মানব সভ্যতার বিবর্তনে হোমো সেপিয়েন্স বা মানুষ যখনই কোনো একটি গোষ্ঠীকে দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে, তখনই তারা আশ্রয় নিয়েছে ‘আখ্যান’ বা গল্পের। আর এই আখ্যানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী আখ্যান হলো সেইগুলো, যেগুলোকে ‘ঐশ্বরিক বা অলৌকিক’ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা যখন নারীর স্বাধীনতা, গতিশীলতা এবং তার শরীরের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে চাইল, তখন তারা এমন এক পোশাক ও ব্যবস্থার জন্ম দিল, যা আজ আমরা ‘পর্দা’ বা ‘বোরকা’ নামে চিনি।
বাহ্যিকভাবে একে একটি ধর্মীয় পবিত্রতা বা সুরক্ষার প্রতীক হিসেবে দেখানো হলেও, এর ঐতিহাসিক রূপরেখা এবং মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়//এটি আসলে পুরুষতান্ত্রিক সমাজকাঠামো টিকিয়ে রাখার অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক ও সামাজিক হাতিয়ার।
**
## ১. পর্দা ও বোরকার জন্ম ইতিহাস: ইসলামপূর্ব আরবের মরুজীবি সংস্কৃতি
অনেকের মধ্যেই এই ঐতিহাসিক ভুল ধারণাটি রয়েছে যে, পর্দা বা বোরকা প্রথার জন্ম হয়েছে সপ্তম শতকের আরবে, ইসলামের আগমনের মাধ্যমে। কিন্তু নৃবিজ্ঞান ও ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, পর্দা প্রথার ইতিহাস ইসলামের চেয়েও অনেক বেশি প্রাচীন।
“`
[ পর্দা প্রথার ঐতিহাসিক বিবর্তন ]
│
┌──────────────────────────────┼──────────────────────────────┐
▼ ▼ ▼
[ মেসোপটেমিয়া ও অশূরীয় আইন ] [ বাইজেন্টাইন ও পারস্য সাম্রাজ্য ] [ সপ্তম শতকের আরব ও ইসলাম ]
(খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ) (উচ্চবংশীয় আভিজাত্যের প্রতীক) (আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ)
“`
### ক) অশূরীয় রাজকীয় আইন (খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ)
ইতিহাসে পর্দা প্রথার প্রথম লিখিত আইনি দলিল পাওয়া যায় প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার অশূরীয় সাম্রাজ্যে (Assyrian Law)। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দের দিকে একটি রাজকীয় ডিক্রি জারি করা হয়েছিল, যেখানে বলা হয়েছিল যে উচ্চবংশীয় এবং স্বাধীন নারীরা যখন জনসমক্ষে বের হবেন, তখন অবশ্যই তাদের মাথা ও মুখ কাপড়ে ঢেকে রাখতে হবে। মজার বিষয় হলো, তৎকালীন সমাজে যারা দাসী (Slave) বা পতিতা ছিলেন, তাদের জন্য পর্দা করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল। যদি কোনো দাসী পর্দা করার চেষ্টা করত, তবে তাকে কঠোর শারীরিক শাস্তি দেওয়া হতো। অর্থাৎ, পর্দা প্রথার সূচনা হয়েছিল লিঙ্গবৈষম্য এবং একই সাথে শ্রেণীবিভেদের (Class Hierarchy) একটি প্রতীক হিসেবে।
### খ) বাইজেন্টাইন ও সাসানীয় সাম্রাজ্যের প্রভাব
ইসলামের আগমনের পূর্বে আরবের প্রতিবেশী দুটি বিশাল পরাশক্তি খ্রিস্টান বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য এবং পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্যেও উচ্চবংশীয় নারীদের ঘরের ভেতর অবরুদ্ধ রাখা এবং বাইরে বের হলে পর্দা করার কঠোর নিয়ম ছিল। আরব উপদ্বীপের যাযাবর সমাজ যখন ধীরে ধীরে সাম্রাজ্য বিস্তারের দিকে মনোযোগ দিল, তখন তারা এই উন্নত এবং শক্তিশালী সাম্রাজ্যগুলোর সংস্কৃতি ও পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামোকে নিজেদের ধর্মীয় সংস্কৃতির ভেতরে আত্মীকরণ করে নিল।
### গ) আরবের সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং ‘ঐশ্বরিক’ আইনের রূপান্তর
সপ্তম শতকের আরবে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো রাষ্ট্রকাঠামো বা পুলিশ বাহিনী ছিল না। গোত্রীয় যুদ্ধ এবং দাসী ধরে আনার সংস্কৃতি ছিল অত্যন্ত সাধারণ। সেই সময়ে মুসলিম নারীদের নিরাপত্তা এবং উটের পিঠে চড়ে বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে তৎকালীন আরবের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এক ধরণের অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করে।
