— বাংলাদেশ পার্সপেক্টিভস বিশেষ প্রতিবেদন
২০২৬ সালে বাংলাদেশের রাস্তায়, গ্রামে, এমনকি ঘরের ভেতরেও নারী ও শিশুরা প্রতিনিয়ত আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। কোনো মহল্লা নিরাপদ নয়, দিনের কোনো প্রহরেই নিশ্চিন্তে থাকার উপায় নেই। প্রায় প্রতিদিনই সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে ধর্ষণ, গণধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন এবং ধর্ষণের পর হত্যার মর্মান্তিক ঘটনা। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধের ঢেউ নয় — এটি একটি জাতীয় জরুরি অবস্থা, যা বর্তমান বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকারের শাসনের ফাঁকফোকরকে নির্মমভাবে উন্মোচন করে দিচ্ছে। সরকার “জিরো টলারেন্স”-এর বুলি আওড়াতে থাকলেও শোকার্ত মায়েদের কাছে এবং নির্যাতিত শিশুদের কাছে এই কথাগুলো এখন সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে পড়েছে।
পরিসংখ্যানের ভয়াবহতা: ব্যর্থতার এক নির্মম চিত্র
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ (বিএমপি) এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য-উপাত্ত একটি ভয়াবহ বাস্তবতার ছবি তুলে ধরছে। ২০২৫ সালে সারা দেশে মোট ৭৮৬টি ধর্ষণ ও গণধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৫২.৩ শতাংশ বেশি। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যেখানে মামলা দায়ের হয়েছিল ৫,৫৭০টি, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭,০৬৮টিতে — অর্থাৎ মাত্র এক বছরে বৃদ্ধি পেয়েছে ২৭ শতাংশেরও বেশি। গণধর্ষণের ঘটনা ২০২৪ সালের ১৪২টি থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে হয়েছে ১৭৯টি, আর ধর্ষণের পর হত্যার সংখ্যা ৪৬ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৮-তে।
২০২৬ সালের শুরুতেও এই ভয়াবহ ধারা থামেনি, বরং আরও গতি পেয়েছে। শুধু জানুয়ারি ২০২৬ মাসেই আসক ৩৫টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে, যার মধ্যে ২৫টি একক ধর্ষণ এবং ১০টি গণধর্ষণ, এবং সেই মাসেই ধর্ষণের পর দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। একই মাসে বিএমপি নথিভুক্ত করেছে ৩১টি ঘটনা। ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত প্রায় ১৩ মাসে আসকের হিসাবে মোট ৭৭৬টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, যার প্রায় অর্ধেক ভুক্তভোগী অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু।
তবে এই সংখ্যাগুলো কেবল হিমশৈলের দৃশ্যমান চূড়া মাত্র। মানবাধিকার কর্মীরা বারবার সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, সামাজিক কলঙ্ক, প্রতিশোধের ভয়, দুর্বল পুলিশিং এবং পারিবারিক ও সামাজিক চাপের কারণে বিপুলসংখ্যক ঘটনা রিপোর্টই হচ্ছে না। প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেকগুণ বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শিশুরাই সবচেয়ে বড় শিকার: মাদ্রাসা থেকে বিদ্যালয় — কোথাও নিরাপত্তা নেই
এই সংকটের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিক হলো শিশুদের উপর নির্যাতনের নির্মম ঊর্ধ্বগতি। ২০২৫ সালে মোট ধর্ষণ ভুক্তভোগীদের প্রায় ৭০ শতাংশই ছিল ১৮ বছরের নিচের মেয়েশিশু, যার সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৪৩ জনে — আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪৮ শতাংশ বেশি। জানুয়ারি ২০২৬ মাসেই ৩৫টি ধর্ষণ মামলার মধ্যে ১৩টির ভুক্তভোগী ছিল মাত্র ১২ বছর বা তারও কম বয়সী শিশু। ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ২০২৬ সালের শুরুতে শিশু ধর্ষণের ঘটনা প্রায় ৭৫ শতাংশ বেড়েছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানাচ্ছে।
মেয়েশিশুদের পাশাপাশি ছেলেশিশুরাও এই নিষ্ঠুরতার বাইরে নয়, যদিও তাদের ঘটনাগুলো সমাজের দৃষ্টি থেকে আরও বেশি আড়ালে থেকে যায়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মাদ্রাসাগুলো — যেগুলো শিশুদের সুরক্ষিত আশ্রয় হওয়ার কথা, ইসলামিক ও শরিয়া আইন মেনে শিশুদের সহী ইসলামিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে গোড়ে তোলার কথা — সেগুলোই এখন আতঙ্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। মাদ্রাসাগুলো থেকে একের পর এক শিশু নির্যাতনের ঘটনা সামনে আসছে। সম্প্রতি একাধিক মাদ্রাসা শিক্ষককে ১১ বছর বয়সী শিশু ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় শিক্ষার আলো ছড়ানোর কথা, সেখানেই অন্ধকারের এই ঘটনা গোটা সমাজকে স্তব্ধ করে দিচ্ছে। পথশিশু থেকে শুরু করে বিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থী — কোনো শিশুই এখন কোথাও নিরাপদ নয়।
বিচারহীনতার চক্র: অপরাধীরা কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে?
