বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে ২০০৫ সালে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে ভয়াবহ বিস্ফোরণেরর ফলে অদক্ষতার মাশুল গুণতে হয়েছিল সমগ্র দেশ ও জাতিকে। বাংলাদেশ হারায় বিপুল পরিমাণ খনিজ সম্পদ। যেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল জানমালের, তেমনি পরিবেশ-প্রকৃতির হয় অপূরণীয় ক্ষতি। বিএনপি-জামায়াত সরকারের ঊর্ধ্বতনদের সাথে যোগসাজশে এবং অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে পার পেয়ে যায় কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠান নাইকো।
সেই ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা আইনি লড়াইয়ে বাংলাদেশ বড় বিজয় অর্জন করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটস (আইসিএসআইডি) ট্রাইব্যুনাল প্রায় ৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৫১৬ কোটি টাকা) ক্ষতিপূরণ বাংলাদেশকে প্রদানের নির্দেশ দিয়েছে কানাডিয়ান কোম্পানি নাইকো রিসোর্সেস লিমিটেডকে।
ঘটনার পটভূমি
টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র (ছাতক গ্যাস ফিল্ডের অংশ) ১৯৫৯ সালে আবিষ্কৃত হয়। ২০০৩ সালে খালেদা জিয়ার সরকার বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) এবং নাইকো রিসোর্সেসের মধ্যে যৌথ উন্নয়ন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
২০০৫ সালের ৭ই জানুয়ারি ড্রিলিংয়ের সময় প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে, যা গ্যাসক্ষেত্রের ব্যাপক ক্ষতি করে এবং পরিবেশ, জনসম্পত্তি ও জীবনহানির কারণ হয়। একই জায়গায় একই বছরের ২৪শে জুন দ্বিতীয় বিস্ফোরণ ঘটে।
এতে প্রায় ৮ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পুড়ে নষ্ট হয়ে যায়। যার ফলে পরিবেশ দূষণসহ আশপাশের এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। বিনষ্ট হয় বিপুল পরিমাণ ফসলি জমিসহ প্রাকৃতিক জলাশয়।
মামলার ইতিহাস
মামলাটি মূলত নাইকো শুরু করেছিল নিজেদের দায় এড়াতে। কিন্তু ২০০৮ সালে সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাংলাদেশের পক্ষে পাল্টা ক্ষতিপূরণ চেয়েছে আর্জি পেশ করে। এরপর বাংলাদেশে নাইকোর বিরুদ্ধে মামলা ও তদন্ত শুরু হয়। হাইকোর্ট নাইকোর সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও চুক্তি বাতিলের নির্দেশ দেয়, যা সুপ্রিম কোর্টেও বহাল থাকে।
২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার নাইকো রিসোর্সেস (আইসিএসআইডি)-এ দুটি মামলা দায়ের করে। একটিতে তারা বিস্ফোরণের দায় থেকে অব্যাহতি চায় এবং অপরটিতে ফেনী গ্যাস ফিল্ড থেকে সরবরাহকৃত গ্যাসের পেমেন্টও দাবি করে।
বাংলাদেশ (পেট্রোবাংলা ও বাপেক্স) পাল্টা দাবি করে যে নাইকোর অবহেলা ও নিরাপত্তা মানদণ্ড লঙ্ঘনের কারণে বিস্ফোরণ ঘটেছে এবং ক্ষতিপূরণ দাবি করে (প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি)।
আওয়ামী লীগ সরকারের তৎপরতায় ২০১৩ সালে আইসিএসআইডি ট্রাইব্যুনাল নাইকোর দায় অস্বীকারের দাবি খারিজ করে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে চালিয়ে যাওয়া তৎপরতায় ২০২০ সালে আইসিএসআইডি নাইকোকে দায়ী ঘোষণা করে এবং ক্ষতিপূরণের ভিত্তি নির্ধারণ করে।
অবশেষে জানুয়ারি ২০২৬ (অন্তর্বর্তী সরকারের সময়): চূড়ান্ত রায়ে নাইকোকে ৪২ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪০ মিলিয়ন ডলার ৮ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস নষ্টের জন্য এবং ২ মিলিয়ন ডলার পরিবেশগত ও অন্যান্য ক্ষতির জন্য।
আইসিএসআইডি ট্রাইব্যুনালে নাইকোর অবহেলা ও চুক্তির লঙ্ঘন প্রমাণিত হয়।
জানা যায়, এই বিস্ফোরণগুলোর ফলে প্রাকৃতিক গ্যাস সম্পদের ব্যাপক অপচয় হয় এবং পরিবেশ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের গুরুতর স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে ফেলে দেওয়া হয়। বিস্ফোরণের পর থেকে গ্যাসক্ষেত্রটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
টেংরাটিলা বিস্ফোরণের পর, বাংলাদেশ প্রথমে নাইকোর কাছে ৭৪৬ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে, যা কোম্পানিটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। এরপর পেট্রোবাংলা নাইকোর ফেনী গ্যাসক্ষেত্রের গ্যাস বিল পরিশোধ বন্ধ করে দেয়। এর প্রতিক্রিয়ায়, নাইকো ২০০৭ সালে স্থানীয় নিম্ন আদালতে মামলা করে। বিষয়টি উচ্চ আদালতে গড়ালে, হাইকোর্ট বাংলাদেশে নাইকোর সমস্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেয় এবং এর চুক্তি বাতিল করে। নাইকো এই আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে, কিন্তু সেখানেও রায় বাংলাদেশের পক্ষে যায়।
২০১০ সালে, নাইকো আটকে থাকা গ্যাস বিল পরিশোধের দাবিতে এবং ক্ষতিপূরণ দিতে বাংলাদেশের অস্বীকৃতিকে চ্যালেঞ্জ করে আইসিএসআইডির কাছে দুটি মামলা দায়ের করে। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর, আইসিএসআইডি ২০১৪ সালে রায় দেয় যে পেট্রোবাংলাকে ফেনী গ্যাসক্ষেত্র সম্পর্কিত বকেয়া পাওনা পরিশোধ করতে হবে। তবে, সর্বশেষ রায়ে এখন টেংরাটিলা বিস্ফোরণের জন্য নাইকোর দায় এবং ক্ষতিপূরণের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করেছে।
বাংলাদেশ মোট ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি দাবি করেছিল (বাপেক্ষের জন্য ১১৮ মিলিয়ন ও সরকারের জন্য ৮৯৬ মিলিয়ন), কিন্তু ট্রাইব্যুনাল শুধু ৪২ মিলিয়ন ডলার অনুমোদন করে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান রায়টি নিশ্চিত করেছেন। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিজয়, যদিও নাইকোর দেউলিয়াত্বের কারণে অর্থ আদায়ে চ্যালেঞ্জ থাকতে পারে।
এই রায় দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার ফল, যা বিভিন্ন সরকারের আমলে অব্যাহত ছিল এবং অবশেষে বাংলাদেশের পক্ষে এসেছে।