ঠিক এই সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই পবিত্র গ্রন্থে পর্দার নির্দেশ সম্বলিত আয়াতগুলো (যেমন সূরা আহযাব ও সূরা নূর) অবতীর্ণ হয়। আরবের সেই তৎকালীন উপজাতীয় সংস্কৃতি, মরুভূমির ধূলিঝড় থেকে বাঁচার পোশাক এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার মিশ্রণে যে কোড তৈরি হয়েছিল, তাকেই পরবর্তীতে ‘ঈশ্বরের অপরিবর্তনীয় আইন’ বা ‘ঐশ্বরিক বিধান’ হিসেবে ঘোষণা করা হলো। মানুষ যখন কোনো নিয়মকে স্রেফ ‘সামাজিক নিয়ম’ বলে, তখন মানুষ তা ভাঙার সাহস পায়। কিন্তু সেই নিয়মের ওপর যখন ‘ঐশ্বরিক সিলমোহর’ মেরে দেওয়া হয়, তখন নারীরা মনস্তাত্ত্বিকভাবেই বিশ্বাস করতে শুরু করে যে এই কাপড়ের টুকরোটি না পরলে তারা ঈশ্বরের অবাধ্য হবে।
**
## ২. পর্দা প্রথা নিয়ে ঐতিহাসিক অত্যাচার ও নির্মমতার দলিল
ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকে এই পর্দা প্রথাকে কেন্দ্র করে নারীদের ওপর যে প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক নির্যাতন চালানো হয়েছে, তা শিউরে ওঠার মতো। বোরকা বা পর্দা যখন স্রেফ একটি ব্যক্তিগত পছন্দের পোশাক না হয়ে ‘রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বাধ্যতামূলক আইন’ হিসেবে চেপে বসে, তখন তা মানুষের মৌলিক মানবাধিকারকে কীভাবে ধুলিস্যাৎ করে, তার কিছু ঐতিহাসিক উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো:
### ক) আফগানিস্তানে তালেবানি নিষ্ঠুরতা (১৯৯৬-২০০১ এবং বর্তমান)
পর্দা প্রথার নামে আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক নির্যাতন প্রত্যক্ষ করেছে আফগানিস্তানের নারীরা। ১৯৯৬ সালে তালেবানরা যখন প্রথম ক্ষমতায় আসে, তখন তারা ‘শরিয়াহ’ আইনের দোহাই দিয়ে নারীদের জন্য মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢাকা সুনির্দিষ্ট ‘চাদরি’ বা ‘আফগান বোরকা’ পরা বাধ্যতামূলক করে।
* **রাস্তায় চাবুক পেটা:** যদি কোনো নারী ভুলবশত তার বোরকা দিয়ে মুখ পুরোপুরি না ঢেকে বের হতো, বা তার গোড়ালি দেখা যেত, তবে তালেবানদের ‘ধর্মীয় পুলিশ’ (Department ফর দ্য প্রমোশন অফ ভার্চু অ্যান্ড প্রিভেনশন অফ ভাইস) প্রকাশ্য রাস্তায় সেই নারীদের লোহার রড বা চামড়ার চাবুক দিয়ে নৃশংসভাবে প্রহার করত। নারীদের শিক্ষা ও চাকরি কেড়ে নিয়ে তাদের স্রেফ ঘরের ভেতরের একটি অদৃশ্য বস্তুতে পরিণত করা হয়েছিল এই বোরকার আড়ালে।
### খ) ইরানের ইসলামিক বিপ্লব (১৯৭৯) এবং মাহসা আমিনীর ট্র্যাজেডি
১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর ইরানি নারীদের ওপর বাধ্যতামূলক ‘হিজাব’ আইন চাপিয়ে দেওয়া হয়। যে নারীরা এর আগে আধুনিক পোশাকে স্বাধীনভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেন, তাদের রাতারাতি কালো কাপড়ে শরীর ঢাকতে বাধ্য করা হয়।
* **সাম্প্রতিক রক্তক্ষরণ (২০২২):** এই পর্দা প্রথার আইনি ভয়াবহতা আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও বিশ্ব ভুলে যায়নি। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ২২ বছর বয়সী তরুণী মাহসা আমিনীকে ইরানের ‘নীতি পুলিশ’ (Gasht-e Ershad) গ্রেপ্তার করে স্রেফ এই কারণে যে—তাঁর মাথার হিজাবটি সম্পূর্ণ নিখুঁত ছিল না এবং সামান্য কিছু চুল দেখা যাচ্ছিল। পুলিশি হেফাজতে নির্যাতনের ফলে মাহসার মৃত্যু হয়, যা পুরো ইরানে এক অভূতপূর্ব গণআন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল। একটি কাপড়ের টুকরো ঠিকমতো না পরার অপরাধে একটি রাষ্ট্র তার নিজের দেশের তরুণীকে পিটিয়ে হত্যা করতে পারে—এর চেয়ে বড় বর্বরতা আর কী হতে পারে?
