কর্মজীবী নারীদের ‘বেশ্যা’ বলার অভিযোগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঝাড়ু মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই কর্মসূচিতে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নারী নেত্রী, সাধারণ শিক্ষার্থী ও নারী অধিকারকর্মীরা অংশ নেন।
রবিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য এলাকা থেকে ঝাড়ু হাতে মিছিলটি শুরু হয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। মিছিলে যেই স্লোগানটি সবার নজর কাড়ে সেটি হচ্ছে
“কেমন হ্যাকার করলো হ্যাক, বেশ্যা ডেকেই আইডি ব্যাক”।
মানববন্ধনের মিছিলকারীরা জামায়াতে ইসলামীর নারীবিরোধী বক্তব্য ও রাজনীতির তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং দলটির আমিরের প্রকাশ্য ক্ষমা দাবি করেন।
“এটা শুধু মন্তব্য নয়, আদর্শের বহিঃপ্রকাশ”
বক্তারা বলেন, জামায়াতে ইসলামীর আমিরের সাম্প্রতিক বক্তব্য বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি দলটির দীর্ঘদিনের নারীবিদ্বেষী ও বৈষম্যমূলক আদর্শেরই প্রতিফলন।
অধিকার কর্মী সুস্মিমা সরকার অভিযোগ করে বলেন, নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণকে ‘ব্যভিচার’ বা ‘নৈতিক অবক্ষয়’ হিসেবে দেখানো সরাসরি নারীর মর্যাদা, সংবিধান ও মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থী।
এক নারী শিক্ষার্থী বলেন, “যে রাজনৈতিক দল কর্মজীবী নারীদের ‘বেশ্যা’ বলতে পারে, তারা কখনোই নারীর নিরাপত্তা বা সমান অধিকার নিশ্চিত করতে পারে না।”
মিছিল থেকে স্পষ্টভাবে দাবি জানানো হয়—জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানকে তার বক্তব্যের জন্য নিঃশর্তভাবে ক্ষমা চাইতে হবে। অন্যথায় দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই প্রতিবাদ আরও বিস্তৃত হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন আন্দোলনকারীরা।
নারী অধিকারকর্মীরা বলেন, এ ধরনের বক্তব্য সমাজে নারীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও সহিংসতা উসকে দিতে পারে, যা রাষ্ট্রের দায়িত্বহীন ব্যর্থতাকে আরও গভীর করবে।
নির্বাচনের আগে ভোটারদের প্রতি আহ্বান
সমাবেশে বক্তারা সাধারণ ভোটারদের উদ্দেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানান। তাদের মতে, যে দল নারীদের নেতৃত্ব, স্বাধীনতা ও কর্মজীবনকে অস্বীকার করে, তারা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক যোগ্যতা রাখে না।
এক ছাত্রনেত্রী বলেন, “নারীবিরোধী রাজনীতি শুধু নারীদের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য বিপজ্জনক। ভোটের মাধ্যমেই এর জবাব দিতে হবে।”
আল জাজিরা সাক্ষাৎকারে নারীদের নেতৃত্ব ‘অসম্ভব’
আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জামায়াত আমির স্পষ্টভাবে বলেন, জামায়াতে ইসলামীর কাঠামোয় নারীরা কখনো আমির বা শীর্ষ নেতা হতে পারবেন না। তার যুক্তি—আল্লাহ পুরুষ ও নারীকে ভিন্ন দায়িত্ব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন; নারীদের প্রধান দায়িত্ব সন্তান জন্মদান ও লালন-পালন, যা নেতৃত্বের মতো দায়িত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এই বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে কোনো নারী প্রার্থী না দেওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
‘বেশ্যা’ মন্তব্য ও বিতর্কিত পোস্ট
এই বক্তব্যের রেশ কাটতে না কাটতেই জামায়াত আমিরের ভেরিফায়েড এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে একটি পোস্ট প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়—
“We do not think women should come in the leadership… Allah did not permit this… when women are pushed out of the home in the name of modernity, they are exposed to exploitation… It’s nothing but another form of prostitution…”
পোস্টটিতে নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণকে সরাসরি ‘আরেক ধরনের ব্যভিচার (prostitution)’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। একই সঙ্গে #BuildingBangladeshTogether এবং #Jamaat2026 হ্যাশট্যাগ ব্যবহৃত হওয়ায় এটিকে জামায়াতের নির্বাচনী প্রচারণার অংশ বলেই মনে করছেন অনেকে।
আধা ঘণ্টায় ইউ-টার্ন: ‘অ্যাকাউন্ট হ্যাকড’ দাবি
পোস্টটি প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভ, সমালোচনা ও বিদ্রূপ শুরু হয়। মাত্র আধা ঘণ্টার মাথায় পোস্টটি ডিলিট করে একই অ্যাকাউন্ট থেকে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়, যেখানে বলা হয়—
“The account of the Ameer-e-Jamaat was recently hacked…”
এই ‘হ্যাকিং’ দাবিকে অনেকেই বিশ্বাসযোগ্য মনে করছেন না। কারণ, অ্যাকাউন্টটি এর আগে ও পরে স্বাভাবিকভাবে পোস্ট করতে থাকে এবং বিতর্কিত বক্তব্যটি আল জাজিরা সাক্ষাৎকারে দেওয়া অবস্থানের সঙ্গেই পুরোপুরি মিলে যায়। একই ধরনের বক্তব্য দেশের শীর্ষ গণমাধ্যম—The Daily Star, Prothom Alo, TBS News—এও আগে প্রকাশিত হয়েছে।
নারী অধিকারকর্মীদের মতে, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বরং জামায়াতে ইসলামীর দীর্ঘদিনের আদর্শিক অবস্থানেরই প্রকাশ।
বক্তারা অভিযোগ করেন, অতীতে বিভিন্ন সময়ে জামায়াত ও এর ছাত্রসংগঠনের নেতাদের মুখে— ডাকসুর ছাত্রীদের ‘বেশ্যা’, নারী সংস্কার কমিশনের সদস্যদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, নারীদের স্বাধীনতা ও কর্মসংস্থানকে ‘বেশ্যাবৃত্তি’ হিসেবে বলা হয়েছে।
ঝাড়ু মিছিল শেষে অংশগ্রহণকারীরা জানান, নারীর মর্যাদা ও সমান অধিকারের প্রশ্নে তারা কোনো আপস করবেন না। জামায়াতে ইসলামীর নারীবিরোধী রাজনীতির বিরুদ্ধে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ আরও জোরদার করার ঘোষণাও দেন তারা।
