পদ্মা সেতু চালুর পর যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় বদলে গেছে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির চিত্র। ঢাকা থেকে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে মোংলা বন্দরের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। গত তিন বছরে এই বন্দর দিয়ে গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানি শুরু হয়েছে। পদ্মা সেতু চালুর আগে মোংলা বন্দর দিয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি হতো না।
তবে মোংলা বন্দর দিয়ে হিমায়িত খাদ্য রপ্তানির পরিমাণ কমেছে। জাহাজ সময়মতো না পাওয়া এবং ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়সূচি মেলাতে ব্যবসায়ীরা চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারে ঝুঁকছেন। ফলে গত তিন বছরে মোংলা বন্দর দিয়ে হিমায়িত খাদ্য রপ্তানি কমে প্রায় অর্ধেকে দাঁড়িয়েছে। এজন্য বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর।
মোংলা বন্দর সূত্র জানায়, পদ্মা সেতু চালুর আগের ২০২০-২১ অর্থবছরে ১ হাজার ৬৪৮ বক্সে ৩ হাজার ৮১ টিইইউ কন্টেইনারে ৩৩ হাজার ৩১৬ মেট্রিক টন হিমায়িত খাদ্য রপ্তানি হয়েছিল। পরের অর্থবছর, ২০২১-২২-এ, ১ হাজার ৪৪৬ বক্সে ২ হাজার ৮৩৩ টিইইউ কন্টেইনারে রপ্তানি হয় ৩১ হাজার ৭১৫ মেট্রিক টন হিমায়িত খাদ্য।
পদ্মা সেতু ২০২২ সালের ২৫শে জুন চালু হয়। এরপর ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোংলা বন্দর দিয়ে ১ হাজার ২৮ বক্সে ২ হাজার ১৯ টিইইউ কন্টেইনারে ২২ হাজার ৫৭৫ মেট্রিক টন হিমায়িত খাদ্য রপ্তানি করা হয়। ওই বছর থেকেই তৈরি পোশাক রপ্তানিও শুরু হয়। ৩৭ বক্সে ৭৪ টিইইউ কন্টেইনারে রপ্তানি হয় ৪৫৪ মেট্রিক টন গার্মেন্টস পণ্য।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭৮৭ বক্সে ১ হাজার ৫২৯ টিইইউ কন্টেইনারের মাধ্যমে ২২ হাজার ৫৭৬ মেট্রিক টন হিমায়িত খাদ্য রপ্তানি হয়। এ সময় গার্মেন্টস পণ্যের রপ্তানি আগের অর্থবছরের তুলনায় ১০ গুণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৭৩০ মেট্রিক টনে। পণ্যগুলো রপ্তানি করা হয় ৩৫৪ বক্সে ৭০৬ টিইইউ কন্টেইনারে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে হিমায়িত খাদ্য রপ্তানি আরও কমে প্রায় অর্ধেক হয়। ওই বছরে ৭৬৮ বক্সে ১ হাজার ৫২৯ টিইইউ কন্টেইনারে ১৭ হাজার ২৬২ মেট্রিক টন হিমায়িত খাদ্য রপ্তানি হয়। একই সময়ে ৩২৬ বক্সে ৬৫২ টিইইউ কন্টেইনারে ৪ হাজার ১৮১ মেট্রিক টন গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানি করা হয়।
রপ্তানিতে এই পরিস্থিতির মধ্যেও রাজস্ব আয়ে নতুন রেকর্ড করেছে মোংলা বন্দর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৩৬৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। আদায় হয়েছে ৩৮৭ কোটি ৯৫ লাখ ১২ হাজার টাকা।
লক্ষ্যমাত্রা ছাড়ানোর পাশাপাশি আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব বেড়েছে ৪০ কোটি ৮২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা, অর্থাৎ ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, খুলনার ভাইস প্রেসিডেন্ট এস কে কামরুল আলম বলেন, হিমায়িত খাদ্য রপ্তানিতে ক্রেতাদের নির্দিষ্ট সময়সূচি থাকে এবং সময়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সেই সময়সূচি অনুযায়ী মোংলা বন্দরে সব সময় জাহাজ পাওয়া যায় না, তবে চট্টগ্রামে জাহাজ মেলে। তাই ক্রেতাদের সময়সূচি বজায় রাখতে কিছু পণ্য চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পাঠাতে হয়।
তাঁর ভাষ্য, “বায়ারদের সিডিউলের সঙ্গে মোংলা বন্দরে জাহাজ থাকলে আমরা মোংলা বন্দরই ব্যবহার করছি।”
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আরিফ আহাম্মেদ মোস্তফা বলেন, পদ্মা সেতু চালুর পর যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। ঢাকা থেকে মোংলা যেতে এখন চার ঘণ্টা লাগে, আর চট্টগ্রামে যেতে লাগে সাড়ে সাত ঘণ্টা। এ কারণে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে মোংলা বন্দরের গুরুত্ব বেড়েছে। তবে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার ফলে হিমায়িত পণ্য দ্রুত রপ্তানি করতে ব্যবসায়ীরা চট্টগ্রাম বন্দরে যাওয়া শুরু করেছেন।
