বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তা ক্রমেই একটি প্রশ্নবিদ্ধ রাজনৈতিক প্রদর্শনীতে পরিণত হচ্ছে। এটি আর কেবল একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়—এটি এখন একটি আন্তর্জাতিক বিতর্ক, একটি নৈতিক সংকট এবং সর্বোপরি, একটি গণতান্ত্রিক ব্যর্থতার প্রতীক।
আজ প্রশ্ন একটাই: এটা কি সত্যিকারের নির্বাচন, নাকি নির্বাচনের ছদ্মবেশে ক্ষমতার বৈধতা তৈরির কৌশল?
১. নির্বাচন হয় পরিবেশে, শুধু তারিখে নয়
নির্বাচন মানেই শুধু একটি দিন নির্ধারণ নয়। নির্বাচন মানে একটি পরিবেশ—যেখানে:
বিরোধী দল কথা বলতে পারে
মিডিয়া স্বাধীন থাকে
নাগরিকরা ভয় ছাড়া ভোট দিতে পারে
প্রশাসন নিরপেক্ষ থাকে
নিরাপত্তা বাহিনী পক্ষপাতহীন আচরণ করে
এই পাঁচটি মৌলিক শর্তের কোনোটিই বর্তমানে পূরণ হচ্ছে না।
Human Rights Watch-এর সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা ও নাগরিক পরিসর সংকুচিত হচ্ছে। এটি সরাসরি ভোটের স্বাধীনতার ওপর আঘাত। ভয়ের পরিবেশে দেওয়া ভোট কখনোই স্বাধীন ভোট হতে পারে না।
২. প্রধান রাজনৈতিক শক্তিকে বাইরে রেখে কিসের নির্বাচন?
এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় অস্বস্তিকর বাস্তবতা হলো—দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগ কার্যত নির্বাচনী মাঠের বাইরে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও গবেষণা সংস্থাগুলো স্পষ্ট করে বলছে:
“প্রধান রাজনৈতিক দলকে বাদ দিয়ে কোনো নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক বলা যায় না।”
এটি কেবল একটি দলীয় প্রশ্ন নয়। এটি ভোটার প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন। একটি বড় অংশের ভোটার যদি প্রতিনিধিত্বহীন হয়, তাহলে সেই সংসদ কার?
৩. আন্তর্জাতিক উদ্বেগ: বাংলাদেশ আর অভ্যন্তরীণ ইস্যু নয়
এই নির্বাচন এখন আর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়—এটি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের বিষয়।
উদাহরণ:
🔹 ইউরোপীয় ইউনিয়ন পর্যবেক্ষক পাঠিয়েছে, কিন্তু তারা ফলাফলের নিশ্চয়তা দেয়নি—শুধু নজরদারি করবে বলেছে।
🔹 আন্তর্জাতিক নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলো রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি ও নতুন নির্বাচনের দাবি তুলেছে।
🔹 গ্লোবাল ডেমোক্রেসি ইনডেক্সগুলো বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে “হাইব্রিড” বা “অংশিক স্বৈরতান্ত্রিক” শ্রেণিতে ঠেলে দিচ্ছে।
এগুলো কূটনৈতিক ভাষা। বাস্তব ভাষায় এর মানে: বিশ্ব বাংলাদেশকে বিশ্বাস করতে পারছে না।
৪. নিরাপত্তাহীনতা + দমননীতি = অবাধ ভোট অসম্ভব
নির্বাচনের আগে সহিংসতা, গ্রেপ্তার, ভীতি প্রদর্শন এবং রাজনৈতিক প্রতিশোধমূলক মামলা—এসবই নির্বাচনী পরিবেশকে বিষাক্ত করে তোলে।
Associated Press, Reuters, Al Jazeera–এর মতো সংবাদমাধ্যম বারবার এই প্রশ্ন তুলছে:
বাংলাদেশে কি মানুষ নিরাপদে ভোট দিতে পারবে?
এই প্রশ্নের জবাব এখনো কেউ দিতে পারেনি।
৫. এই নির্বাচন কেন একটি ‘ডেকোরেশন ডেমোক্রেসি’?
বিশ্বজুড়ে এখন এক নতুন শব্দ চালু হয়েছে—Decorative Democracy। মানে, দেখতে গণতন্ত্রের মতো, কিন্তু ভেতরে ফাঁপা।
এই নির্বাচনে:
✔ ব্যালট থাকবে
✔ বুথ থাকবে
✔ ফলাফল থাকবে
কিন্তু—
❌ সমান প্রতিযোগিতা নেই
❌ ভয়মুক্ত পরিবেশ নেই
❌ আস্থার ভিত্তি নেই
❌ রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নেই
এটা গণতন্ত্রের মডেল নয়—এটা গণতন্ত্রের নকল সংস্করণ।
৬. ইতিহাস সাক্ষী: এমন নির্বাচন রাষ্ট্রকে দুর্বল করে
বিশ্বের বহু দেশে দেখা গেছে—
ভুয়া নির্বাচন → আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা
ভুয়া নির্বাচন → অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা
ভুয়া নির্বাচন → সামাজিক বিভাজন
ভুয়া নির্বাচন → দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা
বাংলাদেশ কি সেই পথে হাঁটছে?
শেষ কথা: এটি একটি রাজনৈতিক নয়, একটি জাতীয় প্রশ্ন
এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতার প্রশ্ন নয়—এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামোর প্রশ্ন।
আজ যদি নির্বাচনকে নাটকে পরিণত করা হয়, তাহলে আগামী প্রজন্ম আর ভোটে বিশ্বাস করবে না। তারা বিশ্বাস করবে রাস্তায়, সংঘাতে, বিশৃঙ্খলায়।
গণতন্ত্র একদিনে ভেঙে পড়ে না।
এটি ধীরে ধীরে শ্বাসরোধ করে মারা হয়।
এই নির্বাচন সেই শ্বাসরোধেরই একটি অধ্যায়।