বিশেষজ্ঞরা এই সংকটের পেছনে বিচারহীনতার সুগভীর সংস্কৃতিকে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। ঢাকায় আয়োজিত বিভিন্ন গোলটেবিল বৈঠকে এটিকে “জাতীয় সংকট” হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। বিচার ব্যবস্থার অসহনীয় দীর্ঘসূত্রিতা এই সংকটকে আরও গভীর করছে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে বিশ্লেষণ করা যৌন সহিংসতার প্রায় শতভাগ মামলায় তদন্ত বা বিচারে উল্লেখযোগ্য বিলম্বের তথ্য পাওয়া গেছে।
ঘটনার ধারাক্রমটি বারবার একইরকম হচ্ছে। ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, ভুক্তভোগী ও তার পরিবার সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে মামলা করতে দ্বিধা করে, পুলিশ গড়িমসি করে, তদন্ত দুর্বল হয়, বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা অপরাধীকে আড়াল করে এবং শেষ পর্যন্ত কোনো শাস্তি হয় না। এই চক্র অপরাধীদের আরও সাহসী করে তুলছে। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় থাকা স্থানীয় অপরাধীরা আইনের নাগালের বাইরে থেকে যাচ্ছে বারবার।
সরকারের প্রতিক্রিয়া সর্বোচ্চ প্রতিক্রিয়াশীল, কখনো প্রতিরোধমূলক নয়। কোনো ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পেলে এবং সরকারের ভাবমূর্তি হুমকিতে পড়লে তখনই মন্ত্রণালয় থেকে শক্ত বিবৃতি আসে। এটি “আইনের শাসন” নয়, বরং “ভাবমূর্তি রক্ষার রাজনীতি”। নাগরিকরা ধীরে ধীরে বুঝতে পারছেন যে বর্তমান সরকার স্থানীয় অপরাধীদের রক্ষা করা পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে হয় অক্ষম, নইলে অনিচ্ছুক।
মানবিক বিপর্যয়: একটি অপরাধ যা একটি পরিবার নয়, গোটা প্রজন্মকে ধ্বংস করে
প্রতিটি পরিসংখ্যানের আড়ালে রয়েছে একটি ভেঙেপড়া জীবনের নীরব আর্তনাদ। ধর্ষণের শিকার প্রতিটি নারী ও শিশু শুধু একটি শারীরিক আঘাত নয়, বরং গভীর মানসিক ক্ষত বহন করে বাকি জীবন পার করে। বহু ভুক্তভোগী সামাজিক একঘরেত্বের শিকার হয়, অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়, অনেক মেয়েশিশুর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় এবং পরিবারগুলো ভেঙে পড়ে। বেঁচে ফেরা মানুষগুলো যখন সাহস করে সামনে আসে, তখন তারা আরও হয়রানির শিকার হয়, পর্যাপ্ত সহায়তা পায় না এবং ন্যায়বিচারের আশায় দিন গোনে।
এই সংকটের প্রভাব কেবল ব্যক্তি বা পরিবারে সীমাবদ্ধ নয়। নারীদের কর্মক্ষেত্রে ও সমাজে অংশগ্রহণ কমে যাচ্ছে, সমাজের পারস্পরিক আস্থা ক্ষয় পাচ্ছে এবং একটি গোটা প্রজন্ম ভয়ের মধ্যে বড় হচ্ছে — যা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলছে।
এখনই যা করতে হবে: জরুরি সংস্কারের দাবি
বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকার সংগঠন ও নাগরিক সমাজ একমত যে কেবল আইন থাকলেই চলবে না, সেই আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার মামলায় দ্রুত বিচার আদালত স্থাপন করে উচ্চ সাজার হার নিশ্চিত করতে হবে। ভুক্তভোগীদের জন্য চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্য সেবা ও আইনি সহায়তার সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পুলিশের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের সংবেদনশীলতার প্রশিক্ষণ দিতে হবে। মামলার স্বাধীন তদারকির জন্য একটি নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করতে হবে এবং অপরাধীদের জন্য রাজনৈতিক আশ্রয়ের সংস্কৃতি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি বিচারহীনতার বিরুদ্ধে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের জন্য দেশব্যাপী সামাজিক সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে।
ভুক্তভোগীদের সংখ্যা বাড়ছে, মহামারিতে রুপ নিয়েছে ধর্ষন
এটি আর কেবল “নারীর সমস্যা” নয় — এটি শাসন, বিচার এবং জাতীয় চরিত্রের সংকট। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও বৈশ্বিক গণমাধ্যমকে এই নিপীড়িত কণ্ঠস্বরগুলো আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে। দাতা সংস্থা ও উন্নয়ন অংশীদারদের উচিত সুরক্ষা ও জবাবদিহিতার পরিমাপযোগ্য উন্নতির সাথে সহায়তা শর্তযুক্ত করা।
বিনীত আলোচনার সময় শেষ হয়ে গেছে। বাংলাদেশের নারী ও শিশুরা নিরাপত্তার জন্য আর্তচিৎকার করছে। বিএনপি সরকারকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে — নইলে ইতিহাস তাদের সেই সরকার হিসেবে চিরতরে চিহ্নিত করবে, যারা একটি জাতির সবচেয়ে মৌলিক দায়িত্ব পালনে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। বিশ্ব দেখছে। ভুক্তভোগীরা আর অপেক্ষা করতে পারছে না।