তাঁর মতে, হিমায়িত পণ্য রপ্তানির জন্য সময়সূচি অনুযায়ী জাহাজ পাওয়া জরুরি।
চেয়ারম্যান আরও জানান, বিভিন্ন সংকট থাকা সত্ত্বেও বন্দরের রাজস্ব আয় বেড়েছে। একই সঙ্গে জাহাজ আগমন এবং কার্গো ও কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়েও প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
মোংলা বন্দর সূত্রের হিসাবে, বন্দরের বছরে ১ হাজার ৫০০টি জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা রয়েছে। তবে সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে হ্যান্ডলিং করা হয়েছে ৮১৫টি জাহাজ, যা সক্ষমতার ৫৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
বন্দরে বছরে ১ কোটি ৫০ লাখ মেট্রিক টন কার্গো হ্যান্ডলিং করা সম্ভব। বিদায়ী অর্থবছরে হ্যান্ডলিং হয়েছে ১ কোটি ২২ লাখ ৫১ হাজার মেট্রিক টন, অর্থাৎ সক্ষমতার ৮১ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের বার্ষিক সক্ষমতা ১ লাখ টিইইউ হলেও বিদায়ী অর্থবছরে হ্যান্ডলিং হয়েছে ২৯ হাজার ৭১৪ টিইইউ, যা সক্ষমতার ২৯ দশমিক ৭১ শতাংশ। রিকন্ডিশন্ড গাড়ি হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা ২০ হাজার ইউনিট। ওই অর্থবছরে গাড়ি আমদানি হয়েছে ১২ হাজার ৭৫টি—সক্ষমতার ৬০ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জাহাজের আগমন বাড়াতে ‘ইন্টারনাল বিজনেস ডেভেলপমেন্ট স্ট্যান্ডিং কমিটি’র মাধ্যমে কাজ চলছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্পৃহা বাড়ানো এবং কার্যক্রমে গতি আনতে বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে নিয়মিত সভা করা হচ্ছে। উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নেও নেওয়া হয়েছে উদ্যোগ।
বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে সহায়ক জলযান সংগ্রহ, মোংলা বন্দরের উন্নীতকরণ এবং কন্টেইনার টার্মিনাল ও ইয়ার্ড নির্মাণসহ একাধিক প্রকল্পের কাজ চলছে।
সহায়ক জলযান সংগ্রহ প্রকল্পের অধীনে দুটি টাগবোট, একটি বয়া লেইং ভেসেল, একটি সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ভেসেল, একটি পাইলট মাদার ভেসেল এবং একটি সার্ভে অ্যান্ড রিসার্চ ভেসেল সংগ্রহের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা।
ভারতীয় এলওসি-৩-এর অর্থায়নে ‘আপগ্রেডেশন অব মোংলা পোর্ট’ প্রকল্পের আওতায় আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ দুটি কন্টেইনার টার্মিনাল, কন্টেইনার হ্যান্ডলিং ইয়ার্ড এবং ডেলিভারি ইয়ার্ড নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব অবকাঠামো গড়ে উঠলে বন্দরকেন্দ্রিক শিপিং, সিঅ্যান্ডএফ, স্টিভেডরিং ও শ্রম খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।
মোংলা বন্দরে জাহাজ ও শিল্পকারখানা থেকে উৎপন্ন বর্জ্য সংগ্রহ এবং নিঃসৃত তেল অপসারণের জন্য আধুনিক ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে প্রকল্পটির কাজ শেষ হয়।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে জাহাজের বর্জ্য নদী ও সমুদ্রে ফেলা বন্ধ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে পশুর চ্যানেল ও আশপাশের নদ-নদীর দূষণ কমাতে এবং সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষায় এটি সহায়ক হবে।
বন্দরের সামনে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো ১৪৪ কিলোমিটার দীর্ঘ চ্যানেলের নাব্যতা বাড়ানো এবং তা বজায় রাখা। পাশাপাশি নিরাপদ ও দূষণমুক্ত নৌপথ নিশ্চিত করা, পুরোনো সহায়ক জলযানের বদলে নতুন জলযান সংগ্রহ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং বন্দর ব্যবহারকারীদের মোংলা বন্দর ব্যবহারে উৎসাহিত করাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া মোংলা বন্দরকে সরাসরি ‘ফার্স্ট কলিং পোর্ট’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা, কন্টেইনারবাহী জাহাজের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সিঙ্গাপুরসহ গুরুত্বপূর্ণ বন্দরে সরাসরি ফিডার জাহাজ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। খুলনা-মোংলা ও খুলনা-ভাঙ্গা সড়ক যোগাযোগের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা বলেন, এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও গতিশীল করা। এ জন্য সরকারের একটি মহাপরিকল্পনা রয়েছে।
