ইউনূস সরকার কর্তৃক বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণার পর এই প্রথম দলটির শীর্ষ নেতাদের প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে দেখা গেলো।
শনিবার দিল্লির প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়ায় ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (আইসিআরএফ) সংবাদ সম্মেলনে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং আইসিআরএফ এর সংগঠক ব্যারিস্টার গোলাম মারুফ মজুমদার নিঝুম।
ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগকে আসন্ন ১২ই ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়া বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা আনবে না, বরং পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলবে।
তিনি জানান, দলটি গত ১৬ মাস ধরে বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, হত্যা, লুটপাট ও ধর্মীয় স্থান ধ্বংসের ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরার জন্য একটি ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনায় সম্পূর্ণ অক্ষম এবং নির্বাচন নির্ধারিত তারিখে অনুষ্ঠিত হবে কি না, তা নিয়ে গভীর সন্দেহ রয়েছে। এসময় ড. হাছান মাহমুদ জোর দিয়ে বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ অবশ্যই ক্ষমতায় ফিরে আসবে।
সংবাদ সম্মেলনে ২০২৪-এর জুলাই-আগস্ট দাঙ্গায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের জন্য আওয়ামী লীগ ক্ষমা চাইবে কি না—এই প্রশ্নের জবাবে ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল একটি দীর্ঘ ও বিস্তারিত বক্তব্য দেন।
তিনি বলেন:“আমরা লজ্জিত কিনা- আমার মনে হয় এখানে প্রশ্নটি অযাচিত। আমাদের লজ্জা পাবার কিছু নেই। আমরা দায়িত্বে ছিলাম, জুলাইয়ে একটি ব্যাপক দাঙ্গা হয়, দাঙ্গা ব্যাবস্থাপনা একটি চ্যালেঞ্জ ছিল, নিরাপত্তা উদ্বেগ ছিল। অবশ্যই তাদের উপর আক্রমণ হয়, নিরাপত্তাবাহিনী অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করেছিল, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে তা করেনি, এগুলো হত্যা ছিল না, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হতাহতের ঘটনা ঘটেছিল।”
তিনি হতাহদের প্রতি দায়িত্ব ও সহানুভূতি দেখিয়ে তিনি বলেন, “প্রাণহানি অবশ্যই হয়েছিল, ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তবে সেগুলোকে হত্যাকাণ্ড বলা যায় না। দাঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যারা হতাহত হয়েছিল, তারা আমাদের সন্তান, আমাদের কর্মী, আমাদের দেশের নাগরিক। আমরা চাই এটার জন্য যারা দায়ী, তাদের এই কর্মকান্ডের জন্য জবাবদিহি করাতে।”
দায়িত্ব নেয়া ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে চেয়ে তিনি আরো বলেন, “শুধুমাত্র আমরা লজ্জিত কিনা, এই প্রশ্নের উত্তরের মাধ্যমে ঘটনাকে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। কেউই দায় এড়াতে পারবে না এবং আমরা সেটা করতেও চাই না। যদি আমরা দায়ী হই, তাহলে আমাদেরও জবাবদিহি করতে হবে।”
জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহের পিছনের আসল কারণ উদঘাটন করা বিষয়ে তিনি আরো বলেন, “আমরা জুলাই আগস্টের দাঙ্গা পরিস্থিতি সৃষ্টির কারণ জানতে চাই, কারা কীভাবে আমাদের সন্তান, নাগরিকদের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিল, সেই সত্য আমরা জানতে চাই। কী ঘটেছিল, ছাত্র আর নাগরিকদের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়ার পিছনে কে ছিল, কারা অর্থায়ন করেছিল, ত্রুটিগুলো কেন ঘটেছিল, কীভাবে পুরো সিস্টেম ফেইল করেছিল, সেই সব আমরা জানতে চাই।”
সকল ধরণের, সকল পক্ষের মৃত্যুর জন্য ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়ে ব্যারিস্টার নওফেল বলেন, “সুতরাং কথাটি, আমরা লজ্জিত কিনা, সেটা নয়, কথাটি হবে আমরা এর বিচার চাই, আমরা আমাদের দেশের নাগরিকদের জন্য ন্যায়বিচার দাবি করছি। হাদি থেকে আবু সাঈদ, আমাদের কর্মী থেকে শুরু করে দীপু চন্দ্র দাস পর্যন্ত, তারা সবাই আমাদের বাংলাদেশের নাগরিক।”
“আমরা ন্যায়বিচার চাই, তবে সেটা বর্তমানের বাংলাদেশের এই শাসকের কাছ থেকে নয়, যারা পুরো গণমাধ্যমকে জিম্মি করে রেখেছে, যারা সাংবাদিকদের কারাগারে পাঠাচ্ছে, আমরা তাদের কাছ থেকে কিছুই আশা করি না”, বলেন তিনি।
বর্তমান ইউনূস সরকারের জুলাইয়ের হতাহতের ঘটনায় প্রহসনের বিচারের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি আরো যোগ করেন, “তারা কিছুই করছে না। বরং বাংলাদেশের এই রেজিমের লজ্জিত হওয়া উচিত- আসলে জুলাই-আগস্টে কী ঘটেছিল, কীভাবে ঘটেছিল, কারা কারা এসবের পিছনে জড়িত ছিল, কারা ছাত্রদের ব্যবহার করেছিল, সেটা এতদিনেও উদঘাটন করতে না পারায়।”
ব্যারিস্টার নওফেল আরও বলেন, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর জেল থেকে মুক্তি পাওয়া চরমপন্থিরা দেশে বড় ধরনের হুমকি তৈরি করেছে। পুলিশের অনেক সদস্য প্রতিশোধমূলক হামলায় নিহত হয়েছেন এবং দেশে “দায়মুক্তির সংস্কৃতি” প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে।
এই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নেতারা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সংখ্যালঘু নির্যাতন এবং আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছেন। শেখ হাসিনা ভারতে নির্বাসিত অবস্থায় থাকলেও দলের নেতারা ক্ষমতায় ফেরার দৃঢ় আশ্বাস ব্যক্ত করেছেন। এর আগে গত বছর জুলাই মাসে একটি অনুরূপ সংবাদ সম্মেলন শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়ে যায়। এবারের এই প্রকাশ্য উপস্থিতি দলের আন্তর্জাতিক প্রচারণার একটি নতুন ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