**
## ৩. চিন্তাবিদের দৃষ্টিতে: বিকল্প এবং আরও মানবিক ঐশ্বরিক ব্যবস্থা
এখানে একজন মুক্তচিন্তক বা বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের মনে একটি অত্যন্ত মৌলিক এবং যৌক্তিক প্রশ্ন জাগে। আমরা যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নিই যে একজন সর্বশক্তিমান, পরম দয়ালু ও সর্বজ্ঞাত ঈশ্বর বা আল্লাহ আছেন—তবে মহাবিশ্বের কোটি কোটি গ্যালাক্সি সৃষ্টিকারী সেই পরম সত্তা কেন নারীর শরীরকে একটি ‘লুকানোর বস্তু’ বা ‘পাপের উৎস’ হিসেবে বিচার করবেন?
একজন সত্যিকারের পরম জ্ঞানী ঈশ্বর যিনি সমাজকে সুস্থ রাখতে চান, তিনি মেয়েদের কাপড়ের খাঁচায় বন্দি করার চেয়ে এর থেকে আরও হাজার গুণ ভালো, বৈজ্ঞানিক ও মানবিক ব্যবস্থা করতে পারতেন:
### ১) পুরুষদের সুশিক্ষা এবং মানসিক বিবর্তন
নারীর শরীর কোনো প্রলুব্ধকর বস্তু নয়, এটিও পুরুষের শরীরের মতোই প্রকৃতির একটি সাধারণ জৈবিক সৃষ্টি এই সাধারণ সত্যটি পুরুষদের মগজে ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্য ঈশ্বর পুরুষদের মনস্তাত্ত্বিক সুশিক্ষা (Psychological Education) দিতে পারতেন। পবিত্র গ্রন্থে নারীদের ঢাকার ডিক্রি জারির চেয়ে যদি পুরুষদের এই আদেশ দেওয়া হতো যে*”কোনো নারীর পোশাক যেমনই হোক না কেন, তার দিকে কামুক দৃষ্টিতে তাকানো বা তাকে হেনস্থা করা পুরুষ প্রজাতির জন্য সবচেয়ে বড় জ্ঞানীয় দেউলিয়াত্ব”*তবে সমাজ অনেক বেশি নিরাপদ হতো।
### ২) দৃষ্টির সংযম বনাম মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ
আশ্চর্যজনকভাবে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা পুরুষের পশুবৃত্তিক লালসা বা কামুকতাকে নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব পুরুষের ওপর না দিয়ে, তার দায় চাপিয়ে দিয়েছে নারীর ওপর। সমাজ ধরে নিয়েছে, পুরুষরা তাদের কামুক দৃষ্টি বা আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম; তাই নারীদেরই বস্তাবন্দী হয়ে চলতে হবে। একজন প্রকৃত ঈশ্বর মানুষের মস্তিষ্ককে এমনভাবে ডিজাইন করতে পারতেন, যেখানে পুরুষরা নারীকে স্রেফ একটি ‘যৌন বস্তু’ (Sexual Object) হিসেবে না দেখে একজন সহকর্মী, একজন বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষ এবং একজন সহযাত্রী হিসেবে দেখতে শিখত।
“`
┌──────────────────────────────────────────┐
│ সমস্যা: সমাজে নারীর নিরাপত্তা ও সম্মান │
└──────────────────────────────────────────┘
│
┌─────────────────────────┴─────────────────────────┐
▼ ▼
[ পুরুষতান্ত্রিক সমাধান ] [ মানবিক ও বৈজ্ঞানিক সমাধান ]
– নারীকে বোরকা ও পর্দায় বন্দি করা। – পুরুষকে মানসিক সুশিক্ষা দেওয়া।
– নারীর শরীরকে ‘লুকানোর বস্তু’ বানানো। – নারীকে স্বাধীন ও সমান নাগরিক ভাবা।
– দায় নারীর ওপর চাপানো। – দায় পুরুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের ওপর রাখা।
“`
**
## একটি উন্মুক্ত প্রশ্ন
যখন একটি সমাজ বা রাষ্ট্র দাবি করে যে নারীর পর্দা না করাটাই সমাজে ধর্ষণ বা ব্যভিচার বাড়ার প্রধান কারণ, তখন তারা পরোক্ষভাবে পুরুষ প্রজাতিকে এক ধরণের ‘অসংযত পশু’ হিসেবেই চিত্রায়িত করে //যারা নারীর শরীর দেখলেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।
এখানেই আজকের আধুনিক পৃথিবীর মানুষের কাছে একটি উন্মুক্ত প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়: **আমরা যদি সত্যিই একটি সভ্য, প্রগতিশীল এবং মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে চাই, তবে আমাদের সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কি এমন একটি ব্যবস্থার দরকার যা নারীকে অন্ধকার কাপড়ের খাঁচায় বন্দি করে আড়ালে রাখে এবং পুরুষকে তার আদিম পশুবৃত্তিতেই বাঁচতে দেয়? নাকি আমাদের এমন একটি শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রয়োজন যেখানে পোশাকের স্বাধীনতা থাকবে প্রতিটি মানুষের নিজস্ব অধিকার, এবং যেখানে সমাজ সুরক্ষিত থাকবে বোরকার দেয়াল দিয়ে নয়, বরং পুরুষের উন্নত মানসিকতা, পারস্পরিক সম্মান এবং সুশিক্ষার শক্তিতে?**(ব্লগার রাফি’র ওয়াল থেকে)
