১৯৬৯ সালের উত্তাল রাজপথ। রেসকোর্স ময়দানে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে এক ছাত্রনেতার বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা এলো ‘বঙ্গবন্ধু’। সেই থেকে তিনি হয়ে উঠলেন ইতিহাসের অংশ। একাত্তরের রণাঙ্গন থেকে শুরু করে বাংলার সংসদীয় রাজনীতির চার দশকের বেশি সময় যাঁর পদচারণায় মুখর ছিল, সেই প্রবীণ জননেতা তোফায়েল আহমেদ এখন হাসপাতালের সাদা চাদরের নিচে নিথর পড়ে আছেন। ৮২ বছর বয়সের জীর্ণ শরীর নিয়ে লড়ছেন মৃত্যুর সঙ্গে। অথচ এই অবস্থাতেও রাষ্ট্রের খাতায় তাঁর নামের পাশে লেখা হয়েছে ‘পলাতক’।
বার্ধক্যজনিত জটিলতা ও গুরুতর অসুস্থতায় শয্যাশায়ী তোফায়েল আহমেদ এখন কাউকে চিনতে পারছেন না। এমনকি নিজের পরিচয়ও হয়তো তাঁর স্মৃতির আড়ালে হারিয়ে গেছে। অথচ ২৪ বছর আগের একটি পুরনো মামলাকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি আদালত তাঁকে ‘পলাতক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। যে মানুষটি এই দেশের জন্য ৩৩ মাস জেল খেটেছেন, ৯ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং ২০ বছর দেশের মন্ত্রিত্ব সামলেছেন। জীবনের শেষপ্রান্তে এসে তাঁর এমন ‘পলাতক’ তকমা পাওয়ায় ব্যথিত রাজনৈতিক সচেতন মহল।
তোফায়েল আহমেদ ছাত্র রাজনীতি করার সুবাধে ডাকসুর সাবেক ভিপি হিসেবে ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক। একাত্তরে দেশ স্বাধীন করার অন্যতম কারিগর ও সংগঠক। মাত্র ২৭ বছর বয়সে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এবং মোট ৯ বার জয়ী একজন জননেতা। রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন সময়ে মোট ৩৩ মাস একটানা কারাবরণ করেছেন।
হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকা এই মানুষটি কোথাও পালিয়ে যাওয়ার শারীরিক সামর্থ্য হারিয়েছেন অনেক আগেই। তাঁর পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের মতে, লোকটা পালাননি; তিনি কেবল সব ভুলে গেছেন ভুলে গেছেন নিজের দেশটাকেও। যে মাটির জন্য তিনি যৌবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন, সেই মাটির আইন আজ তাঁর অসুস্থতাকে পাশ কাটিয়ে তাঁকে ফেরারি বলছে।
একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগে রাষ্ট্র কি একটুখানি মানবিক হতে পারে না? যে মানুষটি হাসপাতালের বিছানায় স্মৃতি হারিয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন, তাঁর বিরুদ্ধে ‘পলাতক’ তকমা কি ইতিহাসের প্রতি সুবিচার? প্রশ্নটি এখন সাধারণ মানুষ ও সুশীল সমাজের।
ইতিহাস যাঁকে মনে রাখবে রাজপথের মহানায়ক হিসেবে, জীবনের অন্তিমলগ্নে এসে বিচারিক প্রক্রিয়ায় তাঁর এই অবস্থা যেন ‘দেশ তাঁকে ভুলিয়ে দিল’ এই প্রবাদেরই করুণ বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
