আমি একজন শিক্ষিকা।
রোজ খাতা দেখি, নম্বর বসাই, রিপোর্ট কার্ডে সই করি।
কিন্তু বিশ্বাস করুন, রিপোর্ট কার্ডের বাইরেও একটা মার্কশিট থাকে— যেটা দেখা যায় না, ছোঁয়া যায়।
আপনাদের কাছে হাতজোড় করে একটাই অনুরোধ—
পড়াশোনার পাশাপাশি ওকে একটা ‘জানালা’ খুলে দিন।
হয় নাচ, নয় গান, নয় ছবি আঁকা, নয় আবৃত্তি, নয় নাটক— যে কোনো একটা কালচারাল কিছু।
কেন বলছি জানেন?
নম্বর মানুষ বানায় না, আনন্দ বানায়।
আমার ক্লাসের ফার্স্ট বয় রাহুল। অঙ্কে ৯৮।
কিন্তু টিফিনে একা বসে থাকে। কথা বলতে গেলে ঘেমে যায়।
আর থার্ড বেঞ্চের রিয়া? অঙ্কে ৬২। কিন্তু রবীন্দ্রজয়ন্তীতে গান গেয়ে গোটা স্কুল কাঁদিয়ে দিল।
বলুন তো, আসল শিক্ষা কার হল?
বইয়ের চাপ কমাতে একটা ‘পালানোর জায়গা’ লাগে,
পরীক্ষার আগে আমার ছাত্র সুমন দরজা বন্ধ করে কাঁদত।
ওর মা ভর্তি করলেন ছবি আঁকার স্কুলে।
৬ মাস পর ছেলেটা বলল— “ম্যাম ,আমি এখন খারাপ লাগলে পাহাড় আঁকি। মন ভালো হয়ে যায়।”
ওর পাহাড় আঁকাটাই ওর থেরাপি। ওষুধ না।
যে বাচ্চা ২০০ লোকের সামনে আবৃত্তি করে— “স্বাধীনতা তুমি…”,
সে কাল ইন্টারভিউ বোর্ডে ঘাবড়াবে না।
যে মেয়ে ক্লাসিক্যাল নাচে এক পা ভুল হলে আবার শুরু করে,
সে জীবনে হোঁচট খেলে উঠে দাঁড়াতে শিখে যায়।
মোবাইল থেকে বাঁচানোর সেরা অস্ত্র— তবলা, হারমোনিয়াম, রং-তুলি
আপনি বকেন— “সারাদিন ফোন!”
আমি বলি— ফোন কেড়ে নেবেন না, হাতে গিটার ধরিয়ে দিন।
স্ক্রিনের নেশা কাটবে সুরের নেশায়। রিল দেখা কমবে।
মার্কশিট পুড়ে যায়, গান পোড়ে না
২০ বছর পর আপনার ছেলে IIT, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হবে।
কিন্তু অফিসের চাপে যখন দম বন্ধ হবে, তখন ক্লাস সিক্সে শেখা ‘পুরানো সেই দিনের কথা’ গানটাই ওকে বাঁচাবে।
ডিগ্রি পেট ভরায়, সংস্কৃতি মন ভরায়।
আমি বলছি না সবাইকে শিল্পী হতে হবে।
আমি বলছি— ওর ভেতরের ‘মানুষটা’ যেন দমবন্ধ হয়ে মরে না যায়। গান-নাচ-আঁকা হল নিঃশ্বাস।
আপনি হয়তো ভাবছেন— “সময় কোথায় ম্যাম? এমনিই সিলেবাস শেষ হয় না।”
আমি বলি— সপ্তাহে ২ ঘণ্টা। শুধু ২ ঘণ্টা।
ওই ২ ঘণ্টা ওর ২০ বছরের ডিপ্রেশন আটকাবে।
ওই ২ ঘণ্টা ওকে ‘রোবট’ নয়, মানুষ বানাবে।
তাই অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলব,
ছেলেমেয়েকে শুধু ফার্স্ট বানাবেন না, ‘ফুল’ বানান।
ফার্স্ট হওয়ার দৌড় একদিন শেষ হবে।
কিন্তু ফুল হয়ে ফুটলে, সারাজীবন গন্ধ ছড়াবে।
নম্বর কম হলে বকুন, ক্ষতি নেই।
কিন্তু হারমোনিয়ামে ধুলো জমলে, তুলিতে রং শুকিয়ে গেলে— সেদিন বুঝবেন, আপনি ওর শৈশব চুরি করেছেন।
_পড়ুক ওরা, গড়ুক ওরা।
সাথে একটু গাক, একটু নাচুক, একটু আঁকুক—
কারণ রোবটের যুগে আমাদের ‘মানুষ’ দরকার ।
এ পৃথিবীতে মানুষের বড় অভাব, পৃথিবীটা মানুষের হয়ে উঠুক। ❤️
✍️✍️ লেখাটা সংগ্রহ করা –
