মো. মেহেদী হাসান সোহেল জনি
🔳ইতিহাসে এমন কিছ চরিত্র থাকেন, যাদের জীবন কেবল ব্যক্তিগত জীবনের গল্প নয়—বরং একটি জাতির উত্থান, সংগ্রাম এবং স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি।
🔳শেখ মুজিবুর রহমান তেমনই একটি নাম, একটি ইতিহাস। তাঁর নেতৃত্বে আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন দেশ, একটি পতাকা এবং একটি জন্মপরিচয়।
🔳গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্ম নেন শিশু মুজিব। তখন কেউ কল্পনাও করেনি—গ্রামের সেই শিশুটি একদিন বাংলাদেশের জন্মের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবেন।
🔳সেই ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল। ১৯৩০–এর শেষ দিকে তৎকালীন বাংলার অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে পরিচয় তার রাজনৈতিক দর্শনে নতুন মোড় এনে দেয়। সোহরাওয়ার্দীর কাছ থেকেই শেখ মুজিব শিখেছিলেন—রাজনীতি কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি মানুষের অধিকার, মর্যাদা এবং ন্যায়ের প্রশ্ন।
🔳১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে এবং পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু খুব দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে ওঠে—পূর্ব বাংলার মানুষ নতুন রাষ্ট্রেও সমান অধিকার পাচ্ছে না। ভাষা, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার ক্ষেত্রে বৈষম্য দিন দিন বাড়তে থাকে। এর ফলে পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ জমতে থাকে।
🔳এই বাস্তবতা তরুণ শেখ মুজিবকে আরও দৃঢ় করে তোলে। ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময় তিনি সরাসরি আন্দোলনে যোগ দেন। বাংলা ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়ন শুরু হলে ধর্মঘট পালনকালে গ্রেফতার হন শেখ মুজিব। কিন্তু জেল, মামলা কিংবা ভয়—কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। মানুষের অধিকার ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর সংকল্প তখন থেকেই আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে।
🔳 ঢাকার রোজ গার্ডেনে ১৯৪৯ সালে গঠিত হয় একটি নতুন রাজনৈতিক দল—পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। দলের সভাপতি হন আবদুল হামিদ খান ভাসানী। তরুণ শেখ মুজিব তখন কারাগারে থাকলেও তাকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয়।
🔳পরবর্তীতে অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতিফলন হিসেবে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে “মুসলিম” শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। এই দলটিই পরবর্তীতে হয়ে ওঠে বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।
🔳১৯৬০–এর দশকে পাকিস্তানের রাজনীতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শেখ মুজিব ঘোষণা করেন বাঙালির মুক্তির সনদ—ঐতিহাসিক ছয় দফা। এই কর্মসূচি ছিল স্বায়ত্তশাসনের দাবি, যা পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর কাছে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
🔳১৯৬৮ সালে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় অগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। অভিযোগ—রাষ্ট্রদ্রোহ। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের তীব্র আন্দোলনের মুখে ২২ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খানের সরকার মামলাটি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।
🔳মুক্তির পরদিন ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক বিশাল ছাত্র-জনতার সংবর্ধনায় শেখ মুজিবুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
এরপর আসে ১৯৭০ সালের নির্বাচন।
🔳পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম বড় গণতান্ত্রিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরকে ঘিরে শুরু হয় তালবাহানা, যা দেশকে দ্রুত গভীর রাজনৈতিক সংকটে ফেলে দেয়।
🔳তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ১ মার্চ
আকস্মিকভাবে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন।
🔳এতে পূর্ব বাংলার জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক স্বাধীনতার যুদ্ধ হয়েছে। কোথাও বিপ্লব, কোথাও গৃহযুদ্ধ, কোথাও দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাত। কিন্তু বাঙালির স্বাধীনতার গল্পটা আলাদা।
🔳এর পেছনে ছিল বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ পরিকল্পনা, ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়া কৌশল, আর একটি জাতিকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তোলার অসাধারণ নেতৃত্ব।
🔳উত্তাল মার্চে বিক্ষুব্ধ বাংলায় বিদ্রোহ-বিক্ষোভের তরঙ্গ প্রবহমান টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত। দেশজুড়ে বঙ্গবন্ধুর ডাকা অসহযোগ আন্দোলন চলছে। পাশাপাশি চলছে চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রস্তুতি কোর্ট, কাচারি, অফিস-আদালত বন্ধ।
