ইব্রাহিম চৌধুরী
সমাজ-সংস্কৃতির উঠোনে নতুন প্রজন্মকে আমরা কখনো সাদরে ডাকিনি। বরং এড়িয়ে গেছি, তাদের জীবনযাপনকে তুচ্ছ করেছি। কখনো অযোগ্য ভেবে দূরে সরিয়ে রেখেছি। ভেবেছি, মোবাইলের পর্দায় মুখ গুঁজে থাকা এই ছেলেমেয়েদের দিয়ে আর যা-ই হোক, সমাজ বদল হবে না।
অথচ সময়ের কী নির্মম পরিহাস! সেই তথাকথিত অযোগ্য প্রজন্মই আজ দেশে দেশে ক্ষমতার ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছে। নেপালের রাজপথ তার এক রক্তাক্ত সাক্ষী। বাংলাদেশের জন্যও এই বাস্তবতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
ভারতে তরুণদের প্রতিবাদের নতুন ভাষা আমাদের ভাবতে বাধ্য করে। অপমানসূচক ‘তেলাপোকা’ শব্দকে পরিচয়ের অংশ করে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামের সংগঠন গড়ে ওঠার যে গল্প সামনে এসেছে, তা প্রচলিত রাজনীতির জন্য এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যঙ্গ, মিম আর ক্ষোভ কীভাবে রাজনৈতিক প্রতিবাদে রূপ নিতে পারে, তারই একটি উদাহরণ এই উদ্যোগ।
এই প্রজন্মের রাজনীতির ভাষা আলাদা। দীর্ঘ বক্তৃতা, ভারী ইশতেহার কিংবা দলীয় আনুগত্যের বদলে তাদের হাতে রিলস, মিম, ব্যঙ্গাত্মক গান আর দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ভিডিও। তাদের কাছে রাজনীতি শুরু হয় পর্দায়, কিন্তু থেমে থাকে না পর্দায়। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, দুর্নীতি কিংবা ভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে ক্ষোভ জমতে জমতে একসময় তা রাজপথে নেমে আসে।
ভারতের নির্বাচন কমিশন ও ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন নিয়ে চলমান বিতর্কও সেই বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে এনেছে—নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কতটা অটুট? বিরোধীদের অভিযোগ যেমন যাচাই করা দরকার, তেমনি নির্বাচন কমিশনেরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। গণতন্ত্রে কোনো প্রতিষ্ঠানই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়।
তবে রাজপথে সরকারকে চাপে ফেলা আর রাষ্ট্র পরিচালনার বিকল্প তৈরি করা এক কথা নয়। ক্ষোভ মানুষকে একত্র করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের জন্য দরকার সংগঠন, নীতি, নেতৃত্ব এবং দায়িত্ব নেওয়ার সক্ষমতা। নেতাহীনতা এই প্রজন্মের শক্তি, আবার তার দুর্বলতাও।
বাংলাদেশের তরুণদের ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক। আমরা কি তাদের কথা শুনতে প্রস্তুত, নাকি তাদের ভাষা ও জীবনযাপন বুঝতে না পেরে অযোগ্যতার সনদ দিয়ে যাব? অংশগ্রহণের সুযোগ না দিয়ে পরিপক্বতার প্রত্যাশা করা যায় না।
তরুণদের উপেক্ষা করার মাশুল আমরা দিয়েছি।স্বাধীনতার পরপরই একদল তরুণের হাতে ছিলো বিজয়ের পতাকা।তাদের উপেক্ষার জের ধরে কী হয়েছিল, তার মাশুল আমাদের এতোভাবে দিতে হয়েছে। আমাদের অনেকের জীবনের কঠিনতম অধ্যায় হিসেবে ফিরে দেখা বিষয়।উত্তরহীন বহু প্রশ্নের তাড়া।
তরুণদের প্রতিটি দাবি সঠিক নয়, তাদের প্রতিটি সিদ্ধান্তও দূরদর্শী নয়। কিন্তু তাদের প্রশ্নের জবাব অবজ্ঞা দিয়ে দেওয়া যায় না। প্রয়োজন সংলাপ, অংশগ্রহণ এবং নিজেদের ভুল সংশোধনের সাহস।
যে প্রজন্মকে আমরা ডাকিনি, তারা আজ নিজেরাই দরজায় কড়া নাড়ছে। কেউ মিম নিয়ে, কেউ স্লোগান দিয়ে, কেউ রাজপথে নেমে। এখন প্রশ্ন, আমরা তাদের কণ্ঠস্বরকে কোলাহল বলে উড়িয়ে দেব, নাকি সময়ের ভাষা হিসেবে বুঝতে চেষ্টা করব?
ইতিহাসের দরজা চিরকাল বন্ধ রাখা যায় না। কখনো কখনো দরজার ওপাশে দাঁড়ানো প্রজন্মই একদিন ঘরের নিয়ম বদলে দেয়। বিস্ময়টা তাদের আগমনে নয়, বিস্ময় হলো—তারা আসছে, এ কথা আমরা এত দিন বুঝতেই চাইনি।
ষাটের দশকে বিশ্বজুড়ে আন্দোলনের এক জোয়ার এসেছিল।বাম ভাবধারার উদ্দীপনায় পূর্ব পশ্চিমের দেশগুলো কাঁপিয়ে দিয়েছিলো ষাটের প্রজন্ম।সে ধারাবাহিকতা আমরা সত্তরের দশক পর্যন্ত দেখেছি।রাষ্ট্র ভেংগেছে,ব্যবস্থা ভেংগেছে – কোথাও ব্যর্থ হয়েছে শোচনীয় ভাবে।বর্তমান সভ্যতায় ষাটের সেই প্রগতিশীল আন্দোলনের ক্ষয়িষ্ণু বাস্তবতা আজো দেশে দেশে তার চিহ্ন রেখে চলছে।
গত এক দশক থেকে নতুন এক প্রজন্ম আবার জেগে উঠেছে।জেন জি নামে আমরা যাদের ডেকেছি।বলেছি এ প্রজন্ম বিকারহীন,সমাজ বিচ্ছিন্ন,ব্যক্তিকেন্ত্রিক।মোটা দাগে সমাজ সংস্কৃতিতে এদের যুক্ত হওয়ায় জন্য আমরা ডাক দেইনি।এড়িয়ে গিয়েছি।অথবা তাদের নিজেরাই অযোগ্য মনে করেছি।
দেশে দেশে এ জেন জি প্রজন্ম নতুন রুপে আমরা দেখতে পাচ্ছি।সংকট হচ্ছে,কোন আদর্শবাদ তাদের তাড়া করছে না।এদের কোন নেতা নেই,সুনির্দিষ্ট কোন রাষ্ট্র পরিকল্পনা, সমাজভাবনা নেই।
ইস্যু ভিত্তিক মাঠে নেমে তারা চলমান ব্যবস্থাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে।ভারতে এর আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রীর পদত্যাগ করতে হয়েছে।গনতন্ত্রের শক্ত কাঠামোয় দাঁড়ানো নরেন্দ্র মোদিরকে তারা চ্যালেঞ্জ করে জয়ী হয়েছে।রাজনৈতিক দল ও নেতারা যা পারেননি, জেন জি তা করতে সক্ষম হয়েছে নিজেদের মতো করে।
ভারতের চলমান আন্দোলন কোথায় গিয়ে ঠেকবে আমরা জানি না।যে দেশকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গঠন্তন্ত্রের দেশ বলা হয়,সে দেশের এবারের চলমান আন্দোলন কোথায় গিয়ে ঠেকবে?
