরা হামলায় উস্কানি দিয়ে লেখালেখি করছেন এমন স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে।
প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, উদীচী ও ছায়ানটে হামলার পর জড়িত কাউকে এখনও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে পুলিশ বলছে, জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে চেষ্টা চলছে। তবে হামলাকারীরা প্রকাশ্যে স্লোগান দিয়ে মিছিল করে এসে লাইভ করে হামলা চালালেও তাদের গ্রেপ্তার করছেনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
গণমাধ্যম অফিসে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তদন্তের বিষয়ে ও দোষীদের গ্রেপ্তার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের ডিসি মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, দুটি গণমাধ্যম অফিসে হামলার ঘটনায় এখনও মামলা হয়নি। তবে পুলিশ তদন্ত কার্যক্রম চালাচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্ত ও আটকের চেষ্টা চলছে।
শনিবার সকালে ক্ষতিগ্রস্ত প্রথম আলো কার্যালয় পরিদর্শন করেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তারা ভবনের বিভিন্ন কক্ষ ঘুরে দেখেন।
এ সময় মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘ঘোষণা দিয়েই হামলা করা হয়েছে। কেউ কেউ বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। এরপরও হামলা হয়েছে। এটি ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এখন হামলার পর যদি আমরা পাশে না দাঁড়াই, তাহলে ভবিষ্যতে কী হবে, তা বোঝা যায় না।’
তিনি গত বছর প্রথম আলোর কার্যালয়ের সামনে গরু জবাই ও বিক্ষোভ সমাবেশের প্রসঙ্গ টেনে প্রশ্ন রেখে বলেন, ওই ঘটনায় কজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল?
ঘটনার পর থেকে ছায়ানট ও উদীচীর কার্যালয় বন্ধ রয়েছে। তবে বিশেষ ব্যবস্থায় প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকা প্রকাশ করছে। যদিও প্রথম আলো তাদের বিবৃতিতে দাবি করেছে, ইউনূস সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতেই কতিপয় দুর্বৃত্ত এই হামলা করেছে।
এদিকে, দেশের শীর্ষস্থানীয় এই দুটি পত্রিকার কার্যালয়ে হামলার পর আতঙ্কে রয়েছে দেশের প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অন্যান্য গণমাধ্যমও। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেভাবে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলা চালানো হয়েছে, তা দেখার পর তারা আতঙ্কিত। তাদের প্রশ্ন গণমাধ্যম তো সত্য তুলে ধরার চেষ্টা করে। এখানে হামলার কারণ কী? গণমাধ্যম সমাজের অসংগতি তুলে ধরে, যা সমাজ, দেশ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে সহায়ক ক্ষতির নয়।
সাংবাদিকদরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর প্রগতি, মানবতা, মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িকতা, সংস্কৃতিচর্চার পক্ষে লেখালেখি বন্ধ আছে। এসব নিয়ে লিখলেই আওয়ামী ট্যাগ দিয়ে মবের চেষ্টা চলছে। সরকারের সমালোচনা, জঙ্গি কার্যক্রম ও দৃশ্যমান সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কলম ধরতে পারছেন না কেউ। এই অবস্থা চলছে সারা দেশে। এখন ওসমানী হাদীর মৃত্যুর ইস্যুকে সামনে এনে লেখক, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে আরো আতঙ্ক ডুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে গুপ্ত সংগঠন জামায়াত শিবির ও হিযবুত তাহরিরসহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন এসব করছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
জানা গেছে, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলার পর জাতীয় দৈনিক কালবেলা ও সমকালের কার্যালয়ের সামনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। সেখানে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন কর্তৃপক্ষও আতঙ্কে আছে। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ১৯ আগস্ট কালের কণ্ঠ অফিসে হামলার ঘটনা ঘটেছিল।