🔳দেশের এমন কোন প্রান্ত নেই যেখানে পাক হানাদারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মিছিল-মিটিং-সমাবেশ হচ্ছিল না।
🔳মুক্তিপাগল বাঙালীর দৃষ্টি ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে বঙ্গবন্ধুর পরবর্তী নির্দেশের।
🔳১৯৭১ সালের ৭ মার্চ। পুরো জাতি ছিল অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ। সারা দেশ থেকে আগত লক্ষ লক্ষ মানুষ রেসকোর্স ময়দানে জড়ো হয়েছিল।
🔳অবশেষে তিনি এলেন—মহানায়ক, বাঙালির প্রাণের নেতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
🔳তার দরাজ কণ্ঠে উচ্চারিত হলো সেই অমর কবিতাখানি
“এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
🔳৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করার অসাধারণ শৈল্পিক ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার জন্য ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের নিউজউইক ম্যাগাজিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে “পোয়েট অফ পলিটিক্স” বা “রাজনীতির কবি” হিসেবে আখ্যায়িত করে।
🔳শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো।
🔳অবশেষে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের গভীর রাতে হানাদার বাহিনী শুরু করে কুখ্যাত সামরিক অভিযান ‘অপারেশন সার্চলাইট’।
🔳সেই রাতেই ঢাকা শহর পরিণত হয় এক বিভীষিকাময় নগরীতে।
🔳ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর চালানো হয় ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ, গ্রেপ্তার, নির্যাতন এবং ধ্বংসযজ্ঞ।
🔳কিন্তু এই বর্বরতা বাঙালিকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বরং সেই রক্তাক্ত রাতই বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রামকে আরও সুদৃঢ় করে তোলে।
🔳এই সহিংসতার মধ্য দিয়েই শুরু হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক রক্তাক্ত অধ্যায়, যা শেষ পর্যন্ত নয় মাসের সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে জন্ম দেয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র—বাংলাদেশ।
🔳১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের প্রায় দুই বছর আগেই দেশের নাম বাংলাদেশ ঘোষণা করেছিলেন স্বাধীনতার স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
🔳১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের একটি আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ব পাকিস্তানের পরিবর্তে এই ভূখণ্ডের নাম বাংলাদেশ ঘোষণা করেন।
🔳পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফেরেন বঙ্গবন্ধু। জাতির পিতার প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয় পূর্ণতা লাভ করে।
🔳কিন্তু ইতিহাস কখনো কখনো নির্মম হয়ে ওঠে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী সদস্যের
সামরিক অভ্যুত্থানে সপরিবারে নিহত হন শেখ মুজিবুর রহমান।
🔳সেই ঘটনার সঙ্গে শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার জীবনই শেষ হয়নি—বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়েরও আকস্মিক পরিসমাপ্তি ঘটে।
🔳বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দীর্ঘ সময় ধরে দেশের পাঠ্যপুস্তক, সংবাদমাধ্যম এমনকি চলচ্চিত্র থেকেও তাঁর নাম ও ছবি প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে যেন সচেতনভাবেই আড়াল করে রাখা হয়েছিল।
🔳তেমনি সাম্প্রতিক সময়েও বঙ্গবন্ধু ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মুছে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে একাত্তরের পরাজিত শক্তি।
🔳২০২৪ সালের জুলাইয়ে ঘটে যাওয়া মেটিকুলাস ডিজাইনের পর সেই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
🔳যে ঐতিহাসিক ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল, সেই স্থানটিকে আগুনে পুড়িয়ে ও বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
🔳ভেঙে ফেলা হয় বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের শত শত ভাস্কর্য ।এছাড়াও বাতিল করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে পালিত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দিবস। এমনকি বাঙালির দেওয়া ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিও পাঠ্যবই থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে, শত্রুর যতই চেষ্টা হোক, যতই ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হোক শত চেষ্টা করেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুছে ফেলতে পারবে না কেউ। তার নাম, আদর্শ এবং স্বপ্ন এখনও বাঙালির হৃদয়ে অমলিন।
🔳বাংলাদেশে তাঁর প্রতিচ্ছবি চিরকালই জীবন্ত হয়ে থাকবে—ইতিহাসের প্রতিটি পৃষ্ঠায়, মানুষের হৃদয়ের গভীরে, স্বাধীনতার প্রতিটি উচ্চারণে এবং জাতির আত্মপরিচয়ে।
