২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেসক্লাবে আমরা প্রকাশকরা এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে কথা বলেছি। বইমেলা আমাদের আবেগের জায়গা, কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা আজ আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে দিয়েছে।
🛑 প্রকাশনা শিল্পের অজানা অধ্যায়
ইতিহাস সাক্ষী, শিল্প-সাহিত্য কখনোই কেবল ‘বাজার অর্থনীতি’র ওপর নির্ভর করে টিকে থাকেনি। প্রাচীনকাল থেকেই শাসকরা সুকুমারবৃত্তির চর্চায় অঢেল পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। কারণ তাঁরা জানতেন, একটি জাতির মেধা ও মনন সেই জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ।
👉 বিগত সরকারসমূহের সুদৃষ্টির অভাবে আমাদের দেশে কোনো ‘রিডিং সোসাইটি’ গড়ে ওঠেনি। অথচ উন্নত দেশগুলো ঊনবিংশ শতাব্দী থেকেই পাবলিক লাইব্রেরি আইন, প্রতিটি পাড়া-মহল্লা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লাইব্রেরি স্থাপন, প্রকাশক সুরক্ষা আইন (যেমন: ফ্রান্সের ল্যাং ল), রাষ্ট্রীয় ক্রয় নীতি, পাবলিক লেন্ডিং রাইট (PLR) এবং ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট ও এনডাওমেন্টের (যেমন: NEA, Book Trust) মাধ্যমে একটি শক্তিশালী পাঠক সমাজ তৈরি করেছে। যার সুফল হিসেবে সেসব দেশে আজ কোটি কোটি বইয়ের বাজার তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে আমরা ৩০০ কপি বই বিক্রি করতেও হিমশিম খাচ্ছি।
👉 বাইরে থেকে অনেকেই ভাবেন প্রকাশকরা বুঝি খুব ভালো আছেন। কিন্তু ভেতরের চিত্রটি বড়ই করুণ—
📉 আন্তর্জাতিক ‘সিইও ওয়ার্ল্ড’ ইনডেক্সে ১০২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭তম (তলানিতে)!
📉 দেশে প্রকাশিত ৯৫% বইয়ের প্রথম মুদ্রণ মাত্র ৩০০ কপি হয়।
📉 এর মধ্যে ৭০% বইয়ের এই ৩০০ কপিও বিক্রি হয় না!
📉 বিগত দেড় বছরে বই বিক্রি ৬০% কমে যাওয়ায় অনেক প্রকাশক আজ নিঃস্ব।
চরম আর্থিক ঝুঁকি নিয়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সঞ্চয় ভেঙে এই শিল্প টিকিয়ে রাখাটা কেবল ব্যবসায়িক লাভ-ক্ষতির হিসাব নয়, বরং সাহিত্যের প্রতি আমাদের গভীর ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা।
⚠️ কেন আমরা ঈদের পরে মেলা চাই? (মানবিক ও বাস্তবসম্মত কারণ)
👉 ১️ আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা (💰): ফেব্রুয়ারিতে রোজা ও সামনেই ঈদ। এই সময়ে সাধারণ মানুষের বাজেট থাকে মূলত পোশাক ও খাবারে। তার ওপর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় মেলা থাকবে তার প্রধান প্রাণশক্তি—পাঠকদের শূন্যতায়।
👉 ২️ মানবিক ও ধর্মীয় দিক (🤲): মেলার স্টলকর্মীরা মূলত শিক্ষার্থী। সারাদিন রোজা রেখে, ইফতার ও তারাবিহ নামাজের পর তাদের দিয়ে কাজ করানো অমানবিক। তাছাড়া ঈদের আগে তারা পরিবারের কাছে ফিরতে চাইবে। আমরা কি জোর করে তাদের অধিকার ক্ষুণ্ন করব?
👉 ৩️ লজিস্টিক সংকট (🏗️): নির্বাচনের কারণে শ্রমিক ও নির্মাণসামগ্রীর তীব্র সংকট। এই অস্থিতিশীল সময়ে তাড়াহুড়ো করে মেলা সাজানো অসম্ভব।
✊ আমাদের সম্মিলিত অবস্থান
এটি কেবল গুটিকয়েক প্রকাশকের দাবি নয়। ২৬২ জন সৃজনশীল প্রকাশক এবং ‘বাপুস’ একাত্ম হয়ে এই দাবি জানিয়েছে।
✅ আমাদের ৪-দফা দাবি:
১. 🗓️ বাপুস ও ২৬২ জন প্রকাশকের দাবির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বইমেলা ঈদুল ফিতরের পর আয়োজন করতে হবে।
২. 🏚️ প্রকাশকদের ভঙ্গুর দশা বিবেচনায় স্টল ভাড়া মওকুফ এবং সরকারি খরচে ‘সম্পূর্ণ কাঠামো’ তৈরি করে দিতে হবে।
৩. 🔖 শিক্ষার্থীদের বইমুখী করতে বিশেষ ‘বই-ভাতা’ চালু করতে হবে।
৪. 📚 আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে সরকারিভাবে প্রতিটি মানসম্মত বইয়ের ন্যূনতম ৩০০ কপি ক্রয় করতে হবে।
🏛️ পরবর্তী পদক্ষেপ:
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে সমাধান না পেয়ে আজ আমরা মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহম্মদ ইউনূস-এর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছি। তিনি একজন লেখক, আমরা বিশ্বাস করি তিনি আমাদের এই রক্তক্ষরণ অনুভব করবেন।
🙏 শেষ কথা:
এই চরম ভঙ্গুর অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়েই আজ আমরা অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছি। তাই আজ কেবল প্রকাশকদের স্বার্থে নয়, বরং শিল্প-সাহিত্যের বৃহত্তর স্বার্থে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা আদায় এবং এবারের বইমেলা ঈদের পরে আয়োজনের দাবিতে লেখক-পাঠকসমাজকেও আজ সোচ্চার হতে হবে।
👉 আমরা অবশ্যই বইমেলা চাই, কিন্তু লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে ধ্বংস হতে চাই না। আমাদের দাবি মেনে ৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ঈদের পরে বইমেলার করার সরকারি ঘোষণা না এলে সাধারণ প্রকাশকদের পক্ষে মেলায় অংশ নেওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।
