অরুন্ধতী রায়
যে কোনো দিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আক্রমণ করতে পারে, আর পৃথিবী বদলে যাবে। আমরা যা কিছু জানি বলে মনে করি—আমাদের তর্ক, আমাদের ইতিহাস, আমাদের সংস্কৃতি—সবকিছুই আগামী কয়েক বছরে বদলে যেতে পারে। আমাদের বুঝতে হবে, আমরা এক গভীর পরিবর্তনের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছি।
দশকের পর দশক ধরে আমি এই দেশকে বদলে যেতে দেখেছি। পঞ্চাশের দশকে আমরা ভূমি সংস্কারের কথা বলতাম। আমরা বিশ্বাস করতাম, কারও হাতে বিপুল জমি থাকবে আর অন্যরা জমিহীন থাকবে—এটা হতে পারে না। জমি পুনর্বণ্টন করতে হবে। ষাটের দশকের শেষদিকে নকশাল আন্দোলন “চাষির হাতে জমি” স্লোগান তুলে বিপ্লবের দাবি করেছিল। সেটি দমন করা হলো। তারপর এলো নর্মদা ও উচ্ছেদবিরোধী আন্দোলন। মানুষ বেশি কিছু চাইছিল না—তারা শুধু তাদের যা ছিল, তা ধরে রাখতে চেয়েছিল। সেটিও দমন করা হলো। এরপর এলো এনআরইজিএ—জমি নেই, মৌলিক অধিকার নেই, কাঠামোগত পরিবর্তন নেই—শুধু বছরে কিছুদিন কাজের প্রতিশ্রুতি। এখন সেটিও ভেঙে দেওয়া হচ্ছে।
আজ আমরা আরও মৌলিক কিছুর জন্য লড়ছি—আমাদের নাগরিকত্বের জন্য। আমরা ভোটার তালিকায় নাম রাখার অধিকারের জন্য লড়ছি। আমরা এখানে এসে দাঁড়িয়েছি। মানুষ আমাকে উদযাপন করে—এ জন্য আমি কৃতজ্ঞ। একজন লেখক হিসেবে হয়তো আমাকে সফল বলা হয়। কিন্তু আমি যা লিখেছি—যেসব বিষয়ে সতর্ক করেছি—সেই অর্থে আমি সম্পূর্ণ ব্যর্থ। কারণ যা আশঙ্কা করেছিলাম, সেটাই ঘটছে।
আর আগামীকাল শুধু এই দেশ নয়—দুই-তিন বছরের মধ্যেই সবকিছু বদলে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা, আন্তর্জাতিক আইন, এমনকি “তথ্য” বলে যে যৌথ ভিত্তির ওপর আমরা তর্ক করি—সেই ভিত্তিই ভেঙে পড়ছে। আমি নিজেই এমন ছবি দেখি, যেগুলো আমার নয়। এমন লেখা দেখি, যা আমি লিখিনি। এমন ভিডিও দেখি, যেখানে আমাকে এমন কথা বলতে দেখা যায়, যা আমি বলিনি। সবই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি।
আমাদের বুদ্ধিমত্তা, আমাদের ইতিহাস, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের সঙ্গীত, আমাদের বিজ্ঞান—সবকিছুই কর্পোরেট মালিকানার অধীনে চলে যেতে পারে। আমরা যদি না বুঝি যে এখন আর কোনো স্থিতিশীল যৌথ সত্য নেই, যার ওপর দাঁড়িয়ে আমরা বিতর্ক করতে পারি—তাহলে আমরা এই পরিবর্তনের গভীরতা উপলব্ধি করতে পারব না। এমনকি মতভেদও এখন বিলাসিতা। কথোপকথনে আর কোনো মিলনবিন্দু নেই। কোনো সাধারণ ভিত্তি নেই। তাহলে আমরা কীভাবে এই দ্রুত এগিয়ে আসা পৃথিবীর মুখোমুখি হব?
