নির্বাচন পরবর্তি সহিংতা ও সংখ্যলঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে শংকা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রবাসীরা। ফোরাম ফর স্যাকুলার বাংলাদেশ ইউকের উদ্যোগে লন্ডনে সাংবাদিকদের সাথে লন্ডনে এক মতবিনিময়ে এ উদ্বেগ কথা বলেন সুধীজন।
গতকাল ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ লন্ডন সময় সন্ধ্যা ৭ঘটিকায়, পূর্বলন্ডনের লন্ডনবাংলা প্রেসক্লাবে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রবাসীরা এই উদ্ভেগ প্রকাশ করে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে ও নির্বাচন পরবর্তীতে বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার, রাজনৈতিক দল ও দেশপ্রেমিক সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সিভিল সোসাইটি সংগঠন সমুহকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহবান জানিয়েছেন।
ফোরাম ফর স্যাকুলার বাংলাদেশ ইউকের প্রেসিডেন্ট সৈয়দ এনামুল ইসলামের সভাপতিত্বে ও শাহ মুস্তাফিজুর রহমান বেলালের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় বক্তব্য রাখেন কাউন্সিলার পুষ্পিতা গুপ্তা, প্রশান্ত পুরকায়েস্ত বিইম, অ্যাডভোকেট মুজিবুল হক মনি, সুশান্ত দাস গুপ্ত, সৈয়দা নাজনিন সুলতানা শিখা, রবিন পাল, ড. হাসনিন চৌধুরী, আব্দুল বাসির, সাজেদুর রহমান. ড. আনসার আহমেদ উল্লাহ প্রমুখ।
আলোচকরা বলেন, বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও বাস্তুচ্যুতির ধারাবাহিক প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে যা নির্বাচন-পরবর্তী সাম্প্রদায়িক সহিংসতার গুরুতর ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
উদাহরণ দিয়ে বলা হয়, গত ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর ব্যাপক সহিংসতার মতো ঐতিহাসিক নজির প্রমাণ করে — রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় সংখ্যালঘুদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা না থাকলে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং যুক্তরাজ্যের সংসদীয় কমিটিগুলোর তদন্তে দেখা গেছে, সে সময় হিন্দুদের ঘরবাড়ি, মন্দির ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিকল্পিত লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয় । নারী ও শিশুদের উপর যৌন সহিংসতা ও হুমকির ঘটনাও ঘটে। অপরাধীদের জবাবদিহিতা ছিল অত্যন্ত সীমিত এবং বহু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বারবার হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে রয়েছে হত্যা, গণপিটুনি, অগ্নিসংযোগ ও বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (HRSS) এবং হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ (BHBCUC) সহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু অধিকার সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ৩,০০০-এর বেশি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা, ৫০০-এর বেশি যৌন সহিংসতার মামলা এবং কয়েক দশ হাজার মানুষের বাস্তুচ্যুতির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পাশাপাশি বাংলাদেশে সার্বিক জননিরাপত্তার পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটেছে। পুলিশ স্টেশন থেকে আগ্নেয়াস্ত্র লুট, উগ্রবাদী যোগাযোগ থাকা বন্দিদের পলায়ন এবং জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ, হিযবুত তাহরীর, AQIS ও আইএস-সম্পর্কিত নেটওয়ার্কসহ ইসলামপন্থী চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা নির্বাচনী সময়ে সংখ্যালঘুদের জন্য ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে। স্বাধীন পর্যবেক্ষকরাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুতর ঘাটতি ও জবাবদিহির অভাবের কথা উল্লেখ করেছেন। পুলিশের দেরিতে বা অসংগত প্রতিক্রিয়া এবং সাম্প্রদায়িক অপরাধকে রাজনৈতিক বিরোধ হিসেবে ভুল ভাবে চিহ্নিত করার প্রবণতা উদ্বেগজনক।
গত এক সপ্তাহে প্রচারিত আল জাজিরা ও বিবিসি বাংলার সরেজমিন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বর্তমানে হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘু ভোটাররা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের কারণে আসন্ন নির্বাচনে তাঁদের অংশগ্রহণ গুরুতরভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যথাযথ পদক্ষেপ নিলে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা থেকে সংখ্যালঘুদের রক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু আশঙ্কার ব্যাপার হচ্ছে নির্বাচনের দুই দিন আগেও সংখ্যালঘুদের উপর আসন্ন বিপদ নিয়ে সর্বমহলে আশ্চর্য্য নিরবতা বিরাজ করছে।
সংগঠনের পক্ষ থেকে যুক্তরাজ্য বাংলাদেশী ডায়াস্পোরা সংশ্লিষ্ঠ সকল মহলকে সহিংসতা সম্পর্কে অভিহিত করা ও এই বিপদ থেকে সংখ্যালঘুদের রক্ষার উদ্যোগ নেবার আহবান জানিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এর আগে বাংলাদেশ সরকার, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মহামান্য সরকারের নিকট স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেওয়া স্মারকলিপিতে যুক্তরাজ্য সরকারের প্রতি কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্বাচন-সংক্রান্ত সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার বার্তা দিয়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করা, বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় সংখ্যালঘু সুরক্ষার বিষয়টি দেওয়া, স্বাধীন নির্বাচন ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমে সহায়তা প্রদান এবং সংখ্যালঘু অধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদনকারীদের সঙ্গে সহযোগিতা উৎসাহিত করা।
স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, “যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে দ্রুত ও দৃঢ় সম্পৃক্ততা নবায়িত সাম্প্রদায়িক সহিংসতা প্রতিরোধ করতে পারে এবং বাংলাদেশে একটি শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে সহায়তা করতে পারে। গণহামলা, চরমপন্থী তৎপরতা ও দায়মুক্তির পুনরাবৃত্তি স্পষ্টভাবে দেখায় যে, বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘু এখনো তীব্র ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
সহিংসতা প্রতিরোধে সুপারিশঃ
১। সরকার প্রধান ও সেনা প্রধানকে প্রকাশ্যে অংগীকার করতে হবে কোন অযুহাতেই সংখালঘু নির্যাতন নয় । ২। ঝুকিপুর্ণ সংখ্যালঘু এলাকায় ভোটের পর ১৫ দিন পর্যন্ত বিজিবি পুলিশ র্যাব মোতায়েন রাখতে হবে। ৩। মুল প্রতিদ্বন্ধী রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিতে হবে হার জিত যাই হোক সংখ্যালঘুদের দায়ী করা হবে না এবং কোন সহিংসতা করা হবে না। ৪। দেশপ্রেমিক সামাজিক সাংস্কৃতিক ও সিভিল সোসাইটি সংগঠন কে ঝুকিপুর্ণ এলাকায় সংখালঘু নিরাপত্তা বেস্টনি গড়ে তুলতে হবে।
