নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ, নতুন সরকারের সম্ভাব্য যাত্রা এবং তার মধ্যেই আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা ইস্যু—বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা যেন এক বহুমাত্রিক সমীকরণে দাঁড়িয়ে গেছে। উপরিভাগে এটি একটি আইনি প্রশ্ন—কোনো দল নিষিদ্ধ থাকবে কি থাকবে না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে এটি ক্ষমতার ভারসাম্য, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, ভবিষ্যৎ নির্বাচনী প্রতিযোগিতা এবং জাতীয় পুনর্মিলনের প্রশ্ন।
ল্যান্ডস্লাইড বিজয়ের পরপরই তারেক রহমানকে যে প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হতে হচ্ছে—আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন, বিচার প্রক্রিয়া—তা মোটেও আকস্মিক নয়। বরং বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষমতার দায়ও এসে পড়েছে তার কাঁধে। বিদেশি সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তার “আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে” ধরনের কৌশলী জবাব ইঙ্গিত দেয়—বিএনপি সরাসরি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের দায় নিতে চাইছে না; বরং বিচারব্যবস্থাকে সামনে রেখে সময় নিতে চাইছে।
এখানেই আন্তর্জাতিক ফ্যাক্টরটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কমনওয়েলথ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশন—উভয় পক্ষই কার্যত একই বার্তা দিয়েছে: বড় কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ রেখে গণতন্ত্র পূর্ণতা পায় না। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পূর্বশর্ত হলো প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমান মাঠ। তাদের সুপারিশ বিএনপির জন্য কূটনৈতিকভাবে উপেক্ষা করা কঠিন। কারণ নতুন সরকার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নে পশ্চিমা দুনিয়ার সমর্থন চায়।
ফলে বিএনপি এখন এক ধরনের “দুই পথে হাঁটার” কৌশলে এগোচ্ছে বলে রাজনৈতিক মহল মনে করছে।
প্রথম পথ: আইনি বৈধতা
অন্তর্বর্তী সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল—কিন্তু আইনে দল নিষিদ্ধের স্পষ্ট বিধান নেই। ফলে আদালতে গেলে নিষেধাজ্ঞা টিকবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। বিএনপি যদি আদালতের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করায়, তাহলে তারা বলতে পারবে—“এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, আইনি রায়।” এতে আন্তর্জাতিক চাপও সামলানো যাবে, আবার সরাসরি রাজনৈতিক দায়ও এড়ানো যাবে।
দ্বিতীয় পথ: রাজনৈতিক পুনর্মিলন (রিকনসিলিয়েশন)
সূত্র বলছে, কমনওয়েলথের সুপারিশের পর বিএনপি জাতীয় পুনর্মিলনের উদ্যোগ নিতে পারে। এটি করলে তারা আন্তর্জাতিক মহলে “ইনক্লুসিভ ডেমোক্রেসি”-র বার্তা দিতে পারবে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক পুনরুজ্জীবনকে নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে রাখা সম্ভব হবে।
তবে এই সমীকরণ এত সহজ নয়।
মাঠের রাজনীতি ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। এনসিপির অভিযোগ—বিএনপি গোপন আঁতাতের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম পুনরায় চালুর পথ করে দিচ্ছে—যদিও এটি প্রমাণিত নয়, কিন্তু রাজনৈতিক সন্দেহের বীজ বপন করেছে। গুলিস্তানে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে পতাকা উত্তোলনের ঘটনাও প্রতীকীভাবে দেখিয়েছে—দলটি পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় নয়; অপেক্ষায় আছে রাজনৈতিক সুযোগের।
আরেকটি বাস্তবতা হলো—আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা শুধু সাংগঠনিক নয়, মনস্তাত্ত্বিকও। ১৮ মাস ধরে অফিস পরিত্যক্ত, নেতাকর্মী গোপনে, মামলা ঝুলছে—এই পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে দলটি হয় ভেঙে যেত, নয়তো আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্কে শক্ত হতো। আন্তর্জাতিক মহল দ্বিতীয় ঝুঁকিটিকেই বেশি ভয় পায়—কারণ নিষিদ্ধ রাজনীতি প্রায়ই চরমপন্থায় রূপ নেয়।
এখানে শেখ হাসিনার বিচার প্রশ্নটি পুরো সমীকরণকে আরও জটিল করেছে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক আদালতের প্রশ্ন, দুর্নীতির মামলা—সব মিলিয়ে নতুন সরকার যদি কঠোর বিচারপথে যায়, তাহলে রাজনৈতিক মেরুকরণ তীব্র হবে। আর যদি নরম অবস্থান নেয়, তাহলে নিজস্ব সমর্থকগোষ্ঠীর ক্ষোভ বাড়বে। ফলে বিএনপির সামনে “বিচার বনাম স্থিতিশীলতা” দ্বন্দ্বও স্পষ্ট।
সব মিলিয়ে বর্তমান বাস্তবতায় কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে—
আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘমেয়াদে টিকবে না — আইনি বা রাজনৈতিক কোনো না কোনো পথে তা শিথিল হবে।
আন্তর্জাতিক চাপ বাস্তব — নতুন সরকার তা উপেক্ষা করার অবস্থায় নেই।
বিএনপি সময় কিনছে — সরাসরি সিদ্ধান্ত না নিয়ে প্রক্রিয়াগত পথ বেছে নিচ্ছে।
রিকনসিলিয়েশন আলোচনায় আসবে — তবে নিয়ন্ত্রিত কাঠামোয়।
বিচার প্রশ্ন হবে সবচেয়ে স্পর্শকাতর ইস্যু — যা ভারতসহ আঞ্চলিক কূটনীতিকেও প্রভাবিত করবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—বাংলাদেশ কি প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে প্রতিযোগিতার রাজনীতিতে ফিরবে?
যদি নিষেধাজ্ঞা উঠে, প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঠ সমান হয়, বিচার হয় আইনের শাসনে—তাহলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে। আর যদি নিষেধাজ্ঞা, মামলা ও প্রতিহিংসা রাজনৈতিক অস্ত্র হয়—তাহলে বিজয়ীও নিরাপদ থাকবে না, পরাজিতও নিশ্চিহ্ন হবে না; বরং অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হবে।
নতুন সরকারের প্রথম বড় পরীক্ষা তাই অর্থনীতি নয়, কূটনীতিও নয়—রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি বনাম ক্ষমতার একচেটিয়াত্ব—এই সিদ্ধান্তই ঠিক করবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পরবর্তী অধ্যায়।(আজকের কণ্ঠ)