সম্ভবত আমরা সেই শেষ প্রজন্ম, যারা সমালোচনামূলক চিন্তার শিক্ষা পেয়েছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন প্রজন্মের সেই ক্ষমতাকে ক্ষয় করছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্কুলশিক্ষকেরা পদত্যাগ করছেন—বলছেন, ছাত্ররা আর গভীরভাবে পড়তে পারে না, একটি অনুচ্ছেদ বিশ্লেষণ করতে পারে না, চিন্তা করতে পারে না। ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে। আমেরিকায় সেগুলোকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করা হচ্ছে। ভিতটাই বদলে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি যুদ্ধের ছায়া ঘনাচ্ছে। ইরান ঘিরে আছে বিমানবাহী রণতরী, সাবমেরিন, শত শত যুদ্ধবিমান। যদি যুদ্ধ শুরু হয়, পৃথিবী অপরিবর্তনীয়ভাবে বদলে যাবে। অন্তত আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।
কেরালা আজ যা—তার একটি কারণ হলো, এটি এখনো অনেকটা সুরক্ষিত, এমনকি উত্তর ভারতে যা ঘটছে তার থেকেও। আমি উত্তর ভারতে থাকি, আর প্রতিদিন দেখি—মানুষ কীভাবে একে অন্যের সঙ্গে কথা বলে। হিন্দুরা কীভাবে মুসলমানদের সঙ্গে কথা বলে। গির্জায় হামলা হয়েছে। মণিপুরে যা হয়েছে আমরা দেখেছি। আগুন জ্বালানো খুব সহজ। আর সেই আগুন যদি আমাদের রাজ্যে জ্বলে ওঠে, কেরালা লেবাননের মতো হয়ে যেতে পারে। আমাদের সেই আগুন জ্বলার আগেই থামাতে হবে।
কখনো কখনো আমার ইচ্ছে করে কেরালা থেকে বাসভর্তি মানুষ নিয়ে উত্তরপ্রদেশ, বিহার, দিল্লি ঘুরিয়ে দেখাই—আমাদের দেশে কী ঘটেছে। রাজনৈতিক দলগুলো একে অন্যকে আক্রমণ করবে—এটাই গণতন্ত্র। কিন্তু কেরালাকে নিয়ে আমার গর্বের জায়গা হলো, আমরা প্রতি পাঁচ বছরে সরকার বদলাই। কিন্তু আমরা “ওই দিল্লির শক্তি” চাই না। আমাদের যা আছে, তা রক্ষা করতে হবে।
ত্রিভান্দ্রামের করপোরেশন নির্বাচনে যা ঘটেছে, তা দেখে আমি গভীরভাবে দুঃখ পেয়েছি। এখান থেকেই লড়াই শুরু করতে হবে। আমাদের রাজনীতি আছে। আমাদের সংস্কৃতি আছে। আমাদের ইতিহাস আছে। আমাদের বুদ্ধিবৃত্তি আছে। আমাদের শিক্ষা আছে। এগুলো হারাতে দেবেন না। এগুলো নিয়ে গর্ব করুন। এগুলো রক্ষা করুন।
“বাড়ি” আমার কাছে কোনো আবেগপ্রবণ ধারণা নয়। আমি একসময় বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম। সাত বছর মায়ের সঙ্গে দেখা হয়নি, কথা হয়নি। বাড়ি ছিল কঠিন। তবু আজও, সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ালেও, যখন কেরালার উদ্দেশে ব্যাগ গোছাই—জানি আমি বাড়ি ফিরছি। কারণ এটি আমার রাজনৈতিক, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক বাড়ি। যখন Malayala Manorama Foundation আমাকে পুরস্কার দেওয়ার কথা বলল, আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, “আপনারা কি নিশ্চিত? আমি তো অর্ধেক মালয়ালি, আর আমি ইংরেজিতে লিখি।” তারা বলেছিল, “আমরা পুরোপুরি নিশ্চিত।” আমি ভাবলাম—এটাই কেরালার বিশ্বনাগরিকতা, এটাই আমাদের সংস্কৃতির সৌন্দর্য।
কয়েক দিন আগে আমি Kolkata-তে ছিলাম। সবাই আমার সঙ্গে বাংলায় কথা বলছিল। আমি বলছিলাম, “না, আমি মালয়ালি।” যদিও অনেকে আমার বাবার পরিবারের সঙ্গে পরিচিত, তবুও আমি মালয়ালি।
উত্তরপ্রদেশের আগের নির্বাচনে Yogi Adityanath বলেছিলেন, “আমাদের ভোট না দিলে উত্তরপ্রদেশ কেরালার মতো হয়ে যাবে।” আমি বলেছিলাম, “তা হলে তো আশা করা উচিত!”
ভাবুন তো, কী ভয়ানক ব্যাপার! আমার মা কেরালায় একটি স্কুল চালান। অসুস্থ হলে তিনি এমন হাসপাতালে যান, যেটি তাঁর ছাত্ররা চালায়। তাঁর চিকিৎসকের সন্তান তাঁর স্কুলে পড়ে। কী ভয়াবহ অবস্থা—তাই না?
ব্যঙ্গটি স্পষ্ট। কিন্তু আমাদের যা আছে, তা খুব সহজেই হারিয়ে যেতে পারে।
এটি হয়তো প্রচলিত সাহিত্যিক ধাঁচের গ্রহণ বক্তৃতা নয়। কিন্তু আমার ভিতরে এক ধরনের ক্রমবর্ধমান আতঙ্ক কাজ করছে—যে কোনো দিন পৃথিবী বদলে যেতে পারে, হয়তো ইরানের ওপর আক্রমণ দিয়েই শুরু হবে। যদি আমরা সচেতন থাকি, প্রস্তুত থাকি—তাহলে তফাৎ গড়ে দেওয়া যায়। সর্বোপরি কথা হলো আমাদের যা আছে, তা রক্ষা করতে হবে; তার জন্য লড়তে হবে।
ইংরেজি থেকে ভাষান্তরিত