গণমাধ্যমে হামলার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন বলেন, আরা এই হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। যেভাবে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে, তাতে প্রাণনাশের আশঙ্কা ছিল। এমনটি হলে আমরা কী জবাব দিতাম? দেশকে অস্থিতিশীল করতেই এমন বর্বরোচিতভাবে গণমাধ্যমের ওপর হামলা চালানো হয়েছে।
এদিকে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার অফিসে হামলার প্রতিবাদে নাহিদ, সারজিস, তাসনিম জারাসহ সমন্বয়ক মবস্টাররসহ সরকার সহমর্মিতা জানালেও উদীচী ও ছায়ানটে হামলার ঘটনায় তারা নীরব। বাঙালির শুদ্ধ সংস্কৃতিচর্চায় ছায়ানট ও উদীচী ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করলেও তাদের অসাম্প্রদায়িক কার্যক্রমের কারণে হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে বলে মনে করেন সুধীজন। কিন্তু সরকার এ বিষয়ে নীরব রয়েছে।
উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনার প্রতিবাদে সংগঠনটি তীব্র নিন্দা ও বিক্ষোভ প্রকাশ করেছে। শনিবার সকালে রাজধানীর তোপখানা রোডে উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের উদ্যোগে একটি বিক্ষোভ মিছিল ও সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বক্তারা এই হামলাকে মুক্তচিন্তা ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক চর্চার ওপর সরাসরি আঘাত বলে মন্তব্য করেন।
সমাবেশে উদীচীর (একাংশ) সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে অভিযোগ করেন, হুমকি থাকার পরও উদীচী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলা ঠেকাতে সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ও ছায়ানট ভবনে হামলার পর থেকেই উদীচীর ওপর সরাসরি হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু আমাদের নিরাপত্তায় কোনও ব্যবস্থা নেয়নি সরকার বা প্রশাসন। এর ফলেই শুক্রবার সন্ধ্যায় নির্বিঘ্নে প্রকাশ্যে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।
অমিত রঞ্জন দে বাংলা বলেন,এই হামলাগুলোকে আমরা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে করি না। এটি ধারাবাহিকভাবে হয়ে আসছে। আমার কাছে এটি পরিকল্পিত বলেই মনে হয়েছে। আমরা বিষয়টিকে যেভাবে দেখি, তা হলো মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও বাকস্বাধীনতার বিরুদ্ধে এটি একটি আঘাত।
তিনি আরও বলেন, আরেকটি বিষয় হলো সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর ওপরও আক্রমণ করা হচ্ছে। কারণ আমাদের যে মেধাভিত্তিক চর্চা, সেই চর্চার ওপর আঘাত করা, শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে মানুষের যে মানবিক বিকাশ ঘটে, সেটিকে থামিয়ে দেওয়াই হামলাকারীদের উদ্দেশ্য। মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোই সারাদেশে এসব করছে।
ধানমন্ডির ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ছয়তলা ভবনটির প্রতিটি তলাতেই ভাঙচুর চালানো হয়। হামলাকারীরা নিচতলায় অগ্নিসংযোগ করে এবং প্রতিটি তলায় ব্যাপক তা-ব চালায়। তারা শ্রেণিকক্ষের সিসি ক্যামেরা, কম্পিউটার ও আসবাব ভাঙচুর করে। বিশেষভাবে বাদ্যযন্ত্রগুলোর ওপর আক্রোশ দেখানো হয়। পাশাপাশি বেশ কিছু ল্যাপটপ ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম লুট করা হয়।
ছায়ানটের শিক্ষার্থীদের অনুশীলন ও অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হারমোনিয়াম, তবলা, সেতার, তানপুরাসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র ভেঙে ফেলা হয়। এ ঘটনায় ছায়ানট কর্তৃপক্ষ ধানমন্ডি থানায় মামলা করেছে। তবে এখনও কাউকে শনাক্ত বা আটক করা যায়নি।
ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ছায়ানটে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা হয়েছে। উন্নত প্রযুক্তির সহায়তায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
