মনজুরুল হক
অসহ্য নেতিবাচক রাজনীতির নির্মম শিকার দেশ-জাতি-মানুষ। এসব নিয়ে ভাবতে গেলে নিজের দুঃখ-কষ্ট, সুখ-আহ্ল্লাদ নিয়ে কণা মাত্র ভাবার সুযোগ পাই না। মাঝে মাঝে মনটা বিদ্রোহ করে ওঠে। মনে হয় সব ছেড়েছুঁড়ে দিগন্তের বিস্ম্রিয়মাণ তপনের লালচে আভায় এক নিঃসঙ্গ বিহঙ্গের সঙ্গী হই। মনুষ্য কোলাহল থেকে অনেক অনেক উঁচু দিয়ে ডানা মেলে হারাতে থাকি…..।
🔘
না। সেসব আর হবার নয়। আজ টাইমলাইন অন হতেই শাহরিয়ার করিরের ছবিটা ভেতর অবধি কাঁপিয়ে দিল! শাহরিয়ার ভাইয়ের আটকাবস্থা নিয়ে আগেও লিখেছি। এখন লিখতে গেলে আবারও সেই পুরোনো কথাগুলোই লিখতে হবে। ইচ্ছে করে না।
🔘
তা বললে কি হয়? শাহরিয়ার কবির অনেক লিখেছেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা করেছেন। তথ্যচিত্র বানিয়েছেন। দেশজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বাল দিকগুলো তুলে ধরেছেন। কখনও সেলুলয়েডে, কখনও বইয়ে, কখনও পত্রিকার পাতায়। সেসব তো আছেই, তাঁর ওপর ইনুস- জামায়াত-বিএনপি-এনসিপির মূল জিঘাংসা-তিনি ‘ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি’র সভাপতি ছিলেন। একাত্তরের ঘাতক-দালালদের ঠিকুঁজি প্রকাশ করেছিলেন।
🔘
সেই পর্বতপ্রমাণ ঘৃণায় ইনুস তাকে জেলে পুরেছিল। আজ ইনুস নেই। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বুক ঠুকে গর্ব করা বিএনপি ক্ষমতায়। তার পরও এই অশীতিপর বৃদ্ধের প্রতি বিন্দুমাত্র দয়া দেখায়নি বিএনপি-জামায়াত-এনসিপি।
🔘
তাঁর আরও ‘বড় অপরাধ’ তিনি ৭১-এর ঘাতক দালালদের বিচারের জন্য দীর্ঘদিন জনমত গঠনে কাজ করেছেন, তার কাজের প্রেক্ষিতে শীর্ষ কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি হয়েছে। যাদের ফাঁসি হয়েছে তাদের কারও কারও সন্তান-সন্ততি ভাগ্যের ফেরে আজ সংসদে বসেছে। সুতরাং শাহরিয়ার কবিরের রিমান্ড অব্যাহত। অচল শরীর নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে তাঁকে আদালত-জেলখানা, জেলখানা-আদালত করানো হচ্ছে।
🔘
তাঁর যে বইগুলো যুদ্ধাপরাধীদের গায়ে জ্বালা ধরিয়েছিল সেগুলো যথাক্রমে-
১. একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়।
২. Tormenting Seventy One
৩. Genocide ’71″
৪. সেক্টর কমান্ডাররা বলছেন: মুক্তিযুদ্ধের স্মরণীয় ঘটনা।
৫. একাত্তরের গণহত্যা, নির্যাতন ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার।
৬. মুক্তিযুদ্ধের বৃত্তবন্দী ইতিহাস।
৭. যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং জামায়াতের অপরাজনীতি।
🔘
আশির দশকে যখন সবে ঢাকায় এসে ‘বিচিত্রা’য় অনিয়মিত প্রদায়ক হিসাবে কাজ করতাম। একদিন এই কবির ভাই আমাকে বলেছিলেন-“কলম পিষে জীবন শেষ করবে? তোমার দায়িত্ব আরও বেশি। সংসার চালানোর জন্য এটা খুব ভালো প্রফেশন না।” সেসময় শাহরিয়ার কবিরের বই-“ওদের জানিয়ে দাও” নিয়ে তাঁর সঙ্গে বিতর্ক করতাম। বইটিতে তিনি আন্ডারগ্রাউন্ড বিপ্লবীদের রাজনীতির মূল স্রোতে ফিরে আসার কথা লিখেছিলেন।
🔘
এতসব ‘অপকম্ম’ করার মাসুল দিচ্ছেন তিনি। সৈন্যরা দেশের জন্য যুদ্ধে প্রাণ দেয়। কোনও সৈন্যের বাবা-মা তাতে মাতম করেন না, কারণ তার ছেলে দেশ বাঁচাতেই প্রাণ দিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের ২ কোটি ৬০ লক্ষ সৈন্যের মৃত্যু হয়েছিল। আজও তাদের বাবা-মা কিংবা আত্মিয়-স্বজন মাতম করেন না, বরং ৯ মে ভিক্টোরিডে-তে দৃপ্ত পদভারে মার্চপাস্টে যোগ দেন।
🔘
জানি না ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্টস (IFJ), কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (CPJ), ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ইনস্টিটিউট (IPI), রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (RSF) বা কমনওয়েলথ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (CJA) তাঁর মুক্তির বিষয়ে সোচ্চার হয়েছে কীনা? তবে শেষোক্ত সংগঠনটি যে বাংলাদেশ সরকারের কাছে তাদের উদ্বেগ জানিয়েছে সেটা জেনেছি।
🔘
আমরা জানি এই সরকার শাহরিয়ার কবিরকে মুক্তি দূরের কথা, জামিনও দেবে না। হয়ত কোনও এক বিষণ্ণ সকালে শুনতে পাব-শাহরিয়ার কবির পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন।
🔘
আর সে কারণেই আমি এই সরকারের কাছে শাহরিয়ার কবিরের মুক্তি দাবি করি না। শুধু মনে করিয়ে দিই- বিগত দিনে প্রমাণিত যুদ্ধাপরাধীরাও জেনেভা কনভেনশনের সুবিধো ভোগ করেছিলেন।
